default-image

মিসেস সুরাইয়া আহসানের অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পরে একটা কথা আপনি সব সময় বলতেন মিসেস মঞ্জুর। বলতেন, ‘আপা, চিন্তা করবেন না। যখন আমি সানবিমস ছাড়ব, আপনি-আমি দুজনে একসঙ্গে ছাড়ব।’ কিন্তু কথা তো আপনি রাখলেন না। হঠাৎ কোথা দিয়ে কীভাবে চলে গেলেন একবারও তো ভাবলেন না আমার কথা।

মনে পড়ছে, সিঙ্গাপুর থেকে নিউমোনিয়ার পর ঢাকায় এসে আমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন আপনি। আমি তখন গুলশানে বড় মেয়ের সঙ্গে থাকছি। এত দুর্বল শরীরে আপনার আসাটা সবার পছন্দনীয় ছিল না। তাই আপনাকে বললাম, ‘আচ্ছা, আমিই যাব আপনাকে দেখতে।’ তবে আপনি মনে করলেন, আমি ওই দিনই আপনাকে দেখতে যাব। ব্যস, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন, কোথায় আমি। স্কুল থেকে বের হয়ে ফুল কিনতে একটু দেরি হয়ে গেল। এরপর যখন আপনার বাসায় গেলাম, দেখেই বললেন, ‘আমিও শুধু ভাবছিলাম, এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়।’

সেদিন আমার জন্য এত বেলা পর্যন্ত না খেয়ে বসে ছিলেন দেখে খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। এরপর একসঙ্গে খেলাম। কত কথা হলো! নিউমোনিয়ার ইনজেকশন নিয়েছি শুনে আমাকে বললেন, কোথা থেকে নিলেন? আমি হাসপাতালের নাম বললাম। আমার দুর্ভাগ্যের কথা শুনলেন: নার্সের গাফিলতিতে আরেক হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে পাঁচ দিন। সেসুলাইটিজ হয়ে গিয়েছিল। সব শুনে মনে খুব কষ্ট পেলেন। ওই দিন তো আপনার সঙ্গে আমার শেষ খাওয়া। আপনাকে নিয়ে এত স্মৃতি যে কোনটা রেখে কোনটা বলি!

বিজ্ঞাপন
কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলতেন না আপনি। সম্মানবোধ ছিল তীব্র। ছোট-বড় সবাইকে একইভাবে সম্মান করতেন। আপনার রুম থেকে কোনো অভিভাবককে মন খারাপ করে বের হতে দেখিনি। মনে পড়ে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একবার বলেছিলেন, ‘স্কুল না করলে এত শ্রদ্ধা, এত সম্মান, এত ভালোবাসা কোথায় পেতাম।’ সত্যিই কী অপরিমিত শ্রদ্ধা, অগণিত ভালোবাসা আর সম্মান নিয়ে আপনি চলে গেছেন।

মিসেস মঞ্জুর, আপনার মতো নিরহংকার, পরোপকারী ও মার্জিত রুচির অধিকারী মানুষ আজকাল বিরলই বটে। সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখতেন আপনি। শুধু তা-ই নয়, সহকর্মী অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গেও আপনার আচরণ ছিল একই রকম। কারও সঙ্গে রাগ হয়ে কথা বলতে পারতেন না। কোনো কিছুকে নেতিবাচকভাবে নয়, ইতিবাচকভাবেই দেখতে ভালোবাসতেন।

আশপাশে যারা ছিল, কেউই আপনাকে আগেভাগে সালাম দিতে পারত না। এমনকি দারোয়ান, কাজের লোক, সহকর্মীরাও না। এ বিষয়টি লক্ষ করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক আজিজ সাহেব। একদিন খুব হতাশ গলায় বললেন, ‘আপা, কী ব্যাপার। ওনাকে কোনো দিন আগে সালাম দিতে পারলাম না।’ হেসে বললাম, ‘আমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।’

আমি একবার ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্সের জন্য ১৩ দিন হাসপাতালে ছিলাম। প্রথম দিকে আইসিইউতে, পরে কেবিনে। সে সময় মঞ্জুর সাহেবের (মঞ্জুর এলাহী) অসুস্থতার জন্য আপনিও ছিলেন সিঙ্গাপুরে। তবু নিজের সংকটের মুহূর্তেও প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার ছেলে সুমনের সঙ্গে কথা বলছেন—বলেছেন অসুস্থ আমার জন্য কী করতে হবে, সেসব নিয়ে।

মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মরতে যে হবে, তা জানিও। কিন্তু মিসেস মঞ্জুর, আপনার এই চলে যাওয়াটা যে কোনোমতে মেনে নিতে পারছি না আমরা।

আমার সঙ্গে আপনার পরিচয় কর্মসূত্রে। কখনো আপনার সমকক্ষ ছিলাম না আমি—না সামাজিক, না বৈষয়িক, না পারিবারিক—কোনো দিক দিয়েই নয়। তারপরও আপনার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ কীভাবে হয়েছিলাম! আপনার জন্ম হয়েছিল মারূপে। জানি, শৈশবে মা হারিয়ে মাতৃস্নেহে বড় করেছিলেন ছোট ছোট দুই ভাইবোনকে। আপনার সেই মাতৃস্নেহে ধন্য হয়েছে সানবিমসের অগণিত শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী। আপনার দুই ছেলেমেয়ে নাসিম-মুনার ছোটবেলার অভিযোগ ছিল, সানবিমস তাঁদের মায়ের তৃতীয় সন্তান। কথাটা কিন্তু মিথ্যা নয়। আপনার ধ্যানজ্ঞান, চিন্তাভাবনা—সবকিছু ছিল সানবিমস ঘিরে। কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলতেন না আপনি। সম্মানবোধ ছিল তীব্র। ছোট-বড় সবাইকে একইভাবে সম্মান করতেন। আপনার রুম থেকে কোনো অভিভাবককে মন খারাপ করে বের হতে দেখিনি। মনে পড়ে, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একবার বলেছিলেন, ‘স্কুল না করলে এত শ্রদ্ধা, এত সম্মান, এত ভালোবাসা কোথায় পেতাম।’ সত্যিই কী অপরিমিত শ্রদ্ধা, অগণিত ভালোবাসা আর সম্মান নিয়ে আপনি চলে গেছেন।

আপনি কি জানেন—আপনার সৃষ্টির চেয়ে আপনি কত মহৎ!

কোনো বাচ্চা পড়া পারছে না—এ কথা আপনাকে তীব্র আঘাত দিত। বাচ্চার পারিবারিক সমস্যা খুঁটিয়ে দেখে বলতেন, ওর ছোট একটা ভাই হয়েছে। মা দেখতে পারছে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। হতোও তা-ই।

বাচ্চাদের অনুপ্রেরণাস্থলও ছিলেন তিনি। বাচ্চাদের উৎসাহিত করতেন—হাসিমুখে, ধীর কণ্ঠে, কখনো গায় হাত বুলিয়ে বোঝাতেন। একবার গুরুতর এক অপরাধের কারণে একজন প্রিফেক্ট-এর ব্যাজ খুলে নিলেন। সারা দিন রাগে থমথম করছিল আপনার মুখ। কিন্তু বুকভরা মাতৃস্নেহও ছিল আপনার। তাই তো স্কুল ছুটির পর ছুটে গেলেন তার বাসায়, কী অবস্থা জানার জন্য। পরদিন স্কুলে এসেই মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন, ‘বুঝলেন না বয়সটা তো ভালো না, কী হয়।’ ততক্ষণে দুই চোখের পানিতে আমার গাল ভেসে গেছে। এর নামই কি সত্যিকারের ‘হেড অব দ্য ইনস্টিটিউশন’!

৪৩ বছর খুব কম সময় নয়। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই দীর্ঘ সময়ে কী পেয়েছি? টাকা? ওটা তো কোনো ব্যাপার নয়। সানবিমস আমার ধ্যান, জ্ঞান, মন, প্রাণ আর ভালোবাসা। আমার পরিচয়, আমার ঠিকানা এবং আমার অস্তিত্বও সানবিমস। এই প্রতিষ্ঠানটা আমাকে নিজের সম্বন্ধে ভাবতে শিখিয়েছে, নিজেকে চিনতে শিখিয়েছে। আমি যে শুধু তালুকদার সাহেবের মেয়ে নই, কবীর সাহেবের স্ত্রী নই, সুমন-রুপম-মাহীনের মা নই, আমি যে একটা আলাদা মানুষ, আমিও যে কিছু পারি—আমার মধ্যে এ চেতনা জাগিয়েছে সানবিমস। সানবিমসের ছোট দরজা পার হলেই মনে হতে থাকে এটা আমার, একান্তভাবেই আমার।

এখানে একটা ঘটনার কথা বলি। একদিন একটা বিয়ে থেকে বাড়ি যাচ্ছি। এ সময় ত্বরিত গতিতে একটা গাড়ি এসে থামল। গাড়িতে আপনার ছেলে নাসিমের সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। নাসিম ডাকাডাকি করে আমাকে গাড়িতে তুলে দিল। মেয়র সাহেবকে বলল, আমার বাংলা মিস, যা শিখেছি তা ওনার কাছে। কথাটা শুনে বুক ভরে গেল। নাসিমের পত্রিকায় বাংলা লেখার জন্য আমি উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকি। একবার লিখেছে বাংলাদেশ একটা অখণ্ড হীরা, একে ঘষেমেজে চকচকে করে তুলতে হবে আমাদের। এই নাসিম কি সত্যিই আমার ছাত্র! পরে মনে হলো, ছেলেটা কার দেখতে হবে তো। সে আপনারই ছেলে মিসেস মঞ্জুর।

সবশেষে একটা মজার ঘটনা বলি। নয়তো মিসেস মঞ্জুর, আপনাকে সম্যক বোঝা যাবে না। যখনই আপনি বিদেশে যেতেন প্লে-গ্রুপের জন্য অজস্র খেলনা নিয়ে আসতেন। একদিন অবাক হয়ে দেখলাম প্লে-গ্রুপে দুটি ছোট্ট খরগোশ দৌড়াদৌড়ি করছে। আর তার পেছনে পাগলের মতো ছুটছে বাচ্চারা। কিন্তু বাচ্চাদের আদরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে এক বেরসিক খরগোশ এক বাচ্চাকে কামড়ে দিল। মুহূর্তে আকাশ ভেঙে পড়ল। ওই বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়া হলো শিশু হাসপাতালে। ডাক্তার বললেন, বাচ্চাটি আজ অবজারভেশনে থাকবে। ফলে বাচ্চাকে এনে তার মাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো।

পরদিন স্কুলে এসেছি। রুটিনমাফিক সব চলছে। হঠাৎ আপনি এলেন সামনে। বললেন, বাচ্চাটার খবর নিয়েছেন?

সর্বনাশ! খবর নেওয়ার কথা মনেই ছিল না। অতঃপর ফোন করা হলো। কিন্তু ফোনটা কেউই ধরে না। এভাবে বেলা ১১টা নাগাদ সেই বাচ্চার বাসার কাজের ছেলে ফোন ধরল। জানাল ‘মা-বাচ্চা ভালো আছে, ঘুমাচ্ছে।’ এদিকে আপনি করলেন কী, ওই বাচ্চার সুস্থতার জন্য সাতটি রোজা মানত করে রাখতে শুরু করলেন। আপনার এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, এভাবেই তো আপনি সানবিমসের সব বাচ্চার মা হয়ে উঠেছিলেন। কেবল অর্থের বিনিময়ে এমন স্নেহ মেলে না।

জীবনসায়াহ্নে এসে আজ দেখতে পাচ্ছি, এ জীবনে কিছু আর চাওয়া-পাওয়ার নেই আমার। পরিবার–পরিজনের পাশাপাশি আপনার মতো অকৃত্রিম বন্ধু যে পেয়েছে, তার জীবনে চাওয়ার আর কীই–বা থাকে?

মিসেস মঞ্জুর, একমুহূর্তের জন্যও আমি ভুলতে পারি না আপনাকে। তাই বুক ভরা অভিমান নিয়ে বলি, কথা রাখলেন না কেন আপনি? আমি কি আর কখনো সানবিমসে ফিরে যেতে পারব, যেখানে প্রতিটি জায়গাজুড়ে লেগে আছে আপনার অনুভব ও উপস্থিতি? আমার তো মনে হয় না।

আপনার প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসা, মিসেস মঞ্জুর।

লেখক: সানবিমস স্কুলের শিক্ষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0