default-image

ফসলের খেত, ছেলেমেয়েদের স্কুল, খেলার মাঠ কিংবা থাকার ঘরটা নদীভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেলে কী দুঃসহ কষ্ট হয়, তা আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বহু মানুষ জানেন। নদীভাঙন অনেক দেশেই এমন এক সমস্যা, যার কোনো সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বালুর বস্তা ও কংক্রিট ব্লক দিয়ে নদীশাসন করা হয়। এসব প্রচলিত কংক্রিটের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় সিমেন্ট, যা প্রকৃতিতে কার্বন ডাই–অক্সাইডের নিঃসরণ বাড়িয়ে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের আট শিক্ষার্থী। তাঁরা দেখিয়েছেন সিমেন্টের পরিবর্তে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও নির্মাণবর্জ্য ব্যবহার করেও কংক্রিট ব্লক বানানো সম্ভব।

তাঁদের এই ধারণাকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক নির্মাণ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই)। গত ২৮ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর মিশিগানের ফার্মিংটন হিলসে নিবন্ধিত ২৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে এসিআই স্প্রিং কনভেনশন ২০২১ শুরু হয়। গত ৩০ মার্চ ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, এই অনুষ্ঠানের এসিআই কংক্রিট সলিউশনস নামের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এসিআইয়ের নিবন্ধিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের দল—চুয়েটএক্স।

দলের সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী লামইয়া ইসলাম ও আনিকা ফারজানা, তৃতীয় বর্ষের তাহসিন মাহমুদ, সাফকাত আর রুম্মান, ইসরাত জাহান ও মোসাদ্দেক হামিম এবং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব ইশমাম ও মুমতাহিনা আলম। সবাই পুরকৌশলের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া অনুষদ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একই বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম। দলের সমন্বয়ক হিসেবে ছিলেন পুরকৌশলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ার ইবনে বাশার।

বিজ্ঞাপন

বছরের শুরু থেকেই এসিআই স্প্রিং কনভেনশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল চুয়েট এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপটার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেরা দলটি পাঠানোর জন্য ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কংক্রিট সলিউশন কমপিটিশন’ নামে একটি আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছিল তারা। সেখান থেকেই উঠে আসে চুয়েটএক্স।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রস্তুতির জন্য দলটি প্রথম দিন থেকেই জিও পলিমার কংক্রিট ব্লক নিয়ে কাজ শুরু করে। দলের সদস্য লামইয়া ইসলাম বলেন, প্রচলিত কংক্রিট ব্লক এবং জিও পলিমার ব্লকের মূল পার্থক্য হলো এর বাইন্ডিং ম্যাটেরিয়াল। জিও পলিমার ব্লকে ব্যবহার করা হয় সোডিয়াম হাইড্রো–অক্সাইড বা পটাশিয়াম হাইড্রো–অক্সাইড এবং সোডিয়াম সিলিকেট। এর সঙ্গে থাকে অ্যালুমিনিয়াম সিলিকার একটা উৎস যেমন ফ্লাই অ্যাশ, স্ল্যাগের মতো শিল্পবর্জ্য ও নির্মাণবর্জ্য। সিমেন্টের তুলনায় এসব উপাদানের তেমন কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। লামইয়া মনে করেন, এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি নির্মাণবর্জ্য ও শিল্পকারখানার বর্জ্য কাজে লাগানোর সুযোগ হবে।

এসিআইয়ের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা তাঁদের পুরো প্রকল্পের ধারণা ছয় মিনিটের একটি ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে গত ৭ মার্চ ইউটিউবে আপলোড করেছিলেন। ২৩ মার্চ প্রথমে সেরা ২০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নেয় চুয়েটএক্স। ২৮ মার্চ অনলাইনে দলের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেন এসিআইয়ের বিচারকেরা। সবশেষে ৩০ মার্চ দ্বিতীয় রানারআপ হিসেবে ঘোষণা করা হয় চুয়েটএক্সের নাম।

জিও পলিমার ব্লক নিয়ে সামনে আরও কাজ করতে চান দলের প্রত্যেক সদস্য। উপদেষ্টা জি এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের পর থেকে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ মেট্রিক টন ফ্লাই অ্যাশ উৎপন্ন হবে। সেটা সংরক্ষণ করার কোনো জায়গা আমাদের নেই। যেহেতু ফ্লাই অ্যাশ থেকে জিও পলিমার কংক্রিট ব্লক তৈরি করা যাবে, তাহলে একই সঙ্গে খুব ভালোভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নদীশাসন সম্ভব। এর ফলে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা” অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকার সম্ভাবনা নিশ্চিত করা যাবে।’

প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জনের পুরস্কার হিসেবে আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) চুয়েটএক্সের প্রত্যেক সদস্যকে একটি সনদ ও দলীয়ভাবে ২৫০ ডলার দেবে। শিক্ষার্থীদের সাফল্যে অভিবাদন জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা যে গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছি, এ ধরনের পুরস্কারটা তার প্রমাণ। চুয়েট পরিবার তাদের সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।’

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন