default-image

লিখতে বসে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের দুটি প্রিয় লাইন খুব মনে পড়ছে—

‘বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক,

আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।’

তবে শুধু কি বাংলা? সারা বিশ্বের সব মানুষের কাছেই মাতৃভাষা একটা ভীষণ ভালোবাসা, গর্ব, মমত্ব, আশ্রয়ের জায়গা। জীবনের চরৈবেতি গানের কথা-কাহিনি সবই যে আঁকা থেকে যায় মাতৃভাষার নকশিকাঁথায়। বাইরে কাজকর্মে, যোগাযোগে বা ব্যবহারিক প্রয়োজনে অন্য ভাষার আশ্রয় নিতে হলেও আমাদের স্মরণে, মননে যে কণ্ঠস্বর বুদ্ধি দেয়, সাহস জোগায়, স্বপ্ন দেখায়, তার ভাষা তো বাংলাই।

মাতৃভাষার প্রতি আমাদের এই অনুরক্তির পেছনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটা তাগিদও কাজ করে। কখনো কখনো ভাষা আমাদের সসম্মানে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। আমরা আক্ষরিক অর্থে তৃষ্ণার পানি, ক্ষুধা নিবৃত্তির খাদ্য, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য মাতৃভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। আর এই নির্ভরশীলতা প্রকট রূপ ধারণ করে যখন রোগে, দুর্যোগে, সশস্ত্র সংঘাতে বিপর্যস্ত মানুষ দেশ, গ্রাম, শহরের সীমা পেরোতে পারলেও ভাষার বেড়ার সামনে এসে অসহায় হয়ে পড়ে। তারা বলতে পারে না তাদের কী প্রয়োজন, বুঝতে পারে না ভিনদেশি ভাষায় তাদের কী বলা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
সারা বিশ্বের অগণিত স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদকেরাই টিডব্লিউবির মূল চালিকা শক্তি।

আর সেই সময় ভাষা নিয়ে কর্মরত অলাভজনক সংস্থা ট্রান্সলেটরস উইদাউট বর্ডারস (টিডব্লিউবি) তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। যোগাযোগের সেতু বেঁধে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ, প্রাণরক্ষাকারী তথ্য এমন ভাষা ও শৈলীতে তাদের অনুবাদ করে দেয়, যা তারা বুঝতে পারে। সেই সঙ্গে তাদের প্রয়োজন, মতামত, ইচ্ছা-অনিচ্ছা সঠিক ভাষায় পৌঁছে দেয় মানবিক সংস্থাগুলোর কাছে।

সারা বিশ্বের অগণিত স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদকেরাই টিডব্লিউবির মূল চালিকা শক্তি। তাঁদের পাশে নিয়ে টিডব্লিউবি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী থেকে শুরু করে ইউরোপে আসা অগণিত উদ্বাস্তু, সাইক্লোন ইদাই ও সাইক্লোন কেনেথে বিধ্বস্ত মোজাম্বিকের মানুষ, নাইজেরিয়ায় সশস্ত্র সংঘাতে দেশের মধ্যে বাস্তুচ্যুত লাখো উদ্বাস্তু, ইবোলা মহামারিকবলিত গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং সম্প্রতি কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপর্যস্ত সারা বিশ্বের মানুষকে তাদের নিজের ভাষায় প্রাণরক্ষাকারী তথ্য পৌঁছে দিয়েছে, দিচ্ছে।

default-image

অনুবাদের পাশাপাশি টিডব্লিউবি দোভাষীদের প্রশিক্ষণ, ভাষাসংক্রান্ত গবেষণা, ভাষা-মানচিত্র রচনা ও ভাষা প্রযুক্তির বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবিক সংস্থাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিতে বেশ কিছু উদ্ভাবনী প্রকল্পে কাজ করছে, যেমন কোভিড-১৯–এর জন্য বহুভাষিক চ্যাটবট।

টিডব্লিউবির এই প্রচেষ্টায় সারা বিশ্বের যুবাশক্তি এক অসামান্য অবদান রেখেছে। তাঁদের উদ্দীপনা, দক্ষতা এবং সর্বোপরি নিজের ভাষা, দেশ ও সম্প্রদায় সম্পর্কে সহজাত জ্ঞান, মানবিক কাজে ভাষান্তরের ক্ষেত্রে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। ইন্টারনেট, মুঠোফোন ও সামাজিক মাধ্যমে সাবলীল এই নতুন প্রজন্মের পক্ষে বিশ্বের এক কোনায় বসে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করা আর তাদের দ্বিভাষিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সহজবোধ্য, সময়োপযোগী এবং সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল অনুবাদ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। তাঁরা যেভাবে টিডব্লিউবির সঙ্গে দুর্গত মানুষের কথা ভাবছেন, তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। আর এর বিনিময়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার কুঠুরিতে জমা হচ্ছে মানবিক সংকটে সহায়তা দেওয়া, অনুবাদকদের এক বৈশ্বিক কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করা এবং সমাজে অর্থপূর্ণ অবদান রাখার অনন্যসাধারণ পুঁজি।

আমাদের এক তরুণ বাংলা স্বেচ্ছাসেবী একবার বলছিলেন, ‘যদিও ব্যক্তিগতভাবে টিডব্লিউবির কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি, কিন্তু সব সময় মনে হয় অনেক দেশে আমার অনেক বন্ধু আছে। টিডব্লিউবির অসাধারণ টিমের সঙ্গে কাজ করা এক একাত্মতার অনুভূতি এনে দেয়।’

কীভাবে টিডব্লিউবিতে যোগ দেব

অনেকের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে যে কীভাবে টিডব্লিউবিতে যোগ দেব বা কোন ধরনের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। টিডব্লিউবিতে স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদক হিসেবে যোগ দেওয়া খুব সহজ। আমাদের ওয়েবসাইট ঘুরে দেখুন, সেখানে আমাদের লক্ষ্য, দর্শন এবং কাজ সম্পর্কে সব তথ্য আছে। যোগ দিতে আগ্রহী হলে ভলান্টিয়ার লিংকে ক্লিক করে ফরম পূরণ করতে পারেন। শুধু অনুবাদক হিসেবেই নয়, স্বেচ্ছাসেবী প্রকল্প ব্যবস্থাপক, গ্রাফিক বা ওয়েব পেজ ডিজাইনার এবং তহবিল সংগ্রাহক হিসেবেও যোগ দিতে পারেন।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আজ সারা বিশ্বকে আমাদের পরিবার করে তুলেছে। বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা, হতাশায় শামিল হচ্ছি অন্য প্রান্তের মানুষ। চাইছি একে অন্যের দিকে সাহায্য, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে। আর টিডব্লিউবির সঙ্গে বাড়ির এক কোনায় বসেও শুধু এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নয়, বছরের প্রতিটি দিন আমাদের মাতৃভাষাকে উদ্‌যাপন করতে পারি।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন