default-image

কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে একজন মানুষ সফল হয়

উত্তর পাওয়া যায় ড. ডেভিড জে. শার্টজের দ্য ম্যাজিক অব থিংকিং বিগ বইতে। লেখক বলেছেন, সফল তাঁরাই হন, যাঁরা বড় স্বপ্ন দেখতে জানেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করেন। পরামর্শ দেওয়ার সময় অসংখ্য বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার করেছেন তিনি। ফলে বইয়ের বিষয়বস্তু বোঝা পাঠকের জন্য সহজ হয়েছে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে; যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২০ সালে এসেও অধ্যাপক শার্টজের পরামর্শ ও আলোচনা বেশ সময়োপযোগী।

বিশ্বাসেই শুরু

যেকোনো বড় কাজের পেছনে যে বিষয় চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে, তা হলো বিশ্বাস। আপনি যদি বিশ্বাসই না করেন যে আপনার পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব, তাহলে আপনি সেই পথে এগোনোর পদক্ষেপ নেবেন কী করে? তাই বড় কিছু করতে হলে প্রয়োজন নিজের চিন্তার পরিধিকে বিস্তৃত করা। চিন্তায় ও কাজে-কর্মে আশা, আনন্দ, উদ্যম আনা। এড়িয়ে চলা চাই ছোটখাটো বিবাদ বা তুচ্ছ বিষয়। যেকোনো তুচ্ছ বা নেতিবাচক ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামানো কি একজন বড় মাপের মানুষের বৈশিষ্ট্য?

বিজ্ঞাপন

অজুহাতের ওষুধ

সফলতায় বিশ্বাস কিন্তু নিছক কোনো সুখকল্পনা নয়। এই বিশ্বাস তখনই পূর্ণতা পায় যখন আপনি এই বিশ্বাসকে সফল করতে কাজে নেমে পড়বেন। কেউই পুরোপুরি নিখুঁত নয়। পুরোপুরি উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি কখনো মেলে না। কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না শতভাগ ঝুঁকি। তাই উপযুক্ত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করা শুধুই সময়ের অপচয়। যে কাজ আপনি আজ করতে পারেন, তা আগামীকালের জন্য কেন ফেলে রাখবেন?

বয়স, স্বাস্থ্য, ভাগ্য বা বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত অজুহাতকে আপনার দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে দাঁড় করাবেন না।

ভয়ে নেই জয়

প্রতিটি ভয়েরই কোনো একটা কারণ থাকে। তাই সেই কারণ দূর না করে ভীতির বিষয়টিকে নিছক এড়িয়ে যাওয়া মোটেও কাজের কথা নয়। ভয়কে দূর করতে দরকার পদক্ষেপ গ্রহণ। ধরা যাক, আপনার ভয় হলো পরীক্ষায় খারাপ করা নিয়ে। আপনি যদি সারা দিন পরীক্ষা খারাপ হলে কী হবে, তা নিয়ে চিন্তা করেন, তবে তা আপনার পরীক্ষা ভালো হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখবে না; বরং ভালো করার আশা নিয়ে পড়াশোনা করাই কাজে দেবে। অনেক সময় আত্মবিশ্বাসহীনতার কারণে আমাদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। ড. শার্টজ তাঁর বইয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন: সামনের সারিতে বসার চেষ্টা করা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা, হাঁটার গতি ২৫ শতাংশ বাড়ানো, আলোচনায় অংশগ্রহণ ও নিজের মতো তুলে ধরা, প্রাণ খুলে হাসা।

সৃজনশীলতা সবখানে

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে আমাদের অনেকের একটা বদ্ধমূল ধারণা হলো—এ বুঝি শুধু শিল্পী বা লেখকদের মতো নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পৃথিবীতে নতুন কিছু করতে হলে যেকোনো ক্ষেত্রেই সৃজনশীলতা নামক দক্ষতাটি খুব দরকার। ভালো ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে একজন ভালো মা বা বাবা হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সৃজনশীলতা। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, কীভাবে আমি প্রতিটি ক্ষেত্রে আরও ভালো করতে পারি? প্রশ্ন করা এবং অন্যের কথা শোনা সৃষ্টিশীলতাকে উসকে দেওয়ার দারুণ উপায়।

সঙ্গীসাথি দৃষ্টিভঙ্গি

আপনি যা-ই করেন না কেন, তা হলো আপনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আর ঠিক সে কারণে আপনি যদি নিজেকে মূল্যহীন বা অকেজো মনে করেন, তবে একটা সময় আপনি সেটিই হয়ে উঠবেন। অন্যদিকে নিজেকে মানুষ হিসেবে যথাযথ মূল্য দিলে বড় চিন্তা করাটাও আপনার জন্য খুব সহজ হয়ে যাবে।

প্রাণশক্তিতে বসবাস

বড় চিন্তা করতে চাইলে এমন সংস্কৃতিতে অবস্থান করা দরকার, যেটি আশা, কর্মচাঞ্চল্য আর উদ্যমে ভরপুর। এমন সব মানুষ যেন আপনার চারপাশে থাকে, যারা শুধু নিজেরাই বড় স্বপ্ন দেখে না, অন্যের মাঝেও উৎসাহ–উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেয়। অন্যদের উৎসাহ দিতে হলে আগে দরকার নিজেকে সক্রিয় ও উদ্যমী করে তোলা। কারও কাছ থেকে মূল্য পেতে চাইলে প্রয়োজন সেই মানুষটিকেও গুরুত্ব দেওয়া। অন্যদের ইতিবাচক কাজে উৎসাহ দিন; তাঁদের মধ্যে সঞ্চার করুন প্রাণশক্তির।

আমার ভুলটি কোথায়

ব্যর্থতা তখনই সাফল্যের ভিত্তি স্থাপন করে, যখন কেউ ব্যর্থতার ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে। নিয়মিত নিজেকেই নিজের গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা (অবশ্যই অর্থহীন নিন্দা নয়) শোনার মাধ্যমে নিজের ত্রুটি দূর করা যায়। কোনো একটি পদ্ধতিতে ব্যর্থতা এলে পরবর্তীকালে সেই ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা চাই। তবেই আপনি প্রতিনিয়ত আরও উন্নতির পথে এগোতে পারবেন।

লক্ষ্যহীন জীবন হালবিহীন নৌকা

আমরা ভবিষ্যতে কোথায় যেতে চাই, তার ওপর আমাদের কর্মপরিকল্পনা নির্ভর করে। তাই লক্ষ্য স্থির করা দরকার। এ ক্ষেত্রে ভালো একটি কৌশল হলো, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপনি নির্দিষ্ট সময় পর কোথায় যেতে চান, সেটি কাগজে-কলমে লিখে ফেলা। এর ফলে একটি পরিষ্কার চিত্র তৈরি হবে। দৈনন্দিন ছোট ছোট পদক্ষেপ বা অভ্যাস আপনাকে আপনার বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তাই সেগুলোর বেলায়ও হেলাফেলা করা যাবে না। নতুন কিছু শেখার বেলায় সময় এবং অর্থ বিনিয়োগ করলে আমাদের জীবন হয় সমৃদ্ধ।

হয়ে উঠুন পথপ্রদর্শক

বিশ্বের বড় বড় কাজ অনেক সময়ই একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয় না। এখানে প্রয়োজন হয় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করার মাধ্যমে আপনিও একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে পৃথিবীর এই ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন। অধ্যাপক শার্টজের মতে, নেতৃত্ব দিতে হলে দরকার, আপনার অধীনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের চিন্তাভাবনার পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝার চেষ্টা করা, তাঁদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা এবং সব সময় প্রগতির পথে এগোনোর চেষ্টা করা।

একজন সফল পথপ্রদর্শকের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো চিন্তা করতে পারা। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে চিন্তাভাবনার জন্য রোজ খানিকটা নিঃসঙ্গ সময় বের করে নিতে পারেন। এই একাকী সময়ের চিন্তাভাবনা আপনার সৃজনশীলতাকে বাড়াবে; ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মক্ষেত্রসংক্রান্ত নানান সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0