বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খুলেছে ৫ অক্টোবর। সেদিন ক্যাম্পাসে পা রেখে দেখা হলো ঠিকানায় ফেরা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। একেকজনের দুই হাতভর্তি গাট্টিবোঁচকা, বইখাতা। আর চোখে-মুখে বহুদিন পর দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাস।

‘বিধিনিষেধের পুরোটা সময়ই কষ্ট করে মেসে থাকতে হয়েছে। তাই দীর্ঘদিন পর হলে ওঠা স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে।’ এভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের হল খুলে দেওয়া হয়েছে ৭ অক্টোবর। তবে প্রথম দিন খুব বেশি ছাত্রছাত্রীর দেখা পাওয়া যায়নি। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টের ছাত্র শাদমান সাকিব বলেন, ‘এখন তো মূলত চতুর্থ বর্ষ ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের জন্য হল খোলা হয়েছে। এসব ব্যাচের বেশির ভাগেরই ল্যাব শুরু হবে পূজার বন্ধের পর। তাই অনেক শিক্ষার্থীই এখনো হলে ওঠেনি।’ আবার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, আবার হয়তো সব স্বাভাবিক হবে—এই প্রত্যাশায় অপেক্ষায় আছেন তিনি।

কেমন ছিল প্রস্তুতি

দীর্ঘদিন পর হল খুলছে, তাই স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে, শিক্ষার্থীদের বরণ করতে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়েছে হলগুলো। অধিকাংশ হলের বাইরে বেসিন ও সাবান-পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কথা হলো সূর্য সেন হলের প্রভোস্ট মোহাম্মদ মকবুল হোসেন ভূইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতায়। এ ছাড়া ওয়াশরুম, রিডিংরুম, ক্যাফেটেরিয়া অনেক দিন ব্যবহৃত না হওয়ায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছিল। মেরামত করে শিক্ষার্থীদের উপযোগী করছি। এ ছাড়া হলের অন্যান্য সংস্কারকাজও সম্পন্ন হয়েছে।’

default-image

শুধু নতুন রূপে ফেরা নয়, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল। হলের প্রভোস্ট নাজমুন নাহারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাঁদের প্রস্তুতির কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চেষ্টা করেছি। গেটের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রণীত নির্দেশাবলি–সংবলিত পোস্টার বেশ বড় করে টাঙানো হয়েছে। হলের প্রবেশমুখে আমরা শিক্ষার্থীদের মাস্ক দিয়েছি। হ্যান্ড স্যানিটাইজিং এবং থার্মাল স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষার পর হলে প্রবেশ নিশ্চিত করেছি। এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় মশার ওষুধের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।’

আবার দেখা

দীর্ঘদিন পর হলে পা রাখছেন শিক্ষার্থীরা। মাঝখানে পেরিয়েছে অনেকগুলো দিন। হলের অবস্থা কি আগের মতোই আছে? জাহাঙ্গীরনগরের স্বর্ণালীর অভিজ্ঞতা তো শুরুতেই জানা হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী আবরারের বক্তব্য শোনা যাক। ‘বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কার হয়েছে দেখলাম। হল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিনের বন্ধের সুবাদেই হয়তো এসব কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে। এখন দেখা যাক কত দিন সবকিছু এভাবে ঠিকঠাক থাকে।’ অসন্তুষ্টির কথাও বললেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হলে বিভিন্ন সংস্কারকাজ হলেও রুমগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা হয়নি। আমাদের নিজেদেরই পরিষ্কার করতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হল কর্তৃপক্ষের সহায়তা পেলে ভালো হতো।’

দুর্ভোগের পথ

মহামারির এই সময়ে হল বন্ধ থাকায় কত রকমের সমস্যায় যে পড়তে হয়েছে, সে প্রসঙ্গেও আলাপ হলো কজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী চিরঞ্জিৎ রায় বলছিলেন, ‘হল বন্ধ হওয়ার পরপরই আমাকে গ্রামের বাড়ি চলে যেতে হয়। আমরা যারা টিউশন করে নিজের খরচ নিজে চালাতাম, তাদের জন্য এটা একটা বড় ধাক্কা ছিল। এ ছাড়া হলে রিডিং রুমের সুবিধা, কিংবা ঢাকায় ভালো ইন্টারনেট সুবিধা, এসব থেকে বঞ্চিত হওয়ায় পড়াশোনার বেশ ক্ষতি হলো।’

দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হাবিবা আক্তারকেও। কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের যাদের গবেষণা কিংবা প্রজেক্টের কাজ ছিল, তাদের আলাদা মেস ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়েছে। ক্যাম্পাসের বাইরের এসব মেসের ভাড়া বেশি থাকা সত্ত্বেও ছিল না প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা আর খাবারের ব্যবস্থা। হল খোলা থাকলে এসব ব্যাপার নিয়ে ভাবতে হতো না।’

হলের সুবিধা, হলের অসুবিধা

গণরুম, রাজনৈতিক প্রভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ নানা সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দেশের প্রায় সব হলেই শোনা যায়। কিন্তু এসব ছাপিয়ে হলজীবনকে একটা বড় অভিজ্ঞতা বলে মনে করেন অনেকে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রাফাত হাসান থাকছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে। তাঁর মতে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই হলজীবনের স্বাদ পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা হলে এসে এক হয়। বিভিন্ন পরিবেশের মানুষ একসঙ্গে মেশে; একসঙ্গে পার করে জীবনের কয়েকটি বছর। আমার মনে হয় এই পর্যায় থেকে সবার মানসিকতায় অনেক বড় একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হয়; যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও বেশ কাজে দেয়।’

হলের ‘রিডিং রুম’–এ পড়ালেখা করে অভ্যস্ত যাঁরা, হল খোলার খবর তাঁদের জন্যও বড় স্বস্তির কারণ। হলের বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে মনটা সতেজ রাখার সুযোগ পাওয়া যায়। বেঁচে যায় থাকা-খাওয়া-যাতায়াতের অনেকটা খরচ। ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যাশা, নতুন করে হলজীবনের শুরুতে এবার গণরুম বা রাজনৈতিক প্রভাবের মতো অপ্রীতিকর প্রথাগুলোও উঠে যাক। হোক প্রয়োজনীয় সংস্কার।

প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন