default-image

বুকভরা কৌতূহল, চাপা রোমাঞ্চ আর একই সঙ্গে মৃদু আনন্দ নিয়ে ঢাকার নটর ডেম কলেজে গেলাম প্রথম ক্লাসে। ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসের কথা। এত দিন শুনেছি কলেজে উঠলে নাকি অনেক স্বাধীনতা; তদারক করার কেউ নেই, নিজ দায়িত্বে লেকচারের নোট নিতে হয়; আবার না নিলেও চলে! ক্লাস বাঙ্ক মেরে ক্যানটিনে আড্ডা দেওয়া যায়।

সকাল আটটার প্রথম ক্লাসের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ঘি–রঙা হাওয়াই শার্ট, ঢিলেঢালা প্যান্ট আর স্যান্ডেল পরা লম্বা গড়নের সৌম্যদর্শন এক মার্কিন ভদ্রলোক শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেন। শার্টের ওপরই গলায় ঝোলানো ক্রুশ দৃশ্যমান। আমরা সমবেত স্বরে ‘গুড মর্নিং, ফাদার’ বললাম। তিনি মৃদু হেসে প্রত্যাভিবাদন দিয়ে আমাদের সবাইকে স্বাগত জানালেন নটর ডেমে। পরিষ্কার বাংলায় নিজের পরিচয় দিয়ে কলেজের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবহিত করলেন। কিছু উপদেশও দিলেন ফাদার জোসেফ স্টিফেন পিশোতো, সিএসসি—যিনি এ কলেজের অধ্যক্ষও বটে। সদ্য
মাধ্যমিক-উত্তীর্ণ কিছু দুরন্ত কিশোর মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই অমায়িক মানুষের কথা শুনল প্রায় আধঘণ্টা ধরে। তাঁর সেদিনের
কয়েকটি উপদেশ আমার মনে গেঁথে আছে এখনো।

ফাদার পিশোতো বলেছিলেন, কোনো জাদুর কাঠি দিয়ে আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করা যাবে না; সমাধান আসবে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। যে সময়নিষ্ঠ, সে যে শুধু ভালো ছাত্র হতে পারে তা নয়, সে একজন ভালো নেতা হওয়ারও যোগ্যতা রাখে। অন্যকে সম্মান প্রদর্শন করলেই যে নিজের সম্মান বাড়ে, সে কথাও বলেছিলেন তিনি। তাঁর কথাগুলো আজও কানে বাজে।

বিজ্ঞাপন
default-image

এরপর অবশ্য অধ্যক্ষ মহোদয় যা বলেছিলেন, তাতে আমাদের সদ্য কলেজপড়ুয়াদের স্বাধীনতা আর ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার স্বপ্নের গুড়ে বালি পড়েছিল! সপ্তাহে দুইবার কুইজ বা পরীক্ষা, ক্লাসে হাজিরার ওপর নম্বর, ঘড়ি ধরে বাড়ির কাজ ও ব্যবহারিক ক্লাসের প্রতিবেদন জমা দেওয়া ইত্যাদি নিয়মকানুন শুনে মনে হলো, এ কলেজ কোথায়, আবার নতুন করে স্কুলেই তো ভর্তি হলাম!

কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পাশাপাশি ফাদার পিশোতো আমাদের পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। তথাকথিত লেকচার নয়, বরং স্কুলশিক্ষকের মতো করেই বোঝাতেন অনেক দুর্বোধ্য তত্ত্ব ও সূত্র। বাংলায়ই বলতেন প্রায় পুরোটা। অমায়িক এই ভদ্রলোককে কখনো মেজাজ খারাপ করতে দেখিনি। খুব বেশি রাগ করলে হয়তো হতাশা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু রেগে যাননি।

বেশ ভালো স্মরণশক্তি ছিল ফাদারের, বলতেই হবে! ২০১৮ সালে যখন ক্লাব নটরডেমিয়ানসে ‘ফাদার জোসেফ এস পিশোতো’ লাউঞ্জ উদ্বোধন করা হলো, তখন তাঁর সঙ্গে আবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। পরিচয় দিতেই তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কি তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি কি না। কোথাও নিশ্চয়ই শুনেছিলেন সেটা। সেই ১৯৮২-৮৩ সালে তাঁর কাছে পদার্থবিজ্ঞান পড়ার সময়ই যে প্রকৌশলের প্রতি উৎসাহ জেগেছিল, এ কথা বলতেই তিনি অনায়াসে মনে করতে পেরেছিলেন যে আমি ‘গ্রুপ ১’-এর ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম!

১৯৬২ সালে যাজক বরণের পর তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো নিবাসী জোসেফ স্টিফেন পিশোতো। এরপর পবিত্র ক্রুশ যাজক সংঘের সভ্য হিসেবে দীর্ঘ ৩৪ বছর বিভিন্ন মিশনারি বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে আত্মোৎসর্গ করেন তিনি। শিক্ষাদানের পাশাপাশি ২৪ বছর নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষের ভূমিকাও তিনি পালন করেন। নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন এ দেশের আপামর জনসাধারণের সেবায়। ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে তিনি শিক্ষাদান করে গেছেন প্রায় ছয় দশক ধরে। ২০১৪ সাল থেকে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন ফাদার পিশোতো। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কমিটি ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন তিনি। ঢাকার আর্চডায়োসিসের সভ্য হিসেবে ধর্মগুরুর ভূমিকা পালন করেছেন ফাদার পিশোতো।

কলেজের দামাল ছেলেরা বিভিন্ন সময় ফাদার পিশোতোকে নিয়ে ছড়া কেটেছে, রঙ্গকৌতুক করেছে, এমনকি কলেজের ধরাবাঁধা নিয়মকানুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ফাদারকে নিয়ে স্লোগানও দিয়েছে। কিন্তু তিনি সবকিছুই সহনশীলতার সঙ্গে বরদাশত করেছেন। ছাত্রদের বালসুলভ আচরণকে তিনি কখনো স্নেহভরে কখনো বা কৌশলে মোকাবিলা করেছেন। তাঁর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও সুনিয়ন্ত্রণ নটর ডেম কলেজকে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত করেছিল এবং আজও সেই ঐতিহ্য সমানভাবে বিরাজমান।

আমাদের মানসে ফাদার পিশোতোর অনুশাসনগুলো আজও বিদ্যমান। তিনি তাঁর নশ্বর দেহ ত্যাগ করলেও থাকবেন আমাদের মাঝে চিরকাল। জানি, তাঁকে আর কখনোই ‘গুড মর্নিং, ফাদার’ বা ‘গুড আফটারনুন, ফাদার’ বলা হবে না। কিন্তু তাঁর দেওয়া শিক্ষা ও তাঁর শেখানো মূল্যবোধই আমাদের ভবিষ্যতে চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকবে।

লেখক: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সভাপতি

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন