যাপিত রম্য

বাবু, পেঁয়াজ পাইসো?

বিজ্ঞাপন
default-image

বাজারে ঢোকার ইচ্ছা ছিল। উদ্দেশ্য, স্রেফ সাপ্তাহিক বাজার করা। কিন্তু রোড ডিভাইডারের কাছে দাঁড়িয়েই থমকে গেলাম। প্রচণ্ড ভিড়। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, রাস্তাটা আর পার হব কি না। এমন সময় এক তরুণী পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘বাবু, পেঁয়াজ পাইসো?’

চমকে তাকিয়ে দেখি, তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলছেন এবং বেশ উত্তেজিত। যতটুকু বোঝা গেল, তাঁর ‘বাবু’ তুলনামূলক কম দামে পেঁয়াজ কিনতে গেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হলে যাতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আপাত বেশি দামেও পেঁয়াজ কেনা যায়, তার ব্যবস্থা করতেই বাবুর বাবুও বাজারের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছেন।

এবার আমি রাস্তার এপার থেকে ওপারে চাইলাম। খুঁটিয়ে দেখার পর বুঝলাম, ওপারের স্বর্গসুখ নেই। পেঁয়াজ-রসুনের দোকানে ভিড়টা বেশ। হুড়োহুড়ি করে কেনা হচ্ছে। ঠিক করোনাকালের শুরুতে যেভাবে হ্যান্ডওয়াশ কেনা হয়েছিল। বোঝা গেল, ঘরে ঘরে পেঁয়াজের ভান্ডার গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়ে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই হয়তো কোনো কোনো বাড়িতে অভিযান চালালে বাজারের চেয়েও বেশি পেঁয়াজ পাওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
যেহেতু ফি বছরই এমন কিছু না কিছু হবে, তাই সময় থাকতেই বিকল্প পথে হাঁটার চেষ্টা করা উচিত। ধরুন, আমরা পেঁয়াজের পারফিউম বের করে ফেললাম। সেটি ফুড গ্রেড হতে হবে অবশ্যই। খাবারে স্প্রে করে দেওয়া যাবে। মরিচের ক্ষেত্রেও এমনটা ভাবা যায়।

যদিও রথী-মহারথীরা অনেক আগে থেকেই বলা শুরু করেছেন, ‘আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী’; সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়েই হয়তো এখন মাস্ক থুতনিতে জায়গা করে নিয়েছে। এত কিছুতে লজ্জা পেয়ে করোনা এখনো দেশ ছাড়েনি, বিদেশও ছাড়েনি। হুড়োহুড়ি দেখে তাই দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম। বাকি রাস্তা পার হয়ে বাজারে কি যাব?

পেঁয়াজ নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত, মরিচ নিয়ে ততটা নই। মরিচের দামও আকাশ ছুঁতে চাইছে। তবে তা নিয়ে হইচই কম। মরিচ স্বাদে ঝাল বলেই হয়তো এই অবহেলা! নিজের ক্ষেত্রে এমনটা হলে সহ্য করতে পারতেন? অর্থাৎ আপনার প্রতিভার দাম যদি কেউ না দিত, তবে মনমেজাজ খারাপ হতো কি না?

সাফল্যে আকাশ ছুঁতে কে না চায়! আপনিও তো চান, নাকি? চাকরি বা ব্যবসার বাজারে আপনি কি চান না, আপনার দাম বাড়ুক? এবার তা প্রথমে মরিচ দেখিয়েছে, এখন পেঁয়াজ সেই পথ ধরেছে। পেঁয়াজের ঝাঁজে নাক-মুখ ডলে হলেও অন্তত মরিচের জন্য অশ্রুপাত করুন। না হলে একসময় কিন্তু মরিচ দূর আকাশের তারা হয়ে যেতে পারে! তাই সময় থাকতে প্রিয়জনকে প্রাণভরে দেখে নিন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত বছরও এমনটা হয়েছিল। তার আগের বছরও কি হয়েছিল? হয়তোবা। গোল্ডফিশের মতো মেমোরি কার্ডে কি আর এত কিছু মনে থাকে? থাকলে তো আর পেঁয়াজ-মরিচ নিয়ে হুলুস্থুল হতো না। আমাকেও বাজার ছেড়ে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। বাবুদেরও আর যুগপৎভাবে বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালাতে হতো না।

আমরা আসলে কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। নিজের গ্রামে আগুন লাগলে পাশের পুকুর থেকে পানি না তুলে ১০ মাইল দূরের শহরের দিকে হাঁটা দিই। তারপর সেখানকার দমকল নিয়ে এসে আগুন নেভাই। ততক্ষণে যে সব পুড়ে ছারখার, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা কম। আবার মাথা আদৌ আছে কি না, সেই সংশয়ও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যেহেতু ফি বছরই এমন কিছু না কিছু হবে, তাই সময় থাকতেই বিকল্প পথে হাঁটার চেষ্টা করা উচিত। ধরুন, আমরা পেঁয়াজের পারফিউম বের করে ফেললাম। সেটি ফুড গ্রেড হতে হবে অবশ্যই। খাবারে স্প্রে করে দেওয়া যাবে। মরিচের ক্ষেত্রেও এমনটা ভাবা যায়। তবে গন্ধ খুব কড়া হতে হবে। প্রবাদে আছে, ঘ্রাণেই নাকি অর্ধেক ভোজন হয়। আমরা নাহয় গন্ধ শুঁকেই বাকিটা জীবন পার করলাম! কল্পনাবিলাসী মন বলছে, হয়তো একদিন এ দেশে মুখে পেঁয়াজের ভুরভুরে গন্ধ থাকাকেই আভিজাত্যের প্রমাণ বলে মনে করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পেঁয়াজের গন্ধের মাউথফ্রেশনারও ভালো বাজার পেতে পারে। রান্নায় পেঁয়াজ ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ জারি করার চেয়ে এসব পন্থা ভালো নয় কি?

এসব ভাবতে ভাবতেই আমি বাড়ি ফেরার পথ ধরেছি। ব্যাগ খালি, মনে একটা ফুরফুরে ভাব। সমস্যার সমাধান করতে পারার চেয়ে বড় আনন্দ পৃথিবীতে নেই, তা কল্পনাতে হলেও বেশ একটা ‘আইনস্টাইন আইনস্টাইন’ ভাব আসে।

মিস কল্পনা আবার তার খেল দেখালেন।

হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল। আমাদের এক কর্তামশাই একবার এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যকে টেনে এনেছিলেন। সে কী মধুর উদাহরণ!

ইশ্‌, যদি কেউ এ যাত্রা বস্তা বস্তা পেঁয়াজ পাঠিয়ে বলত, ‘বাবু, পেঁয়াজ পাইসো?’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন