default-image

প্রতি বছর ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (আইসিসি আর) বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি দেয়। শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয় তা নয়। ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক ও নানা আকর্ষণীয় জায়গায় ভ্রমণের সুযোগ পান বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা। ভারতের নানা জনপদ, বিভিন্ন এলাকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাবনা ও লোকসংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দারুণ সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী এই বৃত্তির জন্য আবেদন করেন। একটু পরিকল্পনা করে বৃত্তির আবেদন করলে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আছে যাঁদের, তাঁদের জন্য ভারত দারুণ এক গন্তব্য হতে পারে। এ বছর এখন বৃত্তির আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। শুরুতে আবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ৩০ এপ্রিল। তবে এখন আবেদনের সময়সীমা ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

আমার বৃত্তির গল্প

আমি স্নাতক পর্যায়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলাম। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে পড়েছি সমাজকর্ম বিষয়ে। স্বেচ্ছাসেবামূলক বিভিন্ন কাজে, নানা গবেষণাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে নিজেকে যুক্ত করেছিলাম। শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাসে মধ্যম মানের ছিলাম আমি। তবে নানা বিষয়ে নিত্যনতুন কাজ করার আগ্রহ ছিল। ক্লাসের পড়াশোনার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবকমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেছিলাম। নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছিল আমার অনুশীলনের জায়গা।

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই অ্যাকটিভ সিটিজেন ইয়ুথ লিডারশিপ ট্রেনিং, অ্যাকশন এইডের ইয়ুথ ট্রেনিং, আইআইডির পলিসি ক্যাম্পসহ নানান কাজে যুক্ত ছিলাম বলে ইংরেজি বলা বা লেখার একটা চর্চা তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়াও কিং আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টাররিলেজিয়াস ও ইন্টারকালচারাল ডায়ালগ সেন্টারের মাধ্যমে ভারতের ঋষিকেশে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিশেষ সুযোগ পাই। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউফ্রেটাস ইনস্টিটিউট ও পলিনেশন প্রোজেক্টের মাধ্যমে সেবামূলক কাজ করতে অনুদান পাই।

বিজ্ঞাপন

আমার আবেদন প্রক্রিয়া

পড়াশোনা শেষ করে ব্র্যাকের মানবপাচার বিষয়ক কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছিলাম। দেশের সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থা উন্নয়নে কাজের আগ্রহ তৈরি হয় আমার। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরাসরি কাজের চেষ্টা করি। এই কাজে যুক্ত থাকার সময়ই ২০১৯ সালে আমি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (আইসিসিআর) স্কলারশিপে আবেদন করি। অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। আবেদনের অংশ হিসেবে ইংরেজিতে একটি নিবন্ধ লিখতে হয়। যার মাধ্যমে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীর কতটা দক্ষতা আছে তা জানতে পারে কর্তৃপক্ষ।

আবেদনের পরে ‘কম্প্রিহেনসিভ রাইটিং এক্সাম’-এ অংশগ্রহণ করতে হয়। খুব সাধারণ বিষয়ে মৌলিক প্রশ্নের এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য মূলত শিক্ষার্থীর জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা সম্পর্কে জানা। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। মৌখিক পরীক্ষায় সাধারণ বিষয় থেকে শুরু করে কোন বিষয়ে পড়তে চাই, কেন পড়ব-এসব নিয়ে আলাপ আলোচনা করা হয়। বৃত্তির আবেদনের সময়ই নিজের পছন্দের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় উল্লেখ করতে হয়। আমি শান্তি, সৌহার্দ্য, বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক নানান বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী। যে কারণে আমি তামিলনাড়ুর আলাগাপ্পা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করি। আবেদনের সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং দেখে আবেদন করা উচিত। ভবিষ্যতে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ কেমন আছে তা ইন্টারনেটে খোঁজ করলেই জানা যাবে। বৃত্তির নানা ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও ইংরেজিতে বিশেষ দক্ষতা কাজে আসে। ইংরেজিতে পারদর্শী হলে বৃত্তির বিভিন্ন ধাপে এগিয়ে থাকা যায়।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে করোনায় যখন প্রায় সবকিছু বন্ধ, তখন আমি বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হওয়ার ইমেইল পাই। ভর্তি হই দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর আলাগাপ্পা ইউনিভার্সিটিতে। আমি কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অফার লেটার পেয়েছিলাম। দ্রুতই স্নাতকোত্তরে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে যাই। আমি সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তরে পড়ছি। মেডিকেল সাইকিয়াট্রি আমার মূল বিষয়।

এখন ভারতেই থাকছি। লকডাউনের কারণে ক্লাস বন্ধ। কিন্তু পরীক্ষা ও গবেষণার কাজ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল একটি লাইব্রেরি ব্যবহারে সুযোগ পাচ্ছি নিয়মিত। এরই মধ্যে নতুন বন্ধু তৈরি হয়েছে। একেবারেই নতুন বন্ধু, যাদের সংস্কৃতি, ভাবনা, বেঁচে থাকা, কথা বলা, ভাবভঙ্গি পুরোটাই আমার চেয়ে আলাদা। কিন্তু তারা আমার সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। ক্লাসের পড়াশোনার মাধ্যম ইংরেজি। স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হচ্ছে আমার। এক সময় তামিল বলতেই বুঝতাম রজনীকান্ত আর ‘আন্না রাসকেলা’। আইসিসিআর বৃত্তি আমার জানার দুনিয়াকে অনেক বড় করে দিয়েছে। বাংলাদেশের অন্য সব সাধারণ শিক্ষার্থীও এই সুযোগ নিতে পারেন।

অনলাইনে চলছে আবেদন

২০২১-২২ সালের শিক্ষাবর্ষের জন্য আবেদন গ্রহণ করছে আইসিসিআর। অনলাইনে এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। ভারতের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই নানা বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে ভর্তির জন্য বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পেয়ে থাকেন। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত আইসিসিআর বৃত্তির জন্য আবেদন করা যাবে। বৃত্তির জন্য আবেদনকারীদের বয়স ১৮ বছর থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে। ভর্তির পর শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে থাকতে হবে। আবেদনকারী প্রত্যেক শিক্ষার্থী পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউটে আবেদন করতে পারবেন। আবেদনের সময় আইইএলটিএস বা টোয়েফল সনদ জমা দেওয়া যায়, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়। অনলাইনে আবেদনের সময় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের নম্বরপত্র আপলোড করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন