default-image

বিদেশে দীর্ঘদিন থাকার পর যারা দেশে ফেরে, তারা সাধারণত দেশের রাস্তা দেখে খুব বিস্মিত হয়ে বলে, ‘আরে, এই রাস্তা কবে হলো? এখানে ফ্লাইওভার এল কোত্থেকে? আশ্চর্য, ঢাকা তো বদলে গেছে, আমি চিনতেই পারছি না!’

আমারও এ প্রশ্ন করা উচিত ছিল, কিন্তু ততক্ষণে মাথায় ঢুকে গেছে অন্য এক চিন্তা। ঢাকা শহর বদলে গেছে নাকি আমি চোখে ভুল দেখছি? আসার পর থেকেই দেখছি, সবাই কেমন যেন নড়েচেড়ে কথা বলছে। এয়ারপোর্ট থেকেই খেয়াল করছি ব্যাপারটা। ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট জমা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অফিসার আমার দিকে তাকিয়ে ‘কত দিন থাকবেন?’ বলেই নিজের গালে ঠাস করে একটা চড় মারলেন। আমি চমকে উঠলাম। কিন্তু ভদ্রলোক নির্বিকার। পাসপোর্টে সিল বসিয়ে আমার হাতে তুলে দিলেন। তারপর হেসে আরেকবার চড় মারলেন নিজের গালে। আমি হতভম্ব হয়ে দ্রুত চলে এলাম সেখান থেকে।

লাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। এখানেও দেখি একই ঘটনা। ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ করে এমনভাবে হাত নাড়ছে, যেন হাতে কোনো পোকা বসেছে। প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর কাজটা করছে সে। শেষমেশ জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘আপনার হাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে?’

‘কই, না তো, স্যার।’

‘বারবার হাত দিয়ে কিছু একটা তাড়ানোর চেষ্টা করছেন মনে হলো।’

লোকটা আবার মাছি তাড়ানোর মতো করে হাতটা নেড়ে বলল, ‘হাত না নাড়াইয়া গাড়ি চালায় কেমনে? ঢাকায় নতুন আসছেন নাকি?’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। জরুরি কাজে দেশে ফিরেছি। কিন্তু শুরু থেকেই সবকিছু কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে। যখনই গাড়ি সিগন্যালে আটকাচ্ছে, দেখছি, একই রকম দৃশ্য। কেউ হাত নাড়ছে। কেউ নাড়ছে পা। কেউ ডানে–বাঁয়ে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। কেউ আবার চড় মারছে নিজের গালে-ঘাড়ে।

বাসায় ফিরে পুরো ব্যাপারটা চেপে গেলাম। কে জানে, আব্বা-আম্মা এসব কথা শুনলে ভাববে বিদেশের পড়ালেখার চাপে ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু বাসার সবারই একই অবস্থা! কেউ স্থির নেই। নড়াচড়া করছে, গায়ে-হাতে চড় মারছে! ভয়ংকর অবস্থা!

অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। তবু কিছুই বললাম না। চুপচাপ খেয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। হাতিরঝিলের দিকে নাকি বসার সুন্দর জায়গা করেছে। ভাবলাম, ওখানে গিয়ে একটু বসি। সন্ধ্যার একটু আগে আগে গিয়ে পৌঁছালাম জায়গাটায়। লোকজন নেই দেখে লেকের ধারে বসেছিলাম। এমন সময় লেকের ধারে যাচ্ছি দেখে সবাই অবাক হচ্ছিল। কারণটা বুঝতে পারলাম একটু পরই। অন্ধকার হওয়ামাত্র ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এসে ঘিরে ধরল আমাকে। দুই হাত দুই পা দিয়ে যেভাবে পারলাম, মশা তাড়ালাম। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম বাসায়।

আমার মনে হলো এখনই চলে যাওয়া উচিত। কদিন আগেই দাঁতে রুট ক্যানাল করিয়েছি। এ অবস্থায় রুট লেভেলের বন্ধুর হাতে চড় খেয়ে দাঁতের ক্ষতি করতে চাই না। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দেওয়া উত্তম।

দুদিন পর আমার সমাজবিজ্ঞানী বন্ধু পারভেজ মশাররফের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম ওর বাসায়। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সবার হয়েছে কী? এমন হাত ছোড়াছুড়ি, লাফালাফি করছে কেন?’

‘আরে বন্ধু, রেগুলার মশা তাড়াতে তাড়াতে এমন অবস্থা যে নড়াচড়া করা অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন মশা থাকলেও থাপড়ায়, না থাকলেও থাপড়ায়।’

‘বলিস কী?’

মশাররফ ঠাস করে নিজের গালে একটা চড় মেরে বলল, ‘ঠিকই বলছি।’

‘এ তো ভয়ংকর অবস্থা!’ ব্যাপারটা নিতেই পারলাম না আমি।

‘আশ্চর্য! তুই এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখছিস কেন? ঢাকার মশারা একধরনের সোশ্যাল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করছে।’

‘কী?’

‘খেয়াল করে দেখবি, চায়ের দোকানগুলো খালি। অনেক দোকান সন্ধ্যার পর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হলো মশা। মশার কামড়ে লোকজন চায়ের দোকানে বা মাঠে–ঘাটে বসে আড্ডা মারতে পারছে না। চলে যাচ্ছে বাসায়। বাসায় গিয়ে তারা কী করছে? সময় দিচ্ছে পরিবারকে। তার মানে, মশারা আমাদের আরও পারিবারিক, আরও সামাজিক হতে ধাবিত করছে। এ ধরনের ন্যাচারাল সোশ্যাল ওয়ার্কার পৃথিবীর আর কোথায় পাবি, বল? এ জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে। মেয়ররা আমাদের কথা কত ভাবেন, দেখেছিস?’

এর মধ্যে মশাররফের স্ত্রী এসে চা-নাশতা দিয়ে ডানে–বাঁয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘আপনার বন্ধু মাঝেমধ্যে এলোপাতাড়ি চড় মারতে থাকে।’

আমার মনে হলো এখনই চলে যাওয়া উচিত। কদিন আগেই দাঁতে রুট ক্যানাল করিয়েছি। এ অবস্থায় রুট লেভেলের বন্ধুর হাতে চড় খেয়ে দাঁতের ক্ষতি করতে চাই না। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দেওয়া উত্তম।

‘তোর ভাবি কী করে শোন।’ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল মশাররফ, ‘সে তো মশার প্যাঁ পোঁ ছাড়া ঘুমাতেই পারে না। জানিস, ওকে মশার পিনপিন শব্দের অডিও কিনে দিয়েছি। ঘুমানোর আগে ওটা প্লে করে দিই, ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে ঘুম...কী রে, তুই উঠে পড়লি যে? চা খাবি না?’ নিজের গালে চড় মেরে বলল মশাররফ।

‘না রে। ঘুম পাচ্ছে। জেট ল্যাগ মনে হয়।’

default-image

বাসায় ফেরার সময় জনশূন্য চায়ের দোকান, ফাঁকা পার্ক, আড্ডাহীন গলি দেখে মনে হলো মশাররফ ভুল কিছু বলেনি।

রাতে খাবার টেবিলে আম্মা বলল, ‘ভেবেছিলাম বাবুকে তোর কাছে পাঠিয়ে দেব। সারা দিন বাইরে বাইরে থাকত। কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে এসব নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হতো আমার। অনেক চেষ্টা করেও ওকে ঘরে রাখতে পারতাম না। কোনো না কোনো অজুহাতে বাইরে যেত তোর আদরের ছোট ভাই। কিন্তু ইদানীং ঠিক সন্ধ্যার আগে আগেই বাসায় ফিরে আসে ও। এখন আমি একদম নিশ্চিন্ত।’

‘সন্ধ্যার আগে চলে আসে কেন?’

‘ওমা! বাইরে মশা না! সবাই তো এখন সন্ধ্যার পরপর বাসায় ফিরে আসে। বাইরে বসে বসে মশার কামড় খাবে নাকি? যা বড় বড় মশা একেকটা! এক্সপোর্ট কোয়ালিটি!’

‘তো মশা নিধনের উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন কেউ?’

‘কী যে বলিস তুই!’ ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতে চড় দিয়ে বললেন আব্বা, ‘আরে, মশা তো ভালো জিনিস। মশার ভয়ে অলিগলিতে এখন ছিনতাই হয় না। রাতে চোর আসার সাহস পায় না।’

‘কেন?’

‘ছিনতাই করতে হলে তো শিকারের জন্য ৫–১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। ওই ৫–১০ মিনিটে মশারা ওর বারোটা বাজিয়ে ফেলবে। এ জন্য ছিনতাই এখন একেবারে কমে গেছে।’

‘ভালো। খুব ভালো।’

আব্বা আবার নিজের ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতে চড় মারলেন।

রাতে মশারির ভেতর ঢুকে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলাম। এমন কালচে ছোপওয়ালা মশারি কেন কিনল, সেটা মাথাতেই ঢুকল না আমার। একটু পর বুঝলাম, ওগুলো কালো নয়। পুরো মশারিজুড়ে ছেয়ে আছে কালো কালো মশা। মাথাটা ঘুরে উঠল আমার। ঠিক করলাম, কাজ সেরে যত দ্রুত সম্ভব আবার ফিরে যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এক সপ্তাহ পর যখন হিথ্রো বিমানবন্ধরের ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট জমা দিলাম, ইমিগ্রেশন অফিসার বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার? আমি কি কোনো ভুল করেছি? তুমি নিজের গালে নিজে চড় মারছ কেন?’

‘কই, না তো!’ বলে পাসপোর্ট নিয়ে ভেতরে চলে গেলাম আমি।

বিজ্ঞাপন
একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন