বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উদ্যোগটির মূল ভূমিকায় আছেন রমজান আলী। ডাকনাম ইমন। বাড়ি নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার আশড়ন্দ গ্রামে। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঢাকা কলেজের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। বই পড়া ও সংগ্রহ করা ছিল নেশা। ছাত্রাবাসের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ঘোষণা দেন—তাঁর কাছে ৩০টি বই আছে। কেউ পড়তে চাইলে তিনি দিতে চান। তবে ফেরত দিতে হবে। অনেকেই যোগাযোগ করল। শুরু হলো বই নিয়ে আলোচনা। রমজান মানুষকে বই পড়াতে চান শুনে বন্ধুরা ৫০টি বই উপহার দিল।

রাজশাহী শহরের সব কলেজ থেকে একজন করে উৎসাহী শিক্ষার্থীকে আমন্ত্রণ জানান রমজান আর তাঁর তিন বন্ধু। বৈঠক করে তাঁরা ঠিক করেন, বই বৃক্ষ নামে একটি গ্রুপ খুলবেন, সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বই বিনিময় করবেন। এভাবেই শুরু।

এরই মধ্যে করোনাকাল শুরু হলো। শিক্ষার্থীরা সবাই তখন ঘরবন্দী। এই সময় ফেসবুক গ্রুপে সাপহার উপজেলার তরুণ শিক্ষার্থীদের বই নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। সাড়াও মেলে ব্যাপক। এরপর একে একে আশড়ন্দ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁর ধামইরহাট, নওগাঁ জেলা সদর, নওগাঁর নজিপুর পৌর এলাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও সবশেষে দিনাজপুরে তাদের শাখা চালু হয়েছে। নিয়ম করা হয়েছে—সদস্য হতে হলে ১০০ টাকা দিয়ে ফরম নিতে হয়। তবে অষ্টম শ্রেণির নিচের কেউ সদস্য হতে চাইলে তাদের জন্য ফি ২৫ টাকা। এখন এই সংগঠনের নিজস্ব বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭৫ টি। নতুন শাখা খোলার সময় রাজশাহী শহরে একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সম্প্রতি রাজশাহী নগরের মিঞাপাড়া এলাকায় সানজানা হাসান নামে এক শিক্ষার্থীকে বাইসাইকেল চড়ে পাঠকদের বাড়িতে বই পৌঁছে দিতে দেখা যায়। চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন সানজানা। শিগগিরই হয়তো বিদ্যার্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাবেন। আপাতত বই আর বই বৃক্ষের সঙ্গে কাটছে তাঁর দিন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর বই বৃক্ষের দুই বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল রাজশাহীর সীমান্তে নোঙর নামে একটি অবকাশ কেন্দ্রে। নিবন্ধন করে এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৮০ জন বইপ্রেমী তরুণ উপস্থিত হয়েছেন।

রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ফাহিম রেজার সঙ্গে কথা হলো। ঠিক দুই বছর আগে সংগঠনের সদস্য হয়েছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ১৬০ জন পাঠকের হাতে বই পৌঁছে দিয়েছেন। সংগঠনের জন্য সদস্য তৈরি করেছেন ৫৫ জন। তিনি বলেন, ‘কারও বাসায় বই পৌঁছে দেওয়ার সময় সেই পাঠকের চোখেমুখে যে খুশির ঝিলিক দেখতে পাই, সেটাই প্রেরণা দেয়। আমার ভালো লাগা আমি আরও পাঠকের কাছে পৌঁছে দিই।’

আরেক বইপ্রেমী সদস্য প্রিয়তি ইসলাম এখন পর্যন্ত ৭৩ জন নতুন পাঠক তৈরি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘প্রথমে আমি ভাবতেই পারিনি আইডিয়াটা মানুষকে এভাবে উদ্বুদ্ধ করবে, এত তাড়াতাড়ি সংগঠনের শাখা এতগুলো জেলার এতগুলো শহরে ছড়িয়ে পড়বে। আমি আজীবন এই সংগঠনের হয়ে কাজ করে যেতে চাই।’ মোহাম্মদ বিন ইমরান বই বৃক্ষের সিরাজগঞ্জ শাখার সদস্য। গত বছরের আগস্ট থেকে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এরই মধ্যে তাঁর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে ৯৫ জন নতুন পাঠক।

উদ্যোক্তা রমজান আলী জানান, সংগঠনটি দাঁড় করানোর জন্য শুধু রাজশাহী শহরে তাঁরা সশরীরে কাজ করেছেন। এরপর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বইপড়ার আন্দোলন এক শহর থেকে আরেক শহরে ছড়িয়ে গেছে। আগামী বছর ওয়েবসাইট চালু করার ইচ্ছে তাঁদের। সাইটের মাধ্যমে সব বইয়ের তালিকা দেখা যাবে। বই বৃক্ষে যোগ হবে আরও শাখা। এভাবেই ডালপালা মেলতে থাকবে বইপ্রেমীদের এই সংগঠন।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন