default-image

বগুড়া জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। নাদিয়া নায়লাও বগুড়ার মেয়ে, পড়েছে জিলা স্কুলের পাশের বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। ছেলেবেলা থেকেই তার বই পড়ার আগ্রহ। সবচেয়ে ভালো লাগত হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস। লেখকের নবনী উপন্যাসের শেষ অংশে নায়িকা নবনী মারা যায়। পাঠক হিসেবে এ ঘটনা নাদিয়ার মনে দাগ কেটেছিল। নাদিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নবনী হারবে না। সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে বেঁচে থাকবে। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী নাদিয়া এখন একজন উদ্যোক্তা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে নিজের বানানো গয়না বিক্রি করে সে। পেজের নাম ‘নবনী’!

বিজ্ঞাপন

এসএসসি পরীক্ষা শেষে হাতে তখন অঢেল সময়। বাজার থেকে কারুপণ্য তৈরির জন্য কিছু কাঠ, মেটাল আর পুঁতি সংগ্রহ করে কানের দুল, চুড়িসহ এক সেট মালা তৈরি করেছিল সে। সেই থেকে শুরু। ঈদের সেলামি আর গার্লস গাইডের পুরস্কার থেকে জমানো ৮০০ টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে কারুশিল্পের আরও নানা উপকরণ। এরপর থেকে পড়াশোনার ফাঁকে কাঠ, মেটাল ও পুঁতি দিয়ে মালা, আংটি, কানের দুল, খোঁপার কাঁটা, আয়না, পায়েল, কাঠের বালা, সুতা দিয়ে নকশা করা চুড়ি, চাবির রিং, কপালের টিপ, চুলের ক্লিপসহ হরেক কারুশিল্প তৈরি করে সে। এসব উপকরণ পাওয়া যায় ‘নবনী’ নামের ফেসবুক পেজে। পেজে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার।

নাদিয়া নায়লার বাবা মইনুল ইসলাম বিআইডব্লিউটিএতে (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ) কর্মরত। মা শামিমা আক্তার গৃহিণী। নাদিয়া বলছিল, ‘যৌথ পরিবার আমাদের। আমার কাজে মা ছাড়াও পরিবারের অন্যরা সহায়তা করে। অনলাইনে নানা জায়গা থেকে পণ্যের অর্ডার আসে। সপ্তাহে দুদিন কুরিয়ারে বুকিং দিই। এই ব্যবসায় মোটামুটি ৬০ শতাংশ লাভ হয়। লাভের টাকায় পড়াশোনার খরচ চলছে। হাতে টাকা জমছে। ব্যবসার পুঁজিও বাড়ছে। গড়ে মাসে ১০ হাজার টাকার মতো আয় হয়।’

করোনায় যখন অনেক ব্যবসায়ী–পেশাজীবীই আর্থিক টানাপোড়েনে পড়েছেন, সে সময় উল্টো নাদিয়ার বিক্রি বেড়েছে আরও। পেজে প্রচুর অর্ডার এসেছে। চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি ও ডেলিভারি দিতে গিয়ে একরকম হিমশিম খেয়েছে কলেজপড়ুয়া তরুণী। বগুড়া শহরে হোম ডেলিভারির খরচ ৩০ টাকা, অন্য শহরে ১০০ টাকা। এ ছাড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ডেলিভারি চার্জ ছাড়াই পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন ক্রেতারা। উদ্যোক্তা হওয়ার পথে নাদিয়াকে সহায়তা করছে তার বন্ধুরাও। নাম বলতে শুরু করে সে যেন থামতেই পারছিল না, ‘নন্দ্রিতা, ওয়াছিফা, জয়িতা, মায়িশা, সারা, অনুজা, সাদিয়া, মিলিশা, নিতুসহ অনেকেই আমাকে সহযোগিতা করে। ইনস্টাগ্রামেও আমাদের অ্যাকাউন্ট আছে।’

উদ্যোক্তা নাদিয়া পড়ালেখার ব্যাপারেও বেশ উদ্যোগী। কলেজে তার ফলাফল ভালো। গার্লস গাইড, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া প্রতিযোগিতা, অন্যের হাতে মেহেদি রাঙানোসহ নানা সৃজনশীল কাজে সব সময় এগিয়ে থাকে সে। সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় মেহেদি উৎসবে অংশ নিয়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি বই পড়ে পুরস্কার জিতেছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে জেলা-উপজেলায় শ্রেষ্ঠ গার্লস গাইড এবং ২০১৮ সালে রাজশাহী বিভাগে সেরা গার্লস গাইড নির্বাচিত হয়েছে নাদিয়া নায়লা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিল্ড ও অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। স্কুল নাট্যদলে অভিনয় করত। বগুড়া থিয়েটার আয়োজিত স্কুল নাট্যোৎসবে নিয়মিত অংশ নিয়েছে সে।

এত সবের মধ্যেও নাদিয়ার স্বপ্ন প্রকৌশলী হওয়া। পাশাপাশি নবনীর মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে অনলাইনে ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে তার। নাদিয়া বলছিল, ‘হ‌ুমায়ূন স্যারের নবনী জীবনযুদ্ধে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু আমার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নবনী হারবে না; বরং অন্যদেরও অনুপ্রেরণা ও সাহস দেবে।’

বিজ্ঞাপন
প্র স্বপ্ন নিয়ে থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন