default-image

দু রকমের হাতি আছে বিশ্বে। আফ্রিকার হাতিকে বলা হয় অক্সোডোন্টা আফ্রিকানা। এশিয়ার হাতির নাম এলিফাস মাক্সিমাস। এদের মধ্যে মিল যেমন আছে, তেমনি অমিলও রয়েছে। আফ্রিকার হাতি তুলনামূলকভাবে ওজনে বেশি, আকারেও বড়। ওগুলোর কান এই মহাদেশীয় হস্তীকুলের চেয়ে দেড়-দু গুণ বড়। পুরুষ-মাদি দুয়ের গজদন্ত থাকে। এশীয় হাতির গজদন্ত হয় শুধু পুরুষগুলোর। এ ছাড়া আরো পার্থক্য রয়েছে। থামের মতো মোটা মোটা পা ফেলে এরা চলে খুবই ধীরগতিতে। কিন্তু ভয় পেলে বুনো হাতিরা ১৯-২০ মাইল বেগে পর্যন্ত পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে যেতে পারে। অবাক কাণ্ড, জলাশয়ও এদের গতি রুদ্ধ করতে পারে না।

একটি হাতির গড় আয়ু সোয়া শ বছর। জন্মের পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হস্তিশাবক চলাফেরা করতে পারে। শুঁড়ের আওতায় যেসব গাছপালা, তৃণলতা, ফলমূল পাওয়া যায়, সে সবই সাধারণত এদের খাবার। পছন্দ হলো বাঁশ, বেত, নলখাগড়া, দূর্বাঘাস, কলাগাছ ইত্যাদি। শক্ত নারকেল কিংবা বেল থেকে শুরু করে নানা ধরনের ফলফলারিও তাদের প্রিয়। এমনিতে এরা দলবদ্ধ থাকতে ভালোবাসে, আত্মরক্ষাও করে যৌথ প্রচেষ্টায়। তবে খাওয়ার সময় দলের সদস্যরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরে ও মাঝরাতে সামান্য কয়েক ঘণ্টা বাদ দিয়ে বাকি সময়ের পুরোটাই খাওয়া-দাওয়া করতে পারে এরা। ভোজনপর্ব সারা হয় চলতে চলতে। হাতি খাবার যোগাড় করার কাজে ব্যবহার করে শুঁড়, গজদন্ত ও পা। শক্ত বাঁশ কিংবা গাছের বাকল তোলার জন্য গজদন্তের অগ্রভাগ দিয়ে প্রথমে বাঁশ বা বাকল ফাটিয়ে নেয়। তারপর শুঁড় দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলে। খাবার সময় ওদের মাঢ়ির দাঁতগুলো ধানমাড়াই কলের মতো কাজ করে। একটি বড় হাতি দিনে আট মণের মতো শস্য, তৃণলতা, পাতা বা ফলমূল খেতে পারে। পানি লাগে ২৫ থেকে ৫০ মণ।

বিজ্ঞাপন

হাতি স্থলচর প্রাণী হলে কি, পানির প্রতি এদের টান ও আকর্ষণ প্রবল। এ রকম পানিপ্রীতি খুব অল্পসংখ্যক প্রাণীর মধ্যেই দেখা যায়। পানি দেখলেই হলো, শীত কি গ্রীষ্ম যে ঋতুই হোক না কেন, এরা নেমে যাবে পানিতে। শুঁড়ে পানি ভরে পিচকিরির মতো ছিটাবে নিজের গায়ে, কিংবা আকাশের দিকে। একটি দলের সবকটি হাতিই পানিতে নামতে পারে। কেউ বা জলাশয়ের পাড়ের ধুলোবালি পিঠে-পেটে ছিটিয়ে আনন্দ পায়। জলক্রীড়া শেষে ঐরাবতেরা মোটাসোটা গাছপালায় গা ঘষতে বেশ পছন্দ করে।

এত যে বিশাল বপু এই প্রাণীটির, তার তুলনায় চোখজোড়া কিন্তু খুবই ছোট। চোখে এরা কম দেখে। ঘ্রাণ ও শ্রবণশক্তি খুবই প্রখর হয়। তা দিয়ে দৃষ্টিশক্তির স্বল্পতা পুষিয়ে নিতে পারে অনেকটা। খুবই নিঃশব্দে চলাচল করতে পারে হাতি। বিশাল শরীর আলতো করে টেনে, দ্রুতগতিতে চলতে পারে বলে বন-জঙ্গলে অনেকে ওদের উপস্থিতি টের পায় না। প্রচলিত লোকবিশ্বাস রয়েছে যে, হাতির পায়ের নিচে বড়ই বিচি পড়লে নাকি এরা বেকায়দায় পড়ে! এটা সত্যি নয়। বন্যহাতি কাঁটাযুক্ত বাঁশ, কাঁটাঅলা বুনো একেশিয়া, বাবলা ও কাঁটাযুক্ত বড়ই খেতে ভালোবাসে। বড়ই গাছ পেলে হাতিরা হামলা চালায় পাগলের মতো। বড়ই তো বটেই, ডালপালাসহ আস্ত গাছ সাবাড় করে ফেলতেও এরা ওস্তাদ। পায়ের তলা শক্ত।

আগুন, বোমা বা বন্দুকের শব্দে ভয় পায় এরা। হৈচৈ-চিৎকার করে, ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে হাতিকে ভয় দেখানো সম্ভব। বাংলাদেশের মধুপুর গড় থেকে শুরু করে গারো পাহাড়, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপক এলাকায় এক শতাব্দী আগেও বিচরণ করত অনেক অনেক হাতি। এখন চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এদের বাস মূলত। কিছু কিছু হাতি মিয়ানমার, ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্য থেকে মাঝে-মধ্যে বাংলাদেশে চলে আসে। অল্পদিন অবস্থানের পর ফিরে যায় আবার। সব মাদী ও পুরুষ হাতির সামনের পায়ে পাঁচটি এবং পেছনের পায়ে চারটি করে নখ থাকে। তবে প্রতিটি পায়ের বাইরের দিকের দুটি নখর অপেক্ষাকৃত ছোট এবং কিছুটা কুঞ্চিত। ফলে সাধারণত ওগুলোর ছাপ মাটিতে পড়ে না। সে জন্য বন-জঙ্গলে পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলার সময় তিনটি করে নখরের ছাপ চোখে পড়ে।

গড়পড়তায় আমাদের পুরুষ হাতির ওজন হয় সর্বোচ্চ চার টন। হস্তিনী প্রায় তিন টন। আফ্রিকার হাতির ওজন পুরুষ ছয় টন, মাদী চার টন। হাতিকে তিনটি দলে ভাগ করা হয় গজদন্তের বিচারে। যুগল গজদন্ত আছে, এমন হাতিকে বলা হয় দাঁতাল হাতি বা টাসকার। একটি গজদন্ত থকলে, সেটাকে বলে গণেশ বা সিঙ্গল টাসকার। একটিও দাঁত নেই যাদের, সেগুলোকে বলে মাখনা। মাদী হাতির গজদন্ত কদাচিৎ এক-দুই ইঞ্চি লম্বা হয়। সেটা তেমন চোখে পড়ে না। হাতির উচ্চতা (পদতল থেকে কাঁধ বরাবর, দাঁড়ানো অবস্থায়) সচরাচর ৯ ফুট। এ উচ্চতা পুরুষগুলোর। সর্বাধিক উচ্চতা হতে পারে ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি। হস্তিনীর উচ্চতা গড়ে ৮ ফুট। গজদন্তের দৈর্ঘ্য হতে পারে সাত থেকে আট ফুট। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের রাজকীয় জাদুঘরে এক জোড়া গজদন্ত রক্ষিত আছে। প্রতিটি ৯ ফুট ১০ ইঞ্চি লম্বা। রাজা ষষ্ঠ জর্জের সংগ্রহে ছিল এক জোড়া গজদন্ত। একটি গজদন্ত ৮ ফুট ৯ ইঞ্চি লম্বা, ওজন ১৬০ পাউন্ড। অন্যটির দৈর্ঘ্য ৮ ফুট ৬ ইঞ্চি, ওজন ১৬১ পাউন্ড।

বিজ্ঞাপন

বিপদে-আপদে হাতি একযোগে আত্মরক্ষা করে। ভয়ের প্রথম সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবগুলো হাতি জড়ো হবে এক জায়গায়। বাচ্চা যদি ছোট হয়, মায়ের পেটের তলায় ঢুকে যাবে কিংবা তাল মিলিয়ে একসঙ্গে হাঁটবে। যেগুলো কিশোর, বড়দের ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়বে। পুরুষ ও বুড়িরা বারবার শুঁড় উঁচিয়ে কান খাড়া করে শত্রুর অবস্থান বোঝার চেষ্টা করবে। প্রয়োজনবোধে পুরুষ-মাদী উভয়ে মিলে ঝাঁপিয়ে পড়বে শত্রুর ওপর। শত্রু যদি রণে ভঙ্গ দেয়, তবে ক্রুদ্ধ হাতিরা সামনের পা সজোরে মাটিতে ঠুকবে। হুড়মুড় করে গাছপালা উপড়ে ফেলবে। মাঝবয়সী কিংবা বৃদ্ধ কোনো হস্তিনী হয় দলের নেত্রী। অনেকের ধারণা, বড় দাঁতঅলা হাতিই বুঝি দলনেতা। এ ধারণা ঠিক নয়। সামনে শত্রু নেই—এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলে হাতিরা গাছপালা বনবাদাড় ভেঙে, ঘাস তুলে পায়ে বাড়ি মেরে, বড় বড় শ্বাস ফেলে এগোবে। শুধু শুধুই শুঁড় দিয়ে ভারী শব্দ করে এরা। নলখাগড়ার বন ও বাঁশবনের মধ্য দিয়ে চলে। চলার সময় ওদের পায়ের চাপেই তৈরি হয়ে যায় পথ। মানুষ যদি বিরক্ত না করে, হাতিরা দিনের পর দিন একই রাস্তায় চলাফেরা করে। হাতি বিশ্রাম নেয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কখনো বা কাত হয়ে শুয়েও বিশ্রাম নিতে পারে। কখনো কখনো কাদা এবং ধূলি-ধূসর জায়গায় গড়াগড়ি খেতেও ভীষণ ভালোবাসে এরা।

মন্তব্য পড়ুন 0