লিংকন কে সানশাইন স্পেশাল (১৯৩৯)

default-image

এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জন্য তৈরি করা প্রথম বিষেশায়িত গাড়ি। ১৯৩৯ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এই গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। তিনি ছিলেন দেশটির ইতিহাসের ৩২তম প্রেসিডেন্ট। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই গাড়ি ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থা সিক্রেট সার্ভিসের দেওয়া নকশা অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল গাড়িটি। এতে ছিল দ্বিমুখী রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশস্ত রানিং বোর্ড (দরজার পাশে দাঁড়ানোর জায়গা) এবং সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যদের ধরার জন্য হ্যান্ডেল। তবে ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে হামলার ঘটনার পর এই গাড়িতে আরও কিছু বিশেষ ব্যবস্থা যোগ করা হয়েছিল। গাড়ির দরজা ও চাকাগুলো যাতে গুলি প্রতিরোধী হয়, সেটি নিশ্চিত করা হয়। আবার গাড়ির আরোহীরা যাতে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে, সে জন্য প্রতিটি দরজায় লাগানো ছিল সাবমেশিনগান।

লিংকন কাস্টম (১৯৪২)

default-image

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তৈরি হয়েছিল প্রেসিডেন্টদের জন্য দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় গাড়িটি। প্রথমে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এবং পরে ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান গাড়িটি ব্যবহার করেছিলেন। এতে প্রথমবারের মতো সুরক্ষামূলক বর্ম ব্যবহার করা হয়েছিল। এ গাড়িতে ছিল একটি বহনযোগ্য জেনারেটরও। ফলে গাড়িটির বাতিগুলো অতিরিক্ত সময়েও আলো দিতে পারত।

লিংকন কসমোপলিটান (১৯৫০)

default-image

প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান এই মডেল পছন্দ করেছিলেন। এটি তৈরিতে তৎকালীন সময়ে খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার ডলার। জানা গেছে, এই গাড়ির উচ্চতা (মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত) অন্যান্য মডেলের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল। এর কারণ ছিল, গাড়িতে ঢোকার পর যাতে টুপি খুলতে না হয়! এ ছাড়া এই গাড়িতে স্বচ্ছ কাচের আবরণ কিছুটা বেশি রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ গাড়িতে বসা প্রেসিডেন্টকে দেখতে পায়। আর সুরক্ষামূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা তো ছিলই।

বিজ্ঞাপন

লিংকন কন্টিনেন্টাল এসএস-১০০-এক্স (১৯৬১-৭২)

default-image

এই মডেলের গাড়ি ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টরা। ১৯৬৩ সালে এ গাড়িতেই হত্যার শিকার হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তবে এমন ঘটনার পর আরও আট বছরের বেশি সময় গাড়িটি প্রেসিডেন্টকে সেবা দিয়ে গেছে। পরে এতে নানা ধরনের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যোগ করা হয়েছিল। এতে ছিল টাইটেনিয়ামের তৈরি বর্ম, গুলি প্রতিরোধী ছাদ, জানালার কাচ ইত্যাদি।

default-image

ক্যাডিলাক ফ্লিটউড (১৯৮৩)

default-image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান প্রথমবারের মতো এই ক্যাডিলাক গাড়ি ব্যবহারের চল শুরু করেছিলেন। এর আগে লিংকন ব্র্যান্ডের গাড়িই মূলত ব্যবহৃত হতো প্রেসিডেন্টদের বহনের কাজে। এই ক্যাডিলাক ফ্লিটউডে ছিল গুলি প্রতিরোধী কাচ, গাড়ির পুরো বডিতে ছিল পুরু বর্ম, যাতে যেকোনো হামলাতেও ভেতরের আরোহীদের ক্ষতি না হয়। এর ব্রেক ছিল সাধারণ গাড়ির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এ ছাড়া গাড়িটির চাকার আকারও তুলনামূলক বড় ছিল।

লিংকন টাউন কার (১৯৮৯)

default-image

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জন্য ব্যবহৃত লিংকনের শেষ মডেল এটি। এরপর থেকে শুরু হয় ক্যাডিলাক যুগ। লিংকন টাউন কারে যে ধরনের গুলি প্রতিরোধী কাচ ও সুরক্ষা বর্ম ব্যবহার করা হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে অভীষ্ট মানে পরিণত হয়। এতে ছিল ৭ দশমিক ৫ লিটারের ভি৮ পাওয়ারট্রেইন নামের শক্তিশালী ইঞ্জিন। অন্যান্য গাড়ির তুলনায় এর ওজন বেশি ছিল, তাই প্রয়োজন হয়েছিল শক্তিশালী ইঞ্জিনের।

ক্যাডিলাক ফ্লিটউড (১৯৯৩)

default-image

সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁর মেয়াদে এই মডেলের গাড়িটি ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন। গাড়িটির এই মডেলে সানরুফ সরিয়ে ফেলা হয়েছিল নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে। ৭ দশমিক ৪ লিটারের ভি৮ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছিল এতে। ১৯৯৩ সালের হিসেবে এই গাড়ি ছিল প্রযুক্তিগত দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত। এই গাড়িতে বসেই ফোন করা, ইন্টারনেট ব্যবহার ও স্যাটেলাইটের সুবিধা পাওয়া যেত।

ক্যাডিলাক ডিভেল (২০০১)

default-image

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই মডেলের গাড়িটিই ছিল সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির। সুরক্ষিত বর্মব্যবস্থা, গুলি প্রতিরোধী কাচের সঙ্গে সঙ্গে এই লিমুজিনে ছিল রাতের অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখার মতো সুবিধা। বলা হয়ে থাকে, এ গাড়িতে প্রয়োজনে আহতদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য রক্তও সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।

ক্যাডিলাক ডিটিএস প্রেসিডেনশিয়াল স্টেট কার (২০০৫)

default-image

২০০৫ সালে ক্যাডিলাক ডিটিএস রাস্তায় নামানো হয়েছিল। সিক্রেট সার্ভিসের নকশা অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল এ গাড়ি। গোপনীয়তার নীতির কারণে এর সব সক্ষমতা সম্পর্কে জানা যায় না। তবে জানা গেছে, গাড়িটির পুরো বডিতে প্রায় ৫ ইঞ্চি পুরু বর্ম লাগানো ছিল। গাড়িটির ভেতরে সূর্যরশ্মিও ঢুকতে পারত না। তবে গাড়ির জানালা না খুলেও প্রেসিডেন্ট যাতে সূর্যের আলো উপভোগ করতে পারেন, তার বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ক্যাডিলাক ওয়ান (২০০৯)

default-image

২০০৯ সালে এই গাড়ির প্রচলন হয়েছিল হোয়াইট হাউসে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এর ব্যবহারকারীদের একজন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এটি ব্যবহার করেছেন। এতে ৫ ইঞ্চি পুরু বর্ম, গুলি ও বোমা প্রতিরোধী কাচ তো ছিলই, সেই সঙ্গে ছিল রাসায়নিক অস্ত্র থেকে বাঁচার ব্যবস্থাও। এ ছাড়া এতে উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০১৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাহন হিসেবে গাড়িটি ব্যবহার করা হয়।

default-image

গ্রাউন্ড ফোর্স ওয়ান (২০১১)

default-image

এতক্ষণ শুধু চার চাকার গাড়ি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্রাউন্ড ফোর্স ওয়ান কিন্তু বিশাল এক বাস। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত উড়োজাহাজ ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ থেকে এ বাসের নামকরণ করা হয়েছে। এটি কালো রঙের একটি সুরক্ষিত বাস। লম্বায় ৪৫ মিটার। সিক্রেট সার্ভিসের নকশায় তৈরি বাসটিতে অক্সিজেন ট্যাংক আছে, আছে রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা থেকে বাঁচার ব্যবস্থা। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় রক্তের সরবরাহ এবং শত্রুকে দমনের জন্য ফায়ার সিস্টেম আছে বাসটিতে। এটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ লাখ ডলার।

ক্যাডিলাক ‘দ্য বিস্ট’

default-image

এর ডাকনামটিই বেশি পরিচিত—‘দ্য বিস্ট’। ২০০৯ সালের ক্যাডিলাক ওয়ানের হালনাগাদ সংস্করণ এটি। যুক্তরাজ্যে ভ্রমণের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও ট্রাম্পকে বহন করেছিল দ্য বিস্ট। এ গাড়ির চাকায় গুলি করলেও গাড়ির গতি কমে না। এতে আছে উন্নত যোগাযোগপ্রযুক্তি, বাড়তি অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা। অস্ত্রশস্ত্রও আছে। গাড়িটি তৈরি করেছে বিশ্বখ্যাত জেনারেল মোটরস কোম্পানি। এর ওজন প্রায় আট টন। বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত গাড়ির তকমা পাওয়া দ্য বিস্ট তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার।

default-image

তথ্যসূত্র: হিস্ট্রি ডট কম, মেন্টাল ফ্লস, ভানারামা ডটকম, দ্য কুইন্ট ও হিন্দুস্তান টাইমস

মন্তব্য পড়ুন 0