default-image

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বলছেন, ‘কয়েক দশকের মধ্যেই আরেকটি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বিশ্ব, সেটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। মহামারি যতটা ভয়াবহ হয়ে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তন হবে এর চেয়েও ভয়ংকর।’ আগামী দিনের এই বিপর্যয় রোধ করতে কাজ করছেন সারা বিশ্বের বহু গবেষক, বিজ্ঞানী। ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তানভীর ফেরদৌসও তাঁর শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের নিয়ে নিজেদের জায়গা থেকে অবদান রাখতে চেষ্টা করছেন।

অস্ট্রেলিয়ার মোনাস ইউনিভার্সিটিতে তানভীর ফেরদৌসের পিএইচডির বিষয় ছিল প্রাকৃতিক উপায়ে দূষিত পানি শোধন করা। অধ্যাপক তানভীর বুঝিয়ে বলছিলেন, ‘বিভিন্ন জৈব পদার্থ, যেমন কাঁকড়, নারকেলের ছোবড়া, কয়লা ইত্যাদির মাধ্যমে ওয়েটল্যান্ড তৈরি করা হয়, যাতে থাকে ফ্র্যাগমাইট নামের একধরনের ঘাস ও কলাবতীগাছ। যে ঘাস ও গাছ একটি ম্যাটের ওপর লাগিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এটি দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং এর শিকড় থেকে সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া বায়োফিলিক পদ্ধতিতে পানির দূষিত পদার্থ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এ ছাড়া পানির বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেনের চাহিদা ও কেমিক্যাল অক্সিজেনের চাহিদা সঠিক মাত্রায় নিয়ে আসে, যা দূষিত পানি পরিশোধন করে।’

বিজ্ঞাপন

গাছের শিকড় পানিতে ভাসমান আবর্জনা ও অদ্রবণীয় বর্জ্যকে আলাদা করতেও সাহায্য করে। আর এই পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় ফ্র্যাগমাইট ও কলাবতীগাছ ছড়িয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন জলাধারে।
পিএইচডি শেষে তানভীর ফেরদৌসের মনে হয়েছিল, প্রকল্পটি তো দেশেই করা যেতে পারে। পরিবেশবান্ধব ও সময়োপযোগী এই প্রকল্পের দায়িত্ব তিনি তুলে নেন নিজের কাঁধে। শুরুটা সহজ ছিল না। জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালে তিনি সফল হন। দেশেই তৈরি করেন ওয়েটল্যান্ড, যার মাধ্যমে ট্যানারির দূষিত পানি পরিশোধন সম্ভব।
তানভীর ফেরদৌস জানান, পরে বস্ত্র শিল্পের বর্জ্য থেকে শুরু করে নানা জায়গায় দূষিত পানি পরিশোধনে তাঁর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার পানি শোধনে এই প্রকল্প ব্যবহার করে গবেষণায় ভূমিকা রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০১৩ সালে তাঁকে পুরস্কৃত করে।
২০১৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সহযোগী ফেলো অধ্যাপক তানভীর ফেরদৌস তাঁর ক্যাম্পাসেই গড়ে তোলেন গবেষণাকেন্দ্র। তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তানভীর ফেরদৌস বলেন, ‘ধানমন্ডি লেক বা হাতিরঝিলের মতো দেশের নানা জলাধারের পানি শোধনে আমি কাজ করেছি।’ ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছ থেকে তিিন পেয়েছেন স্বর্ণপদক।
তবে কার্যক্রম এখানেই থেমে যায়নি। ইট নিয়েও গবেষণা করেছেন তিনি। ইট তৈরির সময় এর একটা বড় অংশ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত তাপমাত্রায় পুড়ে যাওয়া। এই পোড়া ইটকে ঝামা ইট বলা হয়। ইটের ভাটায় ঝামা ইটের স্তূপ দেখা যায়। পরিত্যক্ত ঝামা থেকেই কীভাবে দূষিত পানি শোধন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তা আবিষ্কার করেন তানভীর ফেরদৌস, যা মাইক্রোবায়াল কন্সট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড নামে পরিচিত। সেই সঙ্গে তিনি অর্গানিক বায়োচার, বর্জ্য স্টিল স্লাগ এবং নারকেলের ছোবড়া ব্যবহার করে দূষিত পানি শোধন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছেন। তাঁর এই গবেষণা বিখ্যাত গবেষণা সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ–এর ফেব্রুয়ারি ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রকল্পে তাঁকে সহযোগিতা করেন ইউএপির পুরকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জিহাদ মিয়া। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছেন ইউএপির পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দ তাকরিম জামান। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা দূষিত পানির মতো বড় সমস্যাকে সম্পদে পরিণত করেছি, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।’
আরেক শিক্ষার্থী তাওহীদ বিন রশিদ খান বলেন, ‘ওয়েটল্যান্ড যদি দেশের প্রতিটি কারখানায় স্থাপন করা যায়, তবে দূষণের হার আরও কমে যাবে। আমরা আশা করি এই কাজের প্রসার ঘটলে বাংলাদেশকে জিরো পলিউশন রেটে আনা সম্ভব।’

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন