default-image

জীবনের প্রথম বিদেশভ্রমণের অফার পেয়েছিলাম ফিনল্যান্ড থেকে। সেও বছর ত্রিশেক আগের কথা। ফিনল্যান্ডে এক সিনিয়র কার্টুনিস্টের সঙ্গে খাতির হয়েছিল চিঠিপত্র চালাচালি করে। (তখন ই–মেইল ছিল না বলাই বাহুল্য) তো প্যাকলেইন নামে সেই কার্টুনিস্টের একটা কার্টুন উন্মাদ–এ ছাপিয়েছিলাম, পত্রিকাও তাঁর কাছে পাঠিয়েছিলাম। তাতেই তিনি এতই উত্তেজিত হয়ে গেলেন যে আমাকে ফিনল্যান্ডে আমন্ত্রণ জানালেন। অফার পেয়ে আমিও ভীষণ উত্তেজিত! জীবনের প্রথম বিদেশযাত্রা। ঢাকার অর্ধেক লোক জেনে গেল আমি ফিনল্যান্ড যাচ্ছি। দু–একজন চোখের পানি ফেলে দিল আমাকে বিদায় জানাতে এসে। তখনো কিন্তু আমার পাসপোর্ট–ভিসা কিছুই হয়নি। তবে দ্রুতই পাসপোর্ট করে ফেললাম। কিন্তু ভিসা নিতে গিয়ে দেখি, ফিনল্যান্ডের ভিসা নিতে হবে দিল্লি থেকে। তার মানে আগে দিল্লির ভিসা তারপর ফিনল্যান্ডের ভিসা। সেদিনই বুঝলাম ‘দিল্লি দুরস্ত’!

এর পরের অফারটা এল আমেরিকা থেকে। এবার অবশ্য আমি অত উত্তেজিত হলাম না। তবে আমার সঙ্গে কো–অভিযাত্রী হিসেবে যিনি যাবেন, তাঁর সম্পর্কে জেনে আমি আমেরিকা যাওয়ার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করলাম। ওই লোকের সঙ্গে নরকে যেতেও রাজি না। কাজেই রণেভঙ্গ দিলাম।

বিজ্ঞাপন

আসলে বিদেশযাত্রার কপাল সবাই নিয়ে জন্মায় না। আমার এক বন্ধু আছে, তার সঙ্গে দেখা হলেই শুনি, সে এই মাত্র ইংল্যান্ড থেকে এল কিংবা আগামী কাল আমেরিকা যাচ্ছে। দেশের মাটিতে পা রাখা তার জন্য খুবই কঠিন। মানুষের পায়ের তলায় শর্ষে থাকে, তার পায়ের তলায় শর্ষের গোডাউন। তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম—

: তুই যে এত ঘন ঘন বিদেশ যাস, তোর একঘেয়ে লাগে না?

: লাগে না আবার। অবশ্যই লাগে, আমি পুরাই ফেডআপ।

: তাহলে যাস কেন?

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কী করব বল, আমার বউ যে আবার দেশপ্রেমিক। নিজের দেশকে বড্ড ভালোবাসে।’

: মানে?

: মানে আমি যে এক বিদেশিনীকে বিয়ে করেছি। সে তার দেশ থেকে কিছুতেই নড়বে না।

এই জন্যই তো যাচ্ছি, ওই ফালতু দেশটাকে বাকি জীবন পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখব...

আমাদের আরেক বন্ধু আছে বিদেশের নামই শুনতে পারে না। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতি করেছে। আমেরিকা–ইংল্যান্ডের নাম শুনলে উত্তেজিত হয়ে ‘এই সব সাম্র্রাজ্যবাদী লুটেরা ধনিক গোষ্ঠীর বুর্জোয়া গণতন্ত্র...’ বলে হাত তুলে বাতাসে কোপ মারতে মারতে বক্তৃতা শুরু করে দেয়। তো সেই বন্ধু একদিন শুনি সপরিবার আমেরিকা যাচ্ছে গ্রিন কার্ড নিয়ে, ওখানেই নাকি সেটল হবে। তাকে এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে গিয়ে আমরা চেপে ধরলাম—

: কিরে, তুই উঠতে–বসতে আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা বলে গালি দিস, আর এখন গুষ্টিসুদ্ধ আমেরিকা যাচ্ছিস সেটল হতে? ঘটনা কী?

: এই জন্যই তো যাচ্ছি, ওই ফালতু দেশটাকে বাকি জীবন পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখব।

তবে যত যা–ই বলি না কেন, বিদেশে যেতে সবারই ভালো লাগে। বিদেশে গেলে বরং বোঝা যায় নিজের দেশটা আমার কত প্রিয়। এই দেশে কত দুঃখকষ্ট...কত অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা, তারপরও তো দেশটা একান্তই আমার। রক্তস্নাত এই দেশটার মাটির চেয়ে পবিত্র আর কোন দেশটা আছে...। তাই তো আমরা গান গেয়ে বলি, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা...।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0