default-image

ঢাকায় দেখা হলো লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা কাওসার আলমের সঙ্গে। ঢাকায় পা রাখার আগে তিনি ৫২টি জেলা ঘুরে এসেছেন। উদ্দেশ্য—বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়া। গত জুলাই মাস থেকে সারা দেশ ঘুরে সবাইকে গাছ দিচ্ছেন এই তরুণ।

কাওসার বললেন, ‘স্কুল-কলেজ তো বন্ধ। তাই রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের গাছ দিচ্ছি।’ কাওসারের হিসাব অনুযায়ী, গত চার মাসে সারা দেশে মোট ৮৪ হাজার ৯০০ গাছের চারা দিয়েছে তাঁদের সংগঠন লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘ। এক লাখ চারা বিতরণের মাইলফলক স্পর্শ করে আপাতত থামবে এই যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে এক লাখ গাছের চারা বিতরণ করেন তাঁরা। মূলত শিক্ষার্থীদের হাতেই চারাগুলো তুলে দেওয়া হয়। চারা হাতে নিয়ে তাদের ইভ টিজিং, মাদক, আর ধর্ষণের বিরুদ্ধে শপথ করানো হয়। একই সঙ্গে এই নেতিবাচক বিষয়গুলোকে প্রতীকী লাল কার্ড দেখিয়ে রুখে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অন্যদিকে বৃক্ষরোপণ আর দেশপ্রেমের মতো ইতিবাচক বিষয়গুলোকে সবুজ কার্ড দেখিয়ে স্বাগত জানান তাঁরা।

লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘের সদস্যদের সবাই শিক্ষার্থী। কাওসার পড়াশোনা করছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষে। তিনি জানালেন, সদস্যরা নিজেদের টিফিনের টাকা, হাতখরচ বাঁচিয়ে প্রতি মাসে ন্যূনতম ১০ টাকা করে চাঁদা দেন। এই টাকা জমিয়েই কেনা হয় গাছ। নিজেদের সদস্যদের বাইরে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণ করেন না তাঁরা। বর্তমানে দেশের ৪৫ জেলায় তাঁদের কমিটি আছে। সব মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।

প্রতিবছর জেলা কমিটির সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করেন। তবে এবার করোনা মহামারির কারণে কাওসার নিজেই সারা দেশ ঘুরে চারা বিতরণ করছেন।

যদিও খুব ছোট পরিসরে বছর দশেক আগে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কাওসার ও তাঁর বোন ফারজানা আক্তার দুজনেই তখন স্কুলের শিক্ষার্থী। সেনাবাহিনীতে বাবার চাকরির সুবাদে দুজনেই শিক্ষাবৃত্তি পেতেন।

ফারজানা বলেন, ‘আমরা দুই ভাইবোন তখন ভাবছিলাম এই টাকা দিয়ে কী করা যায়! তখন ভাইয়ার পরামর্শে আমাদের এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কিছু বই-খাতা কিনে দিলাম। আমাদের এই কার্যক্রম দেখে স্কুলের বন্ধুরাও কিছুদিন পর আমাদের সঙ্গে যোগ দিল।’

এরপর ২০১১ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে লাল-সবুজ সমাজ উন্নয়ন সংঘ। শুরুতে দাউদকান্দি উপজেলার মধ্যেই তাঁদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। আস্তে আস্তে পুরো কুমিল্লা জেলায় সংগঠনটির কমিটি গড়ে উঠতে শুরু করে। এরপর কুমিল্লা ছাড়া অন্য জেলাগুলোতে কার্যক্রম শুরু হতে থাকে।

২০১৩ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে তাঁরা গাছের চারা দেওয়া শুরু করেন। সংগঠনের কলেবর বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশজুড়ে কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পেতে থাকে। করোনায় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে চারা প্রদান, শপথ বাক্য পাঠ করানোর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। এসব আলোচনায় তাঁরা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের যুক্ত করেছেন।

মহামারির এই সময়েও তাঁদের কার্যক্রম থেমে নেই। প্রতিটি কমিটির সদস্যরা নিজেদের দেওয়া চাঁদার অর্থ দিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী, মাস্ক, সাবান ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেছেন। এ ছাড়া মানুষকে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে সচেতন করতে কাজ করছেন সংগঠনটির সদস্যরা।

কাওসার বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো ভালো মানুষ গড়ে তোলা। আমাদের দেখাদেখি যদি আরও পাঁচজন শিক্ষার্থী ভালো কাজ করার শপথ নেন, তাহলেই আমাদের এই কাজ সার্থক হবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0