বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শেখায়। শেখানো তো সহজ! ইউটিউবে ভিডিও দেখে যে কেউ শিখতে পারে। কিন্তু মুক্তচিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, টিম প্লেয়ার হয়ে ওঠা—এসবের জন্য লাগে যথাযথ পরিবেশ।
ভিনসেন্ট চ্যাং, উপাচার্য, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছে দিতে কোন বিষয়গুলোর ওপর আপনি জোর দিচ্ছেন?

প্রথমত, আন্তর্জাতিকীকরণ। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক উদ্যোগ এবং তৃতীয়ত, প্রভাববিস্তারী গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাকে জ্ঞান তৈরি করতে হবে, মানুষকে শিক্ষিত করতে হবে। এই দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান তৈরি করা নির্ভর করে গবেষণার ওপর। তবে শিক্ষিত করা মানে কিন্তু কেবল শেখানো নয়। আমি আপনাকে সি প্লাস প্লাস বা পাইথনের মতো প্রোগ্রামিংয়ের ভাষা শেখাতে পারি, শেক্‌সপিয়ারের কবিতার আবৃত্তি শেখাতে পারি। এগুলো স্রেফ কারিগরি জ্ঞান। কিন্তু শিক্ষার আরও কিছু উপাদান আছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো চিন্তার স্বাধীনতা, সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে তোলা। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শেখায়। শেখানো তো সহজ! ইউটিউবে ভিডিও দেখে যে কেউ শিখতে পারে। কিন্তু মুক্তচিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, টিম প্লেয়ার হয়ে ওঠা—এসবের জন্য লাগে যথাযথ পরিবেশ।

default-image

সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপরও নিশ্চয়ই আপনারা বিশেষ গুরুত্ব দেন?

শিক্ষার অন্য উপাদানগুলোও যেন আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যথাযথভাবে পায়, সে জন্য ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কয়েকটি বিশেষায়িত প্রোগ্রাম আছে। যেমন আমাদের আবাসিক সেমিস্টার পদ্ধতি। করোনায় দীর্ঘ বন্ধের পর সম্প্রতি আমরা আবার আবাসিক সেমিস্টার চালু করেছি। এক সেমিস্টারের জন্য শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে থেকে পড়ালেখা করছে—বাংলাদেশের জন্য এটা একটা অনন্য আইডিয়া। আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো—ডিউক অব এডিনবার্গ স্কিম প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, শেখে। আরেকটা বাধ্যতামূলক প্রোগ্রাম চালু করার কথা আমরা ভাবছি—সব শিক্ষার্থীকে ব্র্যাক এনজিওর কোনো না কোনো প্রকল্পে এক-দুই সপ্তাহ কাজ করতে হবে। হোক সেটা ব্র্যাকের প্রধান কার্যালয়ে, মাঠপর্যায়ের প্রকল্পে, কক্সবাজার, পূর্ব আফ্রিকা কিংবা অন্য কোথাও।

করোনাকাল কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনে সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিল?

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুমের বাইরেও কিছু কার্যক্রম থাকে। একসঙ্গে খেতে যাও, দলবেঁধে ফুটবল খেলো, একসঙ্গে হাসো—এসবও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সামাজিক প্রাণী, যন্ত্র নই। বেশির ভাগ মানুষ জীবনের সেরা বন্ধুটাকে পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। এখানেই পৃথিবীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সবকিছু কি ক্লাসরুমেই শিখেছি? না। এমনকি আমার সিজিপিএও খুব ভালো ছিল না। কিন্তু চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই জেনেছি—আমি কে?

বিষয়টা জয়-পরাজয়ের নয়। বক্সিং রিংয়ের ভেতরে যে থাকে, সে-ই জানে কীভাবে ঘুষি মারতে হয়, ঘুষি খেতে কেমন লাগে। সে পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। যখন তুমি জিতলে, তখন জয় পেলে। কিন্তু যখন হেরে গেলে, তখন অন্তত জানলে, হারতে কেমন লাগে। অন্তত টিভির সামনে বসে থাকা মানুষটার চেয়ে অভিজ্ঞতায় তুমি এগিয়ে। বাংলাদেশের জন্য এখন সেই তরুণ দল দরকার, যারা রিংয়ের বাইরে নয়, ভেতরে থাকবে।

গত দুই বছরে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে, এটা কি আপনার কাছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশঙ্কাজনক মনে হয়?

আশঙ্কাজনক বলব না। কিন্তু বলব, ওদেরকে মুখোমুখি ক্লাসের অভিজ্ঞতা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। অন্যদিকে প্রযুক্তিকেও অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনলাইনে পাঠদানের একটা ওয়েব সিস্টেম আছে, আমরা বলি বাক্স। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এক্স। এই এক্স হলো অজানার প্রতীক, গণিতে যেমনটা থাকে। প্রযুক্তি আমাদের জন্য নতুন কী হাজির করবে, আমরা জানি না। আপনি পছন্দ করেন বা না করেন, নতুন নতুন প্রযুক্তি তো আসবেই। এর সঙ্গে তাল মেলাতে হবে।

যদি বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীর উদ্দেশে আপনাকে একটা ছোট চিঠি লিখতে অনুরোধ করা হয়, কী লিখবেন?

নিজের কাছে সৎ থাকো। হৃদয়ের ডাক শোনো। অন্য রকম হয়ে দেখাও। স্রেফ কথা না বলে করে দেখাও। টেডি রুজাভেল্টের একটা বক্তৃতা মনে পড়ছে, যার শিরোনাম, ‘দ্য ম্যান ইন দ্য এরেনা’। তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধের ময়দানে যে থাকে, কৃতিত্ব তাঁরই। কৃতিত্ব কখনোই সমালোচকের হয় না। আমরা যখন ফুটবল খেলা দেখি, দর্শকের সারিতে বসে বলি, ‘আহহা, এভাবে কেন খেলল?’ ‘এত সহজ সুযোগটা মিস করল!’ দিন শেষে কৃতিত্ব কিন্তু মাঠের ভেতরে যে থাকে সে-ই পায়। গ্যালারিতে বা টিভির সামনে যে বসে থাকে, সে পায় না। বিষয়টা জয়-পরাজয়ের নয়। বক্সিং রিংয়ের ভেতরে যে থাকে, সে-ই জানে কীভাবে ঘুষি মারতে হয়, ঘুষি খেতে কেমন লাগে। সে পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। যখন তুমি জিতলে, তখন জয় পেলে। কিন্তু যখন হেরে গেলে, তখন অন্তত জানলে, হারতে কেমন লাগে। অন্তত টিভির সামনে বসে থাকা মানুষটার চেয়ে অভিজ্ঞতায় তুমি এগিয়ে। বাংলাদেশের জন্য এখন সেই তরুণ দল দরকার, যারা রিংয়ের বাইরে নয়, ভেতরে থাকবে।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন