default-image

আপনি বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সিইও। যখন টিনএজার ছিলেন, কখনো ভেবেছিলেন এই অবস্থানে পৌঁছাবেন?

(হেসে) নিশ্চয়ই নয় স্যার। আমি ভারতের দিল্লি আর হায়দরাবাদে বড় হয়েছি। সত্তরের দশকের হায়দরাবাদ এখনকার মতো ছিল না। স্যাটেলাইট টিভি ছিল না, মার্কিন পপ সংস্কৃতি তখনো সেখানে পৌঁছেনি। কিন্তু অনেক পড়ার, জানার মতো সময় ও সুযোগ আমার হয়েছিল। কিছুদিন আগেই আমার মেয়ের সঙ্গে গল্প করছিলাম। মনে আছে গ্রীষ্মের ছুটিতে রুশ লেখকদের বই পড়তাম, ক্রিকেট খেলতাম। ক্রিকেট আর সাহিত্যই ছিল আমার আগ্রহের বিষয়।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীর প্রতি কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আপনাকে একজন সফল মানুষ হতে সাহায্য করেছে?

এটা নির্দিষ্ট করে বলা খুব কঠিন। তবে আমি মনে করি, আমি সব সময় কৌতূহলী ছিলাম। পরের চাকরিতে গিয়ে আমি আমার সেরাটা দেব, এমন কখনো ভেবেছি বলে মনে পড়ে না। আমি মাইক্রোসফটে যোগ দিয়েছি ১৯৯২ সালে। সব সময় ভেবেছি, আমি একটা দারুণ কাজ করছি, হতে পারে এটাই আমার শেষ কর্মস্থল এবং আমি ভালোবেসে কাজ করেছি। প্রতিদিন একই রকম কৌতূহল, শক্তি, শেখার আগ্রহ নিয়ে দিন শুরু করার মানসিকতা সম্ভবত আমার সহজাত। আমি বলছি না আমার মধ্যে যা আছে সেটাই সেরা। কিন্তু মানুষ যখন উপদেশ চায়, সব সময় বলি, তোমার সেরাটা দেওয়ার জন্য পরের কাজের অপেক্ষা কোরো না। এখন যা করছ, সেখানেই নিজের সেরাটা দাও।

default-image

করপোরেট জগতে একটা ধারণা প্রচলিত আছে, এখানে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থাকতে হয়, অন্যকে সরিয়ে দিয়ে নিজের জায়গা করে নিতে হয়, নিজের ‘মার্কেটিং’ করতে হয়। সত্যি বলতে আপনাকে কখনোই তেমন মনে হয় না। কিন্তু এসব কাজ কি মানুষকে সত্যিই সাহায্য করে? আপনি কী মনে করেন? কিংবা যদি অন্যভাবে বলি, এসব না করা সত্ত্বেও আপনার অবদান চোখে পড়ল কীভাবে?

মনে আছে, যখন সিইও পদের জন্য সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েছিলাম, একজন পরিচালক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কি সিইও হতে চাও?’ আমি বলেছিলাম, ‘যদি আপনারা চান।’ তিনি বলেছিলেন, ‘না, এভাবে বলতে হয় না। যদি সিইও হতে চাও, তোমাকে দৃঢ়ভাবে বলতে হবে যে হ্যাঁ, আমি চাই।’ স্টিভ বালমারকে (মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) গিয়ে যখন ঘটনাটা বললাম, তিনি বললেন, ‘যা বলেছ ভালো বলেছ। কারণ এটাই তুমি।’ আমার এই আচরণ সম্ভবত এসেছে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস থেকে। চোখে পড়া, পুরস্কৃত হওয়া, এসব আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না।

আপনি নিজের সাফল্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেন? মাইক্রোসফটের সিইও হওয়া কিংবা নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক লক্ষ্য পূরণ করাই কি আপনার কাছে সাফল্য?

সাফল্য কিংবা আকাঙ্ক্ষার ধারণা সময়ে সময়ে বদলায়। একসময় মনে হতো, জাতীয় ক্রিকেট দলে সুযোগ পাওয়াটাই সাফল্য। সে ক্ষেত্রে আমি ব্যর্থ হয়েছি। তারপর ভিন্ন একটা লক্ষ্য ঠিক করলাম—ভালো প্রকৌশলী হতে হবে, ভালো চাকরি পেতে হবে। সেখানে সফল হলাম। সত্যি বলতে, জীবনে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে আমার সন্তান জেইনের জন্মের পর। ও সেরিব্রাল পালসিতে (মস্তিষ্কের অবশভাবের কারণে শরীরের চলন বা নড়াচড়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা) আক্রান্ত। আমি যখন ওর চোখে পৃথিবীকে দেখলাম, জানলাম বাবা হিসেবে আমার কর্তব্য কী, আমার অবস্থান থেকে আমার কী করা উচিত। অর্থাৎ আমার পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সম্প্রদায়ে যারা আছে, তাদের প্রতি এক ধরনের সমানুভূতি তৈরি হওয়া এবং তার ভিত্তিতে নিজের আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্যকে বদলানো। জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই মহামারি কি কাজের ধরন সম্পর্কে আপনার ধারণায় কোনো পরিবর্তন এনেছে? এটি কি আপনার প্রতিষ্ঠানকে নতুন কোনো কৌশলগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

নিশ্চয়ই। সবকিছুই দূর থেকে করার এক অভূতপূর্ব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। অনেক শিক্ষা নিয়ে আমরা এই পরিবর্তন থেকে বেরিয়ে আসব। কিছু পেছনে ফেলে আসব, আবার কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন বহন করে সামনে এগোব। মাইক্রোসফটে শুরুতেই কর্মীদের স্বাস্থ্য গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্দেশনা আসার আগেই আমরা কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তখন বুঝলাম, সম্মুখসারির যোদ্ধাদের ‘ডিজিটাল’ সহায়তা দেওয়ার জন্য আমাদেরও সম্মুখসারিতে থাকতে হবে; হোক সেটা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কিংবা অন্য কোনো খাতে। সবাই দূরে দূরে থেকেও দারুণভাবে এই কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রযুক্তি আমাদের সাহায্য করেছে। একজন খুচরা বিক্রেতারও তাঁর পণ্য বিক্রির জন্য অ্যাপের প্রয়োজন হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বহুদিন ধরে আমরা টেলিমেডিসিনের কথা বলে আসছি। আমার মনে হয় আমরা আর কখনোই চিকিৎসার জন্য পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাব না। মানুষ প্রথমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রাথমিক চিকিৎসা নেবে, টেলিমেডিসিন ব্যবহার করবে, তারপর প্রয়োজনে হাসপাতালে যাবে। আমি মনে করি, স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানোর এটি একটি দারুণ উপায়। শিক্ষা খাতেও আমূল পরিবর্তন আসছে। মাইক্রোসফট সব পর্যায়ের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে এই সংকট পেরোতে সাহায্য করছে। প্রথমত আমাদের কাজ হলো অর্থনীতিটা সচল রাখতে সহায়তা করা, সেই সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে নতুনভাবে ভাবা যায়, তা মানুষকে জানানো।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মো. সাইফুল্লাহ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0