default-image

ছোটবেলা থেকেই সাইয়েদুল মোস্তায়িনের মূল আগ্রহের বিষয় ছিল ইলেকট্রনিকস। বাসার সব খেলনা থেকে মোটর এবং সার্কিট বের করে সেগুলো দিয়ে কিছু একটা বানাতে চেষ্টা করত।

সপ্তম শ্রেণি থেকে শখটা আরও বেড়ে যায়। ইন্টারনেট ঘেঁটে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং–সম্পর্কিত নানা রকম লেখা নিজের কম্পিউটারে নামিয়ে পড়ত। এভাবেই প্রোগ্রামিং ভাষা শেখা শুরু করে। সেই সঙ্গে ইলেকট্রনিকসের খুঁটিনাটি বিষয় আয়ত্তে আনতে থাকে। তারপরই রোবটিকসে (রোবটবিজ্ঞান) আগ্রহী হয়ে ওঠে। বানাতে থাকে একটার পর একটা রোবট। দেশে–বিদেশে নানা প্রতিযোগিতায় পেয়েছে পুরস্কারও।

বিজ্ঞাপন

রোবট বানানো যখন নেশা

সাইয়েদুল মোস্তায়িনের বয়স ১৬ বছর। বড় হয়ে ওঠা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায়। এখানেই ম্যাগপাই প্রি–ক্যাডেট অ্যান্ড কিন্ডারগার্টেনে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হয় হাতীবান্ধা এস এস সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে। ২০১৯ সালে এসএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছে হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন সরকারি কলেজে।

সাইয়েদুল মোস্তায়িন বলে, ‘রোবট নিয়ে কাজ করা আমার জন্য সহজ ছিল না। প্রথম দিকে বাসার কেউ জানত না। রোবট বানানোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখতাম। যখন বাবা কলেজে ক্লাস নিতে যেত আর মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকত, তখন আমি আমার কাজ শুরু করে দিতাম।’ যে পরিকল্পনাগুলো সাইয়েদুলের মাথায় আসত, সেগুলো বানিয়ে ফেলত। প্রথম যে রোবটটি সে বানায়, সেটির নাম অ্যাম্বুলেন্স ইউএভি। সে বলে, ‘যেদিন বানাতে সফল হয়েছিলাম, সেদিনই মা–বাবাকে দেখিয়েছিলাম। মা উৎসাহ দিলেও বাবা বলেছিল যে “কী হবে এসব করে? তুমি কি ঢাকা থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে থেকে ভালো কিছু করতে পারবা?”’

সফলতার শুরু

২০১৭ সালে ৩৮তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে জেলা, উপজেলা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় সাইয়েদুল। এরপর জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সে। সাইয়েদুল বলল, ‘পুরস্কার দেওয়ার সময় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের মহাপরিচালক স্যার বলেছিলেন, “তুমি এত দূর থেকে এসে এত বড় একটা জায়গা নিতে পেরেছ, এটা বিশাল ব্যাপার।”এরপর থেকেই আমার কাজ করার ইচ্ছেটা আরও প্রবল হয়ে যায়।’

সাইয়েদুল মোস্তায়িন পরের বছর ৩৯তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে দেশসেরা তরুণ উদ্ভাবকের খেতাব পায়। সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াডে সৃজনশীল বিভাগে সোনার পদক জিতে নেয়। ২০১৯ সালে ৪০তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে বিশেষ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে।

দেশের রোবট নিয়ে বিদেশে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার অর্জন। সাইয়েদুল মোস্তায়িন বলছিল, ‘এসএসসি পরীক্ষার আগে তুরস্ক থেকে বড় ভাই ফোন দিয়ে টেকনোফেস্ট ইস্তাম্বুলে আবেদন করতে বলল।’

বিশ্বের ৫০ হাজার প্রতিযোগী আবেদন করেছিল। তাদের মধ্যে ১০ হাজার জন সুযোগ পাবে তুরস্কে গিয়ে নিজের কাজ উপস্থাপন করতে। দুই পর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্ব। ফাইনালে ১০টি প্রকল্প তহবিল পাবে।

সাইয়েদুল বলে, ‘জুলাইয়ের শেষ দিকে একদিন বিকেলে গণিত পড়ে বাসায় এলাম। দেখলাম মা অনেক খুশি। মা শুধু বলল, অনেক ভালো খবর আছে বাবা, তোর ভাইয়াকে ফোন দে। দেরি না করে ভাইয়াকে ফোন দিয়ে জানলাম, আমি চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছি ও তহবিল পেয়েছি।’

এরপর কোমর বেঁধে নেমে পড়ার পালা। রোবট প্রস্তুত করে ২০১৯–এর সেপ্টেম্বরে তুরস্কের পথে উড়াল দিল সাইয়েদুল। সে বলল, ‘প্রতিযোগিতা শুরু হলো। ২০টি দেশ থেকে ৯০ জন প্রতিযোগী। ৩ দিন চলে গেল। চূড়ান্ত ১৫–তে জায়গা করে নিলাম।’ সব শেষে ফলাফল ঘোষণার পালা। ষষ্ঠ স্থানে দেখা গেল বাংলাদেশের পতাকা এবং সাইয়েদুলের নাম।

করোনাকালে অনলাইন প্রতিযোগিতায়

সাইয়েদুল মোস্তায়িন করোনাকালে নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এটি এবার হয়েছে অনলাইনে। তার টিম শকওয়েভ দলের তৈরি করা ভেন্টিলেশন সিস্টেম এবং অটোনোমাস ইউএভি (আনম্যান্ড অ্যারিয়েল ভেহিক্যাল) প্রকল্প বাংলাদেশ পর্বে নির্বাচিত হয়। নাসার চূড়ান্ত পর্বেও স্থান পায় এই প্রকল্প।

রোবটিকসই সাইয়েদুলের পছন্দের কাজ। তরুণদের রোবটিকস শিক্ষার জন্য একটি স্টার্টআপ নিয়ে কাজ করছে এখন। যেটির নাম রোবোশালা বাংলাদেশ (www.roboshala.com.bd)। এতে বাংলায় রোবটিকসের প্রাথমিক বিষয়গুলো শেখানো হয়।

সাইয়েদুল মোস্তায়িন বলে, ‘রোবটিকস নিয়েই স্বপ্ন দেখি। এ বিষয়েই পড়তে চাই।’ সে মনে করে, একদিন আমাদের দেশ থেকেই রপ্তানি হবে উচ্চবুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট। আর তাতে লেখা থাকবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন