default-image

১.

২০০৮ সালের ৫ নভেম্বর বুধবার দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বাঁশ নিয়ে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন রাত ১২টার পর বাঁশ বা এর কঞ্চি কাটলে তা থেকে বের হবে বিশেষ পানি, যা পান করলে মিলবে সব বালামসিবত থেকে মুক্তি। বড় থেকে ছোট, লম্বা কিংবা খাটো, চিপাচাপা, আনটোনা-বানটোনা—যত সমস্যা আছে, সব শেষ। আসলে কোনো একজনের বরাত দিয়ে ছড়িয়ে পড়া ওই গুজবে বিলীন হয় নিরীহ বাঁশের বংশ। এরই মধ্যে এই বঙ্গমুলুকের হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেয় বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। বলা হয় বাঁশের সেই পানির রহস্য। ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ বাঁশের পত্ররন্ধ্র খোলা ও বন্ধ হয় তুলনামূলক কম। অধিক কুয়াশায় অভিস্রবণের মাধ্যমে এদের কাণ্ডে পানি সঞ্চিত হয়। তাই হেমন্ত ও শীত মৌসুমে নরম বাঁশ (তল্লা) বা কঞ্চি কাটলে সঞ্চিত সেই পানি বের হওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক।

২.

করোনা মহামারি শুরুর পর থেকেই বিশ্বব্যাপী টোটকা চিকিৎসার মহা কারবার শুরু হয়। এরই মধ্যে পরিচিত একজনের দোহাই দিয়ে দেশে গত বছরের ১৭ মার্চ বেখবর ছড়িয়ে পড়ে, তিনটি থানকুনিপাতা খেলে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তবে তা খেতে হবে দিনের আলো ফোটার আগেই। গুজব ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেষজ পাতাটি খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। কোথাও কোথাও থানকুনিপাতা খেতে মাইকযোগে আহ্বান জানানোও হয়। থানকুনিপাতা খাওয়ার এই হুজুগ পৌঁছায় রাজধানী পর্যন্ত। তখন কারওয়ান বাজারে পাঁচটি থানকুনিপাতা ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। তাও একপর্যায়ে বাজার থেকে উধাও। কিন্তু আদৌ থানকুনি দিয়ে করোনা দূরীকরণের ফর্মুলা আবিষ্কার হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

এক নম্বর ও দুই নম্বর ঘটনার আলোকপাত করা হলো আবদুর রহমানের সেই আমের কথা মাথায় রেখে। ভাগ্যিস, মানুষ এটাকে অলৌকিক বললেও কোনো মহৌষধি গুজবের কথা শোনা যায়নি। পত্রিকা মারফত জানা গেল, দুষ্টু ছেলের দল ওই আম ছিঁড়ে সঙ্গে নিয়ে যায়নি। জায়গার মাল জায়গায়ই ফেলে গেছে। নচেৎ ভাবনার উদয় হতো, এই আমই-বা এখন কোথায় পাচার হচ্ছে? আর তার বিচিই-বা কোথায় যাচ্ছে! এটা না আবার কোনো গোপন-কঠিন রোগের মহৌষধ।

৩.

লিচুগাছে যদি সত্যিই আম ধরে, তাহলে এই গাছের নাম কী রাখা যায়? একটা প্রস্তাব দিতে পারি—আচু বা মচুগাছ (আম+লিচু)। যেমনটা ঘটেছে ব্রিঞ্জালুর ক্ষেত্রে। ৪ এপ্রিল প্রথম আলোর রোববারের ক্রোড়পত্র স্বপ্ন নিয়েতে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। তাতে একটি বিচিত্র গাছের কথা বলা হয়েছে। ওই গাছে একই সঙ্গে আলু ও বেগুন—দুটোরই ফলন হয়। রাজধানীর উত্তরার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) একদল গবেষক একই গাছে ওই দুই ধরনের ফসল উৎপাদনে সফল হয়েছেন। জোড় কলম পদ্ধতিতে এটি সম্ভব হয়েছে। গবেষক দল বেগুনের ইংরেজি পরিভাষা ‘ব্রিঞ্জাল’ আর ‘আলু’ একত্র করে গাছটির নাম দিয়েছে ‘ব্রিঞ্জালু’।

কিন্তু আবদুর রহমানের লিচুগাছের কথা শুনে গবেষকেরা প্রথম থেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কারণ, লিচু ও আমের টিস্যু সিস্টেম এক না হওয়ায় আম ও লিচুর গ্রাফটিংও সম্ভব হওয়ার কথা নয়। যেমনটা বলেছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (রুটিন দায়িত্ব) ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র হালদার, ‘ঘটনাটি ফেসবুকে দেখেছি। লিচু ও আমের পুষ্পমঞ্জরি যেখানে হয়, সেটা লম্বা। লিচুরটা লম্বা হলেও আমটির বোঁটাটি স্বাভাবিকের তুলনায় খুব খাটো। এসব দেখে বিষয়টি খটকা লাগছে। লিচু ও আম এক পরিবারের উদ্ভিদ নয়। ক্রোমোজমসংখ্যা যদি এক হয়, তবে অনেক সময় ঘটতে পারে। তবে লিচু ও আমের ক্ষেত্রে এটা অবিশ্বাস্য। লিচু ও আমের টিস্যু সিস্টেম এক না হওয়ায় আম ও লিচুর গ্রাফটিংও সম্ভব নয়। লিচুর সঙ্গে আমগাছের ডাল জোড়া লেগেছে, এমন উদাহরণ নেই। উদ্ভিদতত্ত্বে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।’ তিনি আরও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘কেউ আঠা দিয়ে লিচুর ডালে আমটি লাগিয়েও দিতে পারেন। এখন আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। কয়েক দিনের মধ্যে ঝরে পড়লে বুঝবেন চমক সৃষ্টির জন্য কেউ আমটি লিচুর ডালে আটকে দিয়েছিলেন। আর আমটি যদি বড় হতে থাকে, তখন সেটাকে অস্বাভাবিক ঘটনা বলা যেতে পারে। তখন এটা নিয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে।’

এই খবর প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশের দিনই খবর আসে, ওই আম আর নেই। কয়েক তরুণ এক কলহের জেরে ছিঁড়ে ফেলেছেন। পড়ে একাধিক গণমাধ্যম এ নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন করে। সেসব খবরে দাবি করা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ওই আমের বোঁটায় আঠাসদৃশ বস্তুর উপস্থিতি দেখেছেন। তাঁরা এ-ও বলেছেন, ওটি আমের বোঁটা ছিল না, ছিল লিচুরই শুকনা চিকন ডাল মাত্র। বর্তমানে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সেই সিঙ্গিয়া কলোনিপাড়ার অবস্থা কী, তা জানা নেই।

৪.

গুজব কখনো কখনো মারাত্মক আকার ধারণ করে। পদ্মা সেতুতে মানুষের কাটা মুণ্ডু লাগবে—এমন কথা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ২০১৯ সালে। এরই মধ্যে ওই বছরের ২০ জুলাই সন্তানের ভর্তির বিষয়ে স্কুলে কথা বলতে গিয়ে গণপিটুনিতে নিহত হন মা তাসলিমা বেগম ওরফে রেনু। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তখন দুই সপ্তাহে সারা দেশে ২১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত পাঁচজন। আহত ২২ জন। গুজবের কারণে আমরা প্রায়ই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প দেখতে পাই। এত ‘শিক্ষা হওয়ার’ পরও কেন যেন আমরা কানের খোঁজে চিলের পেছনে দৌড়াতেই থাকি দৌড়াতেই থাকি!

বিজ্ঞাপন
একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন