default-image

‘বাবা, আর কতক্ষণ?’

আমার দিকে তাকিয়ে শুকনা মুখে জিজ্ঞেস করল জুনিয়র সি। বেচারার আসলেই খুব কষ্ট হচ্ছে। এক ফেসবুক সেলিব্রিটি ৬ মাস আগে বলেছিলেন, ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আমরা মারা যাব। ওপরওয়ালার অশেষ কৃপায় ৩৩ ডিগ্রি গরমেও আমরা বেঁচে আছি। জুনিয়র সি জার্নি করে শুধু একটু ক্লান্ত। আমরা এই মাইক্রোবাসে জার্নি করছি প্রায় ৬ ঘণ্টা হলো। এক বাসে গাদাগাদি করে ১২ জন বসা। রাস্তায়ও ‘সেই রকম’ ভিড়। এখন আর কেউ আমাদের ভয় পায় না। কেন পাবে? আমরা তো বিদায় নিচ্ছি।

তবে আমি ও জুনিয়র সি এখন লেগে আছি এক তরুণের হাতের তালুতে। আর সবার সঙ্গে সে-ও এসেছিল বন্ধুর বিয়ে খেতে। এলাহী কাণ্ড! বাংলাদেশিদের ধারণা, দেশ থেকে আমরা বিদায় নিচ্ছি। আবার এখানে, এই বিয়ের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বউও বাপের বাড়ি থেকে বিদায় নিচ্ছে। ডবল সেলিব্রেশন। এই ডবল সেলিব্রেশন উপলক্ষে ছিল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা। কেউ মাস্কও পরেনি। ব্যস, ভাড়া করা একটা বাইকের হাতল থেকে আমি আর জুনিয়র সি উঠে এলাম ছেলেটার হাতে। সেই থেকে অপেক্ষায় আছি। মুখে বা নাকে একবার হাত দিলেই বিদায়। না, দেশ থেকে নয়। হাত থেকে বিদায় নিয়ে সোজা শ্বাসনালিতে।

আমি দেখেছি, ‘ডাউনলোড’ করার পর মানুষ হাতে সাবান দেয়। একটু পরেই একটা পেট্রলপাম্পে নেমে গেল ছেলেটা। পাম্পের টয়লেটে ডাউনলোড সারল। তারপর এগিয়ে গেল হাত ধোয়ার বেসিনের দিকে। আশ্চর্য ব্যাপার, একটা সাবানও রাখেনি।
বিজ্ঞাপন

ছেলেটার মনে হয় নাক খোঁটার অভ্যাস নেই। না হলে এই অপেক্ষা বহু আগেই শেষ হতে পারত। হঠাৎ একটু নড়েচড়ে বসল ছেলেটা। মাইক্রোবাসের ড্রাইভারকে বলল, ‘মামা, সামনে পেট্রলপাম্প দেখলে একটু থামায়েন তো।’

মাইক্রোবাসের আর সবাই ছেলেটার দিকে তাকাতেই কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘একটু ডাউনলোড কইরা আসি। বিরিয়ানিটা একটু বেশিই খাইছিলাম।’

সারা বাসে হাসির হররা পড়ে গেল। শুধু ভয়ে আমার আরএনএ শুকিয়ে যাওয়ার দশা হলো। আমি দেখেছি, ‘ডাউনলোড’ করার পর মানুষ হাতে সাবান দেয়। একটু পরেই একটা পেট্রলপাম্পে নেমে গেল ছেলেটা। পাম্পের টয়লেটে ডাউনলোড সারল। তারপর এগিয়ে গেল হাত ধোয়ার বেসিনের দিকে। আশ্চর্য ব্যাপার, একটা সাবানও রাখেনি। কী নোংরা! ছেলেটা সাবান না দেখে যতটা বিরক্ত হলো আমি তার চেয়ে অনেক বেশি গুণ খুশি হলাম। কিন্তু আমার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ছেলেটা পকেট থেকে একটা মিনিপ্যাক সাবান বের করল। তারপর হাতে মাখিয়ে দুই হাত ভালোভাবে ঘষতে লাগল। ব্যথায় আমার মনে হলো প্রোটিন স্পাইকগুলো ভেঙে যাচ্ছে। তারপর আর কিছুই মনে নেই।

বিজ্ঞাপন

এই মাত্র আমার জ্ঞান ফিরেছে। ছেলেটা সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড হাত না ঘষেই হাত ধুয়ে চলে গেছে। প্রোটিন স্পাইকগুলো ভাঙলেও সাবান আমার গ্লাইকোপ্রোটিন মেমব্রেন ভাঙতে পারেনি। আমি বেঁচে আছি!

‘বাবা, আর কত দূর?’ খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেসিনের ঝাঁজরির ওপর থেকে আমার দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করল জুনিয়র সি। আমার বাবুটা বেঁচে আছে! বিদায় নিতে না পারার দুঃখ আমাকে স্পর্শ করল না। আপাতত বেসিনের এই নতুন জীবনই আমার কাছে বড্ড সুন্দর মনে হচ্ছে। অনেক দিন পর আমি কাঁদছি। আনন্দের কান্না।

মন্তব্য পড়ুন 0