বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সমস্যাটা দেখা দিল এর দিন পনেরো পর। অফিস থেকে ফিরছিলাম। শিহাবের ফোন, ‘হ্যালো, হীরক ভাই?’

‘বল।’

‘নীলাও তো যেতে চাচ্ছে।’

‘নীলা কে?’

‘আরে কী কন, ভাই, নীলা আমার জিএফ না! গত মাসে আমরা রিলেশনে আসছি না! ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বদলেছি তো, ভাই…আপনি তো আমাকে ফেসবুকে দেখেনই না। অথচ আপনার আজেবাজে সব লেখাতে আমি লাভ রিঅ্যাকশন দিই!’

‘আচ্ছা। আচ্ছা। নীলা গেলে তো ভালোই।’

‘কিন্তু আমরা দুজন ছেলে আর একটা মেয়ে…ব্যাপারটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে না?’

‘আচ্ছা আচ্ছা। তাহলে কী করা যায় বল তো?’

‘নীলাও তো একই কথা বলছে। কী করা যায়…’

‘আচ্ছা। তাহলে নীলাকে বল, ও পরেরবার গেল…এবার তো আমরা আসলে প্ল্যান করে ফেলছি!’

‘কী বলেন, ভাই, এই কথা বললে কি আর আমাদের রিলেশন থাকবে?’

‘তাহলে তোরা থাক। আমি যাই।’

‘এইটা কী বললেন, ভাই? আপনি আমাদের রেখে একা যেতে পারবেন?’

এই বিশাল অভিমানী কথার পর কিছু বলা মুশকিল। আমি চুপচাপ ঘামতে থাকি। ব্যাপারটা কোন দিকে যাবে ঠাহর করতে পারি না। শিহাব বলে, ‘একটা সমাধান আছে, ভাই!’

‘বল না!’

‘আমরা ভাই কক্সবাজার যাই।’

‘কক্সবাজারও তো আমরা ওই দুইটা ছেলে একটা মেয়ে যাচ্ছি, তাই না? লোকে তো তখনো কিছু বলবে, নাকি?’

‘না না। কক্সবাজার হলে তো শুধু আমি আর আপনি যাব।’

‘তাতে নীলার সাথে তোর রিলেশন থাকবে?’

‘আপনি বোঝেন নাই, ভাই। কক্সবাজারে নীলার খালামণির বাসা। নীলা ঈদ করতে কক্সবাজার চলে যাবে আগেই। নীলা যাবে যেদিন, আমরা যাব ঠিক তার পরের দিন। ঠিক আছে না, ভাই?’

সেন্ট মার্টিন থেকে আমাদের প্ল্যান একনিমেষে হড়কে কক্সবাজারে নেমে এল। আমি আরও কিছুক্ষণ গাঁইগুঁই করলাম এবং শেষে কক্সবাজারকেই মেনে নিলাম। সমুদ্র তো সেখানেও আছে। সেখানেও আছে বালি। কক্সবাজারেরও কম ছবি দেখি না ফেসবুকে। সমুদ্রের ওপর মানুষ এমন করে দাঁড়ায় যে সমুদ্র আর দেখা যায় না। আমি বললাম, তথাস্তু!

শিহাব বলল, ‘তাহলে তো ভাই কয়টা বাড়তি দিন থাকা যায়, তাই না?’

‘থাকবি?’

‘থাকবই তো, ভাই। নীলা থাকতেছে না!’

‘আচ্ছা আচ্ছা।’

‘তাহলে তো ভাই আরও কিছু শপিং করা লাগে…’

আমরা দুজন আরও কিছু হাফপ্যান্ট কিনলাম। সাত দিনে সাতটা হাফপ্যান্ট পরব। ফেসবুক রঙিন করে তুলব। শিহাব বলল, ‘গোলাপি রঙের হাফপ্যান্ট নাই, এইটা একটা দুঃখ থেকে গেল, ভাই…নীলার গোলাপি খুব প্রিয় রং!’

ঈদ আসন্ন। শিহাবের লাফালাফিও দারুণ বেড়েছে ইতিমধ্যে। নীলার সঙ্গে কক্সবাজারের কোথায় কোথায় প্রেম করা যাবে, তার একটা ছক সে করে নিয়েছে। কলাতলী নাকি ইনানী নাকি সুগন্ধা—কোনখানে তাদের জমবে ভালো, এই তার হিসাবনিকাশ; সারা দিনের চিন্তা। আমার চিন্তা বাসের টিকিট, হোটেল রুম বুকিং। যেদিন সবকিছু শেষ করতে পারলাম, সেদিন একটু দম নিলাম। গ্রামের বাড়িতেও জানিয়ে দিলাম, এবার আর গ্রামে যাচ্ছি না। ঈদ হবে কক্সবাজারে।

এর মধ্যে নীলা একবার দেখা করতে চলে এল। আমাকে দেখেই ঠোঁট গোল করে আহ্লাদ নিয়ে বলল, ‘ভাইয়া! আপনি যে কী কিউট একটা মানুষ। আমার এককথাতেই সেন্ট মার্টিন ট্যুর ক্যানসেল করে দিলেন! আমি তো ভাবতেও পারি না। শিহাব অবশ্য বলছিল, আপনি বোকা মানুষ তো, আপনি রাজি হয়ে যাবেন!’

আমার দুঃখ পাওয়া উচিত না আনন্দ, তা–ই কিছুক্ষণ বুঝতে পারলাম না। নীলা শিহাবের সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে বলল, ‘আমি ২৬ তারিখে যাব। আপনাদের কিন্তু ২৭ তারিখে ইনানীতে দেখতে চাই-ই চাই!’

শিহাব বলল, ‘২৭ তারিখে থাকব এবার এক সাথে...’

শিহাব কথা শেষ করল না। কিন্তু শেষ না করলে কী হবে...তা নিয়ে দুজনের সে কী হাসাহাসি!

২৫ তারিখে আমাদের প্যাকিং শেষ। ২৬ তারিখে খবর এল, নীলা কক্সবাজার যাচ্ছে না। কারণ, তার মা–বাবা বলেছে তাদের সঙ্গে গ্রামে ঈদ করতে হবে। তারা ২৬ তারিখের বাস ধরে কুমিল্লা চলে গেল। আমি ঘাবড়ে গেলাম। কক্সবাজারের বাসের টিকিট কাটা, হোটেল বুকিং দেওয়া, সেগুলোর কী হবে? শিহাবকে বললাম, ‘তাহলে আমরা যাই। ঈদটা কক্সবাজারে কাটিয়ে আসি?’

শিহাব যেন আকাশ থেকে পড়ল, ‘কী বলেন, ভাই? নীলা যে কক্সবাজার যেতে পারল না, সেই কক্সবাজারে আমি যাব ঈদ করতে, অসম্ভব! যান, আপনি যান। আপনার না খুব যাইতে ইচ্ছা করছে, আপনিই যান!’

আমি কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলাম। তারপর বললাম, ‘থাক তাহলে, আমিও গ্রামে চলে যাই।’

শিহাব আবার লাফিয়ে উঠল, ‘সেইটাই ভালো হবে, ভাই!’

দুজনে এবার টিকিট কাটতে গেলাম। কিন্তু কোনো বাসেরই টিকিট নেই। ট্রেনেরও একই অবস্থা। শিহাব হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে উঠল। আমিও একটু আড়ালে ফোঁপালাম। শিহাবের কষ্টে না; কক্সবাজার যাওয়ার টিকিটের টাকা ওরা ফেরত দেয়নি। হোটেল বুকিংয়ের টাকাও হাপিস!

এবারের ঈদটা আমাদের কাটল মেসে। আমি আর শিহাব ছাড়া কেউ ছিল না। সবাই নিজের নিজের জায়গায় প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে গিয়েছিল। এমনকি দারোয়ান, বুয়া—তারাও ছিল না। শুধু ছিলাম আমরা। আর হ্যাঁ, সঙ্গে ছিল আমাদের কেনা রঙিন সাত দুগুণে ১৪টা রঙিন হাফপ্যান্ট!

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন