default-image

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি ঠিকঠাকমতো তাদের কাজটা করে থাকে, তাহলে ধারণা করতে পারি, তোমরা সবাই একেকজন বিজ্ঞানী। ইংরেজি ও ইতিহাসের স্নাতকেরা, কথাটা তোমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিজ্ঞান কোনো পড়ার বিষয় কিংবা পেশা নয়। এটি একধরনের পদ্ধতিগত চিন্তার প্রতি দায়বদ্ধতা, জ্ঞান আহরণের প্রতি এবং পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ব্যাখ্যা করার প্রতি একরকম আনুগত্য। মুশকিল হলো, স্বাভাবিক নিয়মে চিন্তা করা মানে বিজ্ঞান নয়। বরং বিজ্ঞান হলো অস্বাভাবিকতা নিয়ে ভাবা, প্রশ্ন তোলা। এটা শিখতে হয়। প্রাচীন শাস্ত্র, অভিজ্ঞতা বা সাধারণ জ্ঞান যা বলে, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তার বিপরীতে দাঁড়ায়। সাধারণ জ্ঞান থেকে আমরা একসময় ভাবতাম, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, ঠান্ডার মধ্যে বাইরে গেলে সর্দি-কাশি হয়। বিজ্ঞানমনস্কতা আমাদের বুঝিয়েছে, এসব কেবলই ধারণা। এগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

ওহিওতে আমার গ্রামের বাড়ি ছেড়ে যখন কলেজে এলাম, তখন প্রথম জানলাম, পৃথিবী সম্পর্কে কত ভুল ধারণাই না আমার ছিল! অধ্যাপক ও আমার সহপাঠীদের কাছ থেকে যখন নতুন কিছু শিখতাম, বাড়ি ফিরে আমার মা-বাবাকে বলতাম, তাঁরা খুব খুশি হতেন। কিন্তু তখনো আমি আসলে স্রেফ মনের ভেতরের একটা ধারণা সরিয়ে দিয়ে সেখানে নতুন ধারণাকে জায়গা দিচ্ছিলাম। বিজ্ঞানীরা কীভাবে ভাবেন, সেটা বুঝতে আমার অনেক দিন সময় লেগেছে। বিখ্যাত পদার্থবিদ এডউইন হাবল ১৯৩৮ সালে এই ক্যালটেকেই সমাবর্তন বক্তৃতায় বলেছিলেন, একজন বিজ্ঞানীর থাকতে হয় ‘সুস্থ সন্দেহপ্রবণতা, খুব সহজেই সিদ্ধান্তে উপনীত না হওয়ার মানসিকতা এবং সৃশৃঙ্খল কল্পনা’। এটি কেবল অন্যের চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে নয়, নিজের বেলায়ও। তর্ক করার নয়, বরং পরীক্ষা করার মানসিকতাই একজন বিজ্ঞানীর বৈশিষ্ট্য।
অতএব খোলামনে পৃথিবীটাকে দেখতে হবে। তথ্য–উপাত্ত ও পরীক্ষা–নিরীক্ষাকে তোমার প্রত্যাশা ও অনুমানের বিপরীতে দাঁড় করাতে হবে। কিন্তু এটাও তোমাকে মেনে নিতে হবে যে বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সব জ্ঞানই আদতে ‘সম্ভাব্য’। এমন কোনো প্রমাণ যেকোনো সময় উদ্ভূত হতে পারে, যা সম্পূর্ণ বিপরীত। হাবল সবচেয়ে ভালোভাবে বিষয়টা বলেছিলেন, ক্রমাগত অনুমানের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীটাকে ব্যাখ্যা করেন।

বিজ্ঞানের শক্তি ব্যাপক। বিজ্ঞানীর শক্তি কাজে লাগিয়েই গত শতকে আমরা আমাদের জীবনকালকে প্রায় দ্বিগুণ করেছি, বৈশ্বিকভাবে আমাদের প্রাচুর্য বাড়িয়েছি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে জেনেছি। তবু বিজ্ঞাননির্ভর তথ্য মানুষ সব সময় বিশ্বাস করে না। হয়তো এটি অসম্পূর্ণ বলেই। যেমন অনেক মানুষ এখনো বিশ্বাস করে ছোটবেলায় টিকা নেওয়াই অটিজমের কারণ (যা সত্যি নয়), নিরাপত্তার জন্য একটা বন্দুকের মালিক হওয়া জরুরি (সঠিক নয়), জিনগতভাবে পরিবর্তিত ফসলমাত্রই ক্ষতিকর (ঠিকভাবে করতে পারলে এটি বরং আরও উপকারী), জলবায়ু পরিবর্তন আসলে ঘটছে না (এটা সত্যিই ঘটছে)।
আজ তোমরাও বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের অংশ, যারা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী জোট। অতএব বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস গড়ে তোলা তোমাদেরও দায়িত্ব। আমার ক্লিনিকে ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা কার্যক্রম করতে গিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যারা বিজ্ঞানের একদম সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে। যেমন শরীরবৃত্ত, পুষ্টি, অসুখ–বিসুখ, ওষুধসংক্রান্ত নানা কিছু, সাংবাদিকেরা যাকে ‘মূলধারার’ বিজ্ঞান বলেন (যেন এর বাইরে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়)। আমার শিক্ষিত রোগীদের মধ্যেই সন্দেহপ্রবণতা সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা মানুষকে বিজ্ঞান সম্পর্কে অবগত করে, এটা ঠিক। কিন্তু এর একটা উল্টো প্রভাবও আছে। এর ফলে মানুষের আরও বেশি ব্যক্তিবাদী এবং আদর্শিক একটা জায়গা তৈরি হয়।
আমাদের ভুল হলো, আমরা মনে করি শিক্ষার সনদ আছে মানেই সত্যের ওপর আমার একটা বিশেষ দখল আছে। অথচ তুমি যা অর্জন করেছ, সেটা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সত্যিকার অর্থে সত্যের খোঁজ কীভাবে করতে হয়, তা তুমি জানো। (সংক্ষেপিত)

ইংরেজি থেকে অনুদিত
সূত্র: বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন