default-image

একই শ্রেণির ১২ জন শিক্ষার্থী। প্রত্যেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণা শেষে তাঁরা গবেষণাপত্র বা থিসিস পেপার জমা দেবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই শেষ হবে তাঁদের স্নাতক–জীবন।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের এই শিক্ষার্থীরা সারা বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়াশোনা করেন। প্রতি সেমিস্টারে তাঁদের অন্তত একটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কোর্স করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধের তথ্য–উপাত্ত, চলচ্চিত্র, গল্প—সবই তাঁদের পাঠ্য। এখন যেহেতু ক্যাম্পাস বন্ধ, একেকজন আছেন একেক জায়গায়। কেউ খুলনায়, কেউ কুমিল্লায়, কেউবা ঢাকার কেরানীগঞ্জে। তাঁদের সঙ্গে কথা হলো অনলাইনে, ‘গুগল মিট’–এ।
অধিকাংশ শিক্ষার্থীর গবেষণাতেই প্রাধান্য পাচ্ছে একেক এলাকার স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। শ্যামলী দের গবেষণার বিষয় যেমন ‘মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়া উপজেলা’, সালমা বিনতে সামছ্ কাজ করছেন কক্সবাজার জেলার ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ’ নিয়ে, শামসুল আরেফিনের গবেষণার বিষয় ‘মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের বর্তমান অবস্থা: আদর্শ সদর উপজেলা, কুমিল্লা’। মো. রিয়াদ হোসেন গবেষণা করছেন মুক্তিযুদ্ধকালে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে। এই তরুণ বললেন, ‘এ বিভাগে পড়ার সুবাদে নিজের এলাকাকে আরও ভালোভাবে জানতে পেরেছি। প্রথম বর্ষেই আমাদের একটা অ্যাসাইনমেন্ট ছিল, নিজ গ্রামের মুক্তিযুদ্ধ–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। চুকনগর গণহত্যা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে তখন জানলাম, এ গণহত্যায় যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই আমার উপজেলার বাসিন্দা। যত জেনেছি, তত শিহরিত হয়েছি।’

বিজ্ঞাপন

ইতিহাস যাঁদের পাঠ্যক্রমের একটা বড় অংশজুড়ে আছে, তাঁরা নিজেরাও কিন্তু ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগটি শুধু নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। আমরা যে ১২ গবেষকের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা সবাই প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এ বিভাগে ভর্তি হওয়ার সময় মাথায় কী চলছিল, জানতে চাই মো. শাকিল সাদমানের কাছে। ‘মুক্তিযুদ্ধে ব্রডকাস্ট জার্নালিজমের ভূমিকা: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। বললেন, ‘যখন ভর্তি হয়েছিলাম, এ বিভাগে পড়ে কোথায় চাকরি করব, আয়রোজগার কীভাবে হবে, সত্যি কথা বলতে আমি এসব নিয়ে ভাবিনি। প্রকৌশল বা বিবিএ পড়লেই যে নিশ্চিত চাকরি হয়ে যাবে, এমন তো নয়। নিজেদের ইতিহাস, নিজের দেশকে জানার আগ্রহ ছিল। তাই শুরু থেকেই আমার মধ্যে একধরনের রোমাঞ্চ কাজ করেছে।’ শিক্ষার্থীরা জানালেন, ইতিহাসের পাশাপাশি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লোকপ্রশসানের অনেক বিষয়ও তাঁদের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত।
পরবর্তী ব্যাচগুলোকে পথ দেখানোর একটা দায়িত্ববোধও তাঁদের মধ্যে আছে। তাই সারা বছর ধরে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ–সংক্রান্ত বিভিন্ন সভা–সেমিনারের আয়োজন করেন এ শিক্ষার্থীরা। জানা গেল, তাঁদের আয়োজিত সেমিনারে দেশ-বিদেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা অংশগ্রহণ করেন।
করোনাকালে অনলাইনেও তাঁরা বেশ কয়েকটি সেমিনার (ওয়েবিনার) আয়োজন করেছেন। বিভাগের শিক্ষকদের বিভিন্ন গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে ছাপা হয়েছে। আর শিক্ষকদের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের করেছে আরও সমৃদ্ধ। শ্যামলী দে বলছিলেন, ‘আমরা দেখেছি, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবে বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। তাই পুরোপুরি নিরপেক্ষভাবে তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সঠিক ইতিহাস জানা ও জানানো এ বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।’ বিভাগের চেয়ারম্যান দিব্যদ্যুতি সরকার অবশ্য বললেন, পুরোপুরি নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘একটু পক্ষপাতিত্ব আসবে। সেটা নিজের দেশের প্রতি। এটা স্বাভাবিক।’
গত চার বছরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখাপড়া করতে গিয়ে একেক শিক্ষার্থীকে একেক বিষয় আলোড়িত করেছে। বিভিন্ন সময় দল বেঁধে খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, নোয়াখালী ঘুরে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছেন, তথ্য সংগ্রহ করেছেন। গবেষণার বিষয় নির্বাচন করতে গিয়ে আগ্রহের বিষয়টির ওপরই গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। তাসনোভা জেরিন যেমন মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান নিয়ে আগ্রহী। তাঁর গবেষণার বিষয় ‘বাংলার সাধারণ নারীর জীবনসংগ্রাম ১৯৭১: সাহেববাদ ইউনিয়ন’। নুসরাত জাহানের গবেষণাতেও প্রাধান্য পেয়েছে নারীর অবদান। নুসরাত বলছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের আলোচনা, ভাবনা কেবল ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, কিংবা একটা রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সারা বছর আমরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে পারি, এটাই বড় পাওয়া।’

default-image

‘মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ল্যাব’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে

ড. দিব্যদ্যুতি সরকার

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ অধ্যয়ন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগে বিএসএস (সম্মান) শ্রেণিতে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা চালু করার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মাঠ গবেষণায় দক্ষ করে তোলার জন্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের ‘নিজ গ্রাম সমীক্ষা’, ‘নিজ ক্যাম্পাস সমীক্ষা’, গবেষণাপত্র লেখা, উপস্থাপনা ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। উচ্চতর গবেষণার জন্য বিভাগে সম্প্রতি ‘মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ল্যাব’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে দুই দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বিভাগে একটি দ্বিভাষিক প্রামাণ্যগ্রন্থ প্রণয়নের কাজ চলছে। আশা করি আমাদের বিভাগ থেকে পাস করে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও প্রশাসন পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধ চর্চার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার পরিচয় দেবে।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন