default-image

ম্যাকারেঞ্জ পিলটাটা একটি উদ্ভিদের নাম। এটি ‘নাইন্ন্যা বিচি’ নামেও পরিচিত। পাইলস, কিডনিতে পাথর, পক্ষাঘাত, গেটে ব্যথাসহ নানা রোগের চিকিৎসায় এ ভেষজ উদ্ভিদটি ব্যবহার করা হয়। এ রকম আরেকটি ভেষজ উদ্ভিদ হলো ‘জিলিয়া ডোলাব্রিফর্মিস’ বা লৌহ কাঠ। দেহে বাত, পোড়া ক্ষত, আলসার কিংবা কৃমির চিকিৎসায় এটিও বহুল ব্যবহৃত। তবে বিভিন্ন ভেষজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসব উদ্ভিদে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এ দুটিসহ এমন ১৯টি ভেষজ উদ্ভিদের ডিএনএ বার কোডিং করে ভেজাল রোধের পথে একধাপ এগিয়ে গেছেন।

গবেষকেরা প্রথমে প্রতিটি উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরে প্রতিটি নমুনার তিনটি জিনের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) উন্মোচন করা হয়। জীবনরহস্য উন্মোচনের পর ডিএনএ বার কোডিং করেন গবেষকেরা। উদ্ভিদের ডিএনএ বার কোডিং হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জিন থেকে ডিএনএর ক্ষুদ্র অংশ ব্যবহার করে প্রজাতি শনাক্তকরণ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে উদ্ভিদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না। বরং জিনের নির্দিষ্ট অংশ ব্যবহার করে পিসিআর মেশিনে পরিবর্ধন করা হয়। পরিবর্ধন করে সিকোয়েন্স করা হয়। পরে সিকোয়েন্সের ফলাফল বিদ্যমান ডেটাবেইসের সঙ্গে তুলনা করে প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দীন ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। আরও ছিলেন ওই বিভাগের শিক্ষার্থী খালিদ মুশ্বান ও মো. শহিদুল হাসান। সহযোগিতায় ছিলেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এম এ এম জুনায়েদ সিদ্দিকী। বার কোডিংয়ের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ডেটাবেইসের জিন ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি এসব ফলাফল গ্রহণ করেছে।

গবেষকেরা বলছেন, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হাজারি খিল অভয়ারণ্য, চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, বান্দরবান সদরের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে মোট ১৯টি উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ইথনোবোটানি ও ফার্মাকোগনসি ল্যাব এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকুলার বায়োলজি ল্যাবে এসব নমুনা নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর আগে বিশ্বের কোথাও এই ১৯টি উদ্ভিদের বার কোডিং করা হয়নি।

গবেষকেরা জানালেন, উদ্ভিদের শনাক্তকরণ, পৃথক্‌করণ ও শ্রেণিবিন্যাস করার ক্ষেত্রে গবেষণাটি ভূমিকা রাখবে। কারণ, এসব উদ্ভিদের পাঁচ থেকে ছয়টি বিপন্ন প্রজাতির। ফলে ডিএনএ বার কোডিংয়ের তথ্য কাজে লাগিয়ে বিপন্ন উদ্ভিদগুলো চিহ্নিত করা যাবে। চিহ্নিত করা গেলে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল বার কোড অব লাইফ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বিশ্বে অন্তত ১০ কোটি উদ্ভিদের প্রজাতি রয়েছে। তবে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ২০ লাখের কম প্রজাতি শনাক্ত করা গেছে। বাংলাদেশে ৫ হাজারের বেশি সংবহনতান্ত্রিক (ভাসকুলার) উদ্ভিদ এবং দেড় হাজার ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে, যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দুটি ডেটাবেইস বা তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত আছে।

গবেষক দলের প্রধান শেখ বখতিয়ার উদ্দীন বলেন ‘১৯টি উদ্ভিদের সব কটিই চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়। বাজারে এসব উদ্ভিদ থেকে তৈরি হওয়া ওষুধ পাওয়া যায়। কিন্তু এসব ওষুধে ভেজাল থাকে। দেখা যায় হরিণা লতা কিংবা শিলছড়ির বদলে অন্য কিছু দেওয়া হচ্ছে। আমাদের গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে সরকার কিংবা যেকোনো প্রতিষ্ঠান সহজেই এ ভেজাল ধরে ফেলতে পারবে। এতে সাধারণ মানুষও উপকৃত হবে।’

যে ১৯টি উদ্ভিদ প্রজাতি নিয়ে গবেষণা হয়েছে, সেগুলো হলো শিলছড়ি, মরিচ্যা, জলজি, অংকিলতা, গন্ধবিকচু, লৌহা কাঠ, কেশরদাম, হরিণা লতা, হাড়জোড়া লতা, খাড়া গাইত, হুর উদাল, নাইন্ন্যা বিচি, সুখ মুরালী, পাপরা, সিভিট, ঢেওয়া, ললনা, মেলা মরিচ্যা ও বন বেলি। এদের প্রতিটির নানা ঔষধি গুণ রয়েছে।

গবেষক দলের সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানালেন, আণুবীক্ষণিক, রাসায়নিকসহ অন্যান্য পদ্ধতিতে ভেষজ উদ্ভিদ শনাক্তকরণ বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। কিন্তু এ গবেষণার তথ্য কাজে লাগিয়ে খুব সহজে ও দ্রুত ভেষজ উদ্ভিদ শনাক্ত করা যাবে।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন