জ্যাক মা
জ্যাক মাছবি: রয়টার্স

পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর চেয়ে দ্রুতগতিতে বদলাতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে। আমি সব সময় মনে করি, স্কুল হবে চিড়িয়াখানার মতো। চিড়িয়াখানায় যেমন সব ধরনের প্রাণী থাকে, স্কুলেও থাকবে। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের বেলায়ও এটা মানি। তাই তো প্রতিষ্ঠানটাকে চিড়িয়াখানার মতো সাজিয়েছি। একে কখনো খামার হতে দিতে চাই না। খামারে হয় এক পাল মুরগি, নয়তো হাঁস থাকে। সবাই একই রকম ডিম দেয়। তাদের মূল্যায়ন আর একটা সিংহের মূল্যায়ন কখনো এক মাপকাঠিতে হয় না। আমি আমার প্রতিষ্ঠানে তাই চিড়িয়াখানার মতো বৈচিত্র্য চাই। আমাদের বুঝতে হবে, প্রত্যেক মানুষের বৈশিষ্ট্য আলাদা। একজন সিইওকে খামার বানানোর কাজ না করে, তাঁর কর্মীদের বৈশিষ্ট্যগুলো বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে।

মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য কী?—ডিজিটাল যুগে এসে এমন প্রশ্ন আমাদের মনে উঁকি দিতেই পারে। কারণ দিন যত যাচ্ছে, মানুষ ও যন্ত্রের পার্থক্য তত মুছে যাচ্ছে। এখন এ নিয়ে যদি আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই, তাতে ক্ষতি আমাদেরই হবে, যন্ত্রের না। যন্ত্র সবকিছু যুক্তি দিয়ে হিসাব করে। যেখানে যুক্তি খাটাতে হয়, সেখানে যন্ত্র ভালো করে। যেখানে যুক্তি খাটে না, সেখানে ভালো করে মানুষ।

বিজ্ঞাপন

একটা ছেলে একটা মেয়েকে কেন ভালোবাসে? এই ভালোবাসার পেছনে কোনো কারণ নেই। ভালোবাসায় কোনো যুক্তি খাটে না। কিন্তু একজন মানুষ আরেকজনকে ঘৃণা করে। আর এই ঘৃণার পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকবেই, থাকবে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। মোট কথা প্রতিটি খারাপ কাজের পেছনে থাকবে যুক্তি। আর যেখানেই যুক্তি থাকবে, সেখানে যন্ত্র ভালো করবে। তাই তোমরা যদি জীবনের সবকিছু যুক্তি দিয়ে মাপো, তাহলে যন্ত্র একদিন তোমার জায়গা নিয়ে নেবে। মানুষের কাজ হবে সৃজনশীল, গঠনমূলক, তাতে মিশে থাকবে নানা ধরনের আবেগ-অনুভূতি। তখন যন্ত্র আর মানুষের জায়গা নিতে পারবে না। সময় আর পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষ নিজেকে বদলে ফেলতে পারে, যন্ত্র তা পারে না। শিল্পবিপ্লবের যুগে সবাই মানুষকে যন্ত্রের মতো হতে বলত। কিন্তু ডিজিটাল যুগে যন্ত্রকে বানানো হয় মানুষের মতো করে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞ নয়, উৎসাহী মানুষ চাই

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সংস্কার করতে হবে। স্কুল সংস্কার করতে হবে, ক্লাসরুম সংস্কার করতে হবে, নতুনভাবে তৈরি করতে হবে শিক্ষকদের। অতীতে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেন। ভবিষ্যতের ক্লাসরুমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী একসঙ্গে শিখবেন, একসঙ্গে জ্ঞান অর্জন করবেন। অতীতে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি জানতেন। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছুই শিক্ষকদের চেয়ে বেশি জানবে। অতীতে ক্লাসরুমেই পাওয়া যেত সব প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু ভবিষ্যতের ক্লাসরুমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে মিলে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, যা আগে থেকেই তৈরি থাকবে না। অতীতে ক্লাস শুধু ক্লাসরুমেই হতো, ভবিষ্যতের ক্লাসরুম হবে চার দেয়ালের বাইরের এই বাস্তব জগৎ।

পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনো ধারণাও করতে পারছি না, পড়াশোনার নামে বাচ্চাদের ক্লাসরুমে বন্দী রেখে তাদের শিক্ষিত করা অসম্ভব। ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের বাচ্চাদের শেখাতে হবে ক্লাসরুমের বাইরের জগতে কীভাবে টিকে থাকতে হবে। তাদের শেখাতে হবে সমস্যা সমাধানের জন্য আগে এর মোকাবিলা করতে হবে।

এগুলোই হলো শিক্ষা খাত সংস্কারের কিছু চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিবন্ধকতাগুলো উতরে যাওয়ার জন্য আমাদের বিশেষজ্ঞের মত লাগবে না, লাগবে আমাদের মতোই কিছু সাধারণ, নবিশ, উৎসাহী মানুষ। প্রতিটি অঞ্চল, প্রতিটি দেশে এমন আগ্রহী মানুষ প্রয়োজন। মূলত এ কারণে বড় বড় শিক্ষা সম্মেলনগুলো আমার ভালো লাগে না। গবেষক-বিশেষজ্ঞরা শুধু আশঙ্কার কথা বলেন, কিন্তু কোনো দিকনির্দেশনা দেন না। আমাদের সেই নির্দেশনাটাই লাগবে। আমরা একসঙ্গে সমাধানের পথ খুঁজতে চাই, সমস্যার ব্যবচ্ছেদ করতে চাই না।

বিজ্ঞাপন

চার প্রস্তাব

শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে আমি আমার কিছু সমাধানের কথা বলি।

১. চলুন, আমাদের কিছু মেধাবী পিএইচডিধারী শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্কুলে স্থানান্তর করি। একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর চেয়ে কিন্ডারগার্টেনপড়ুয়া শিশুর মস্তিষ্ক বেশি উর্বর থাকে। শৈশবের শিক্ষা যতটা মনে গেঁথে যায়, ততটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া মনে গাঁথে না। আমরা দেখি, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেরার তালিকায় নাম লেখানো নিয়ে খুব গর্ব করে। আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিংয়ের চেয়েও এখন কিন্ডারগার্টেন আর প্রাথমিক স্কুলের র‍্যাঙ্কিং তৈরি ও প্রচার করা বেশি জরুরি। দয়া করে দেশের মেধাবী শিক্ষকদের নতুন মেধা তৈরির প্রথম ধাপে নিয়োজিত করুন, শেষ ধাপে নয়।

২. শিক্ষককে সম্মান করা মানে শিক্ষার সম্মান, জ্ঞানের সম্মান। তাই শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে হবে। প্রাপ্য সম্মানী দিতে হবে। তাঁদের সচ্ছল রাখতে হবে। যেন তাঁরা তাঁদের পেশাকে সম্মান করতে পারেন, শিক্ষার্থীদের মন থেকে ভালোবাসতে পারেন। আমরা শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা তখনই নিশ্চিত করতে পারব, যখন আমরা শিক্ষকদের ভালো রাখব। সমীক্ষায় দেখা গেছে, একজন শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনে অন্তত ২০০ শিক্ষার্থীর জীবন গড়তে পারেন। তাই আমরা যদি শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করতে না পারি, তাঁরা কীভাবে শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবেন?

আমরা দেখেছি, ৬০ শতাংশ শিক্ষক মাঝপথে এসে শিক্ষকতা ছেড়ে দেন শুধু একটা কারণে। তা হলো তাঁরা প্রধান শিক্ষককে (হেডমাস্টার) মানতে পারেন না। বেশির ভাগ শিক্ষক হেডমাস্টারদের ঘৃণা করেন। কারণ কোনো হেডমাস্টারই জীবনে কী করে ভালো হেডমাস্টার হওয়া যায়, সেই প্রশিক্ষণ নেননি। একজন শিক্ষককে হঠাৎ হেডমাস্টার বানিয়ে দেওয়া একটা সমস্যা বটে। তাঁর কোনো ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী ক্ষমতা আছে কি না, তা না দেখেই তাঁকে হেডমাস্টারের চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের উচিত প্রতিটি দেশের হেডমাস্টারদের ওপর নজর দেওয়া। আমরা তাঁদের খেয়াল রাখলে, তাঁরা খেয়াল রাখবেন শিক্ষকদের। আর শিক্ষকেরা সন্তুষ্ট থাকলে সুশিক্ষা পাবে শিক্ষার্থীরা। তাই আমি মনে করি, প্রতিটি রাষ্ট্রের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেন তাদের দেশের স্কুলগুলোর হেডমাস্টারদের দিকে খেয়াল রাখে, যেন তাঁদের প্রশিক্ষণ দেয়, সহায়তা করে। হেডমাস্টাররা ভালোভাবে কাজ করতে পারলে, শিক্ষকেরাও ভালো করতে পারবেন। আর শিক্ষকেরা ভালো থাকলে, তাঁরা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে পারবেন।

৩. আমার তৃতীয় পরামর্শ হলো, পরীক্ষার পদ্ধতিতে বদল আনতে হবে। বদল আনতে হবে মেধার মান নির্ণয়ের পদ্ধতিতে। পড়াশোনা মানেই পরীক্ষা দেওয়া আর ভালো ফলাফল করা নয়। যদি পরীক্ষার ফলাফলই হয় শিক্ষার মান নির্ণায়ক, তাহলে আমি বলব শিক্ষাব্যবস্থা ভুল পথে চলছে। আমি চীনের হাইস্কুলপড়ুয়া অনেককে জিজ্ঞেস করেছি, ভবিষ্যতে তুমি কী করতে চাও। বেশির ভাগের জবাব ছিল ‘আমি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই’। এর সামনে তাঁরা আর কিছু ভাবতে পারে না। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের এই ধারণাই দেয় যে ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানে ভালো চাকরির নিশ্চয়তা। কিন্তু আমি আমার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যত ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আসুক না কেন, আমরা আলীবাবাতে একজন তরুণকে সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে গড়ি, প্রশিক্ষণ দিই। তাই গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানেই ভালো চাকরির নিশ্চয়তা নয়। ডিগ্রির সনদ মানে শুধুই একটা রসিদ, যেটার টাকা তোমার পরিবার দিয়েছে। আসল ডিগ্রি তখনই অর্জন হয়, যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পর একজন জীবনযুদ্ধে নামে।

৪. শিশুদের শিক্ষাকে ভালোবাসতে বাধ্য করবেন না। বরং ভালোবাসার শিক্ষা দিন। মন দিয়ে ভালোবাসা শেখান। মানুষই পারে মন থেকে ভালোবাসতে। মগজ দিয়ে ভাবে যন্ত্র, হৃদয় দিয়ে ভাবে মানুষ। আজকের শিশুরা মগজ দিয়ে ভাবতে শিখলে, কাল যন্ত্র এসে তাদের জায়গা নিয়ে নেবে। তাই তাদের হৃদয় থেকে ভাবতে শেখান।

আমি বিশ্বাস করি, আজকের শিক্ষাব্যবস্থা ভবিষ্যতের পৃথিবীর মানচিত্র। শিক্ষকেরাই হলেন সেই মানচিত্রের নকশাকার। আমার প্রথম চাকরি ছিল শিক্ষকতা। আমি চাই, আমার শেষ কাজও যেন হয় শিক্ষকদের সঙ্গেই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে, শিক্ষার মান উন্নয়নে। (সংক্ষেপিত)

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আদর রহমান

সূত্র: আলীবাবা গ্রুপের ইউটিউব চ্যানেল

মন্তব্য পড়ুন 0