default-image

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবার যৌথভাবে নোবেল দেওয়া হয়েছে তিনজনকে—যুক্তরাষ্ট্রের ড. হার্ভে জে অল্টার, ড. চার্লস এম রাইস ও কানাডার ড. মাইকেল হউটন। লিভারের ‘নীরব ঘাতক’ হেপাটাইটিস সি ভাইরাস (এইচসিভি) শনাক্তকরণ ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের জন্য তাঁদের এ সম্মান। তিন বিজ্ঞানীর মধ্যে ড. হার্ভে জে অল্টার ছিলেন আমার সুপারভাইজার। তিনি ড. অল্টার নামে পরিচিত। আমিই বোধ হয় তাঁর শেষ পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। ড. অল্টার খুব শান্ত, বিনয়ী ও আমুদে মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে কখনো উত্তেজিত হতে দেখিনি। একজন নিরলস গবেষক তিনি। কাজের প্রতি তাঁর তীব্র আগ্রহ ও পরম নিষ্ঠা আছে। সাধারণভাবে আমরা মনে করি, বিজ্ঞানীরা বেশ অগোছালো হন। কিন্তু ড. অল্টার নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। তিনি পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। এই ৮৫ বছর বয়সেও নিজেই গাড়ি চালিয়ে সকালে অফিসে হাজির হন।

বিজ্ঞাপন

তাঁর কাছে শেখা

আমি যখন ড. অল্টারের সামনে গবেষণার ফলাফল ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরি, তিনি খুব আনন্দ পান। কখনো পরিহাস করেন না। কোনো হাইপোথিসিসই তাঁর কাছে কার্যত তুচ্ছ নয়, কিছুই উড়িয়ে দেন না। বলেন, ‘চালিয়ে যাও। কোনো উপাত্তই ফেলে দিয়ো না।’ তাঁর মতে, সব হাইপোথিসিস সঠিক না-ও হতে পারে—এটাই বিজ্ঞান। তবে আমাদের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর আত্মজীবনী পড়ছিলাম—সেখানে দেখি তাঁর কাছে সেই সত্তর দশকের নমুনাও আছে। এই শিক্ষাটা তিনি তাঁর শিক্ষক ড. ব্লুমবার্গের কাছে পেয়েছেন। ড. ব্লুমবার্গ তাঁকে সব সময় গবেষণার নমুনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে শিখিয়েছেন।

আমাদের গবেষণাগারে অনেক পুরোনো কিছু আলমারি ছিল—যেখানে খুব যত্নে তিনি তাঁর সেই সময়ের রোগী ও ওষুধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। আমার গবেষণায় অনেক নমুনা আমি ড. অল্টারের রোগীদের কাছে পেয়েছি। আমরা নিয়মিত ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডিজ অব লিভার ডিজিজেস’ (এএএসএলডি) সভায় যাই। সেই সভায় কোনো মজার পোস্টার বা বিজ্ঞানসংক্রান্ত অধিবেশনে তাঁর সঙ্গে দেখা হলে হেসে তিনি বলেন, ‘কাজী, কেমন দেখলে? সবকিছু নোট নাও। যাঁদের কাজের সঙ্গে আমাদের মিল আছে, পরে আমরা তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে নেব।’ তাঁর তত্ত্বাবধানে আমার দুটি (একটিতে সহলেখক, অন্যটিতে মূল লেখক) গবেষণাপত্র হেপাটোলজি (ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর: ১৪.৬) জার্নালে প্রকাশিত হয়।

নোবেলজয়ীর রসবোধ

ড. অল্টার খুব আমুদে মানুষ। কৌতুক তাঁর খুব প্রিয়। সব সময় হাসিখুশি থাকেন। অনেক সময় মজা করে ই-মেইলের শেষে তাঁর নামের পরিবর্তে লেখেন—‘ওল্ড হর্স’ (বুড়ো ঘোড়া) কিংবা ‘ওল্ড ক্যামেল’ (বুড়ো উট)। প্রথম দিকে এটা বুঝতে পারিনি। পরে আমিও মজা পেয়েছি। একাধারে তিনি একজন উচ্চমানের দার্শনিক, সফল গবেষক ও একজন ভালো অভিভাবক। ড. অল্টার শিশুদের খুব পছন্দ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিকের ক্ষেত্রে এটা ব্যতিক্রমই বলতে হবে, অন্তত আমার অভিজ্ঞতায়। আমার সন্তানকেও তিনি খুব স্নেহ করেন। এখানে আরেকটি ব্যাপার না বললেই নয়। আমার ফেলোশিপ পাঁচ বছরের জন্য ছিল, কিন্তু চার বছর অতিক্রম হওয়ার পর নিয়ম মেনে আমি আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করি। দুঃখের বিষয়, ইমিগ্রেশন জটিলতায় তা আর হয়নি। আমি দেশে ফিরে আসি। ড. অল্টার এই আদেশ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। এখনো তিনি নিয়মিত আমাদের খবর নেন। যোগাযোগ রাখেন।

আমি খুব ভাগ্যবান, ড. অল্টারের মতো বড় মাপের একজন বিজ্ঞানীর সংস্পর্শে এসেছিলাম। তাঁকে এই আনন্দক্ষণে অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাই। ভালো থাকবেন সব সময়!

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক পোস্ট–ডক্টরাল ফেলো, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0