default-image

আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। চট্টগ্রামে পরিচিত এক ভাইয়ের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কেন যেন কম্পিউটারের প্রেমে পড়ে গেলাম। ইচ্ছা হলো কম্পিউটার প্রকৌশলী হব। কিন্তু আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সেটা সম্ভব ছিল না। আমার উচ্চমাধ্যমিকের বিষয় ছিল ব্যবসায় শিক্ষা। তাই চাইলেও বাংলাদেশে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি পারতাম না।

একসময় বিবিএ-এমবিএ শেষ করে মালয়েশিয়ার একটা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন চাকরি শুরু করি। তখন ২০১৪ সাল। কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়ার ভূত তখনো মাথা থেকে নামেনি। ভাবলাম, বিদেশি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি অনলাইনে কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়া যায়? শুরু হলো গুগলে খোঁজাখুঁজি।

যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজ পাচ্ছিলাম, সবই বেশ ব্যয়বহুল। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের খরচ প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ডলার, অর্থাৎ ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা! আমার পক্ষে তো এত খরচ সম্ভব নয়। গুগলে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ ইউনিভার্সিটি অব দ্য পিপলের নাম চোখে পড়ল। দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে অবস্থিত, যার পুরো কার্যক্রম চলে অনলাইনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানলাম, ওদের কোনো টিউশন ফি নেই, শুধু পরীক্ষা ফি দিতে হয়। প্রতি বিষয়ের পরীক্ষার ফি ১০০ ডলার (প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকা)। মনে হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু আমার জন্যই তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্বপ্নপূরণ

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আমার ইচ্ছার কথা জানিয়ে ই-মেইল করলাম। ওরা আমাকে জানাল, ভর্তির পূর্বশর্ত হলো ন্যূনতম দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করতে হবে। ইংরেজির জন্য আইইএলটিএস বা টোয়েফলের সনদ থাকতে হবে। তবে আগের পড়ালেখার মাধ্যম যদি ইংরেজি হয়ে থাকে, তাহলে এই সনদ লাগবে না। আমি যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করেছি, তারা জানাল, অনলাইনে আবেদনের পর আমার সনদগুলো অ্যাফিডেভিট করে ক্যালিফোর্নিয়া কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিতে হবে।

১০ ডলার খরচ করে অনলাইনে ভর্তির জন্য আবেদন করলাম। মূলত ভর্তির আবেদনের খরচ ৫০ ডলার ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ ডলার। যা হোক, চাহিদা অনুযায়ী সব কাগজপত্র পাঠিয়ে দিলাম।

ইউনিভার্সিটি অব পিপল (ইউওপিপল) হলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক অলাভজনক, ‘টিউশন-ফ্রি’ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার মূল লক্ষ্য হলো যোগ্য ব্যক্তিদের উচ্চতর শিক্ষার পথ সুগম করা। ইউওপিপল চলে মূলত বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দানে।

ইউওপিপল তিন ধরনের ডিগ্রি অফার করে—অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি (২ বছর), স্নাতক ডিগ্রি (৪ বছর), ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (২ বছর)। অ্যাসোসিয়েট এবং ডিগ্রি করা যায় তিনটি বিষয়ে—কম্পিউটারবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা যায় মূলত ব্যবসায় শিক্ষা ও শিক্ষা বিষয়ে। স্নাতকোত্তরে ভর্তি হতে হলে অবশ্যই স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে। সঙ্গে লাগবে ২ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা।

যেভাবে পড়ানো হয়

ইউওপিপল দূরশিক্ষণ ও সেলফ লার্নিং পদ্ধতি অনুসরণ করে। সব ক্লাস হয় অনলাইনে, মুডল সফটওয়্যারের মাধ্যমে। যেহেতু ইউওপিপলে প্রায় সব দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, তাই কোনো লাইভ ক্লাস বা ভিডিও ক্লাস থাকে না। আমার ক্লাসে আফ্রিকার সোমালিয়া, ঘানা, সিয়েরা লিওন বা অনেক দরিদ্র দেশের ছাত্র ছিল, যাদের নিজের কম্পিউটার পর্যন্ত নেই। তারা সপ্তাহে দু–তিন দিন গ্রাম থেকে এসে শহরের ইন্টারনেট ক্যাফেতে বসে ক্লাস করত। তাদের কথা মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক কোনো ভিডিও ক্লাস রাখেনি। তবে কমবেশি সব ক্লাসে ভিডিও লেকচার সরবরাহ করা হয়। ইউওপিপলে পড়ালেখা হয় টার্মভিত্তিক। প্রতিটি টার্মের সময় নয় সপ্তাহ। টার্মের শুরুতে প্রতিটি বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক, সপ্তাহভিত্তিক সিলেবাস ও নম্বর বণ্টনের পদ্ধতি কী হবে, তা জানিয়ে দেওয়া হয়।

ভেবেছিলাম ইউওপিপলে সাধারণত দরিদ্র দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। যারা সাধারণত চাকরির কারণে বিশ্ববিদ্যায়ে পড়ার সময় পায় না, কিন্তু পড়ালেখার অদম্য ইচ্ছা মনে পোষণ করে, তারাই ভর্তি হয়ে যায় এখানে। উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই কোনো না কোনো পেশায় জড়িত। বয়সের কথা চিন্তা করলে ২০ থেকে ২২ বছরের যুবক থেকে শুরু করে ৮০ বছরের দাদুকেও সহপাঠী হিসেবে পেয়েছি।

পড়ালেখার সীমানা নেই

আগে স্বপ্ন ছিল গুগলে চাকরি করব। এখন ভাবি, বাংলাদেশে বসেই কি গুগলের মতো একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যায় না? সে স্বপ্ন থেকেই জন্মস্থান চট্টগ্রামের ৩১ বছরের মায়া ছেড়ে চলে এসেছি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার বংখিরা গ্রামে। পুরোদমে ফ্রিল্যান্সিং করছি। বিশ্বাস করি, গ্রাম থেকেই হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব।

ইউওপিপলে আমাদের এক সহপাঠী ছিল, যুদ্ধরত ইয়েমেনের বাসিন্দা। সে লিখেছিল, ‘আমার দেশে প্রতিদিন বোমা হামলা হয়। গতকালও আমার প্রতিবেশী পুরো পরিবারসহ বোমা হামলায় মারা গেছে। আমি জানি না কাল বাঁচব কি না। মাথার ওপরে বোমার ভয় নিয়ে পড়ালেখা করছি শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য।’ ওর এ কথা আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। সত্যিই তো, জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা আমৃত্যু মানুষকে প্রেরণা দেয়।

ইমেইল: md.nurhossain@my.uopeople.edu

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0