: হ্যাঁ, বস্তিতে। আর সেই বস্তির পাশেই এক শিল্পপতির বাড়ি। আর সেই শিল্পপতির আছে এক মেয়ে। ২২ বছর বয়স। ফরসা; সুন্দরী। গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

প্রডিউসার বলে উঠলেন, ‘আহা, কী দারুণ! কী দারুণ! খুব ভালো।’

আমি মিনমিন করে বললাম, ‘কিন্তু আমার গল্পটা তো...’

: আপনার গল্পটাই তো। ওই গল্পে আমরা একটুও হাত দেব না। বস্তিতে থাকা আপনার এই রাতুলই তো তার জন্মপরিচয় খুঁজছে। আর তাকে সাহায্য করছে নদী!

: নদী কে?

: আরে, ওই যে শিল্পপতির মেয়ে। হিরোইন। নদীর সঙ্গে আপনার রাতুলের প্রথমে একটা ঝগড়া হয়। রাতুল দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়; আর নদী সাঁ করে তার পাশ দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। রাস্তা থেকে ছিটকে আসা কাদাপানি লাগে রাতুলের গায়ে। রাতুল চিৎকার করে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে নদীর গাড়ি আটকায়। নদী রেগেমেগে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। নদীর ফার্স্ট এন্ট্রি। দ্রিম দ্রিম মিউজিক। রাতুল-নদী মুখোমুখি। রাতুল বলে, ‘এই মেমসাহেব, গাড়িওয়ালা হয়েছেন বলে কি রাস্তার মানুষদের চোখে পড়ে না?’

প্রডিউসার বললেন, ‘বাহ্! কী দারুণ ডায়ালগ! একসিলেন্ট!’

আমি একটা ঢোক গিলে বললাম, ‘কিন্তু আমার গল্পটা তো...’

ডিরেক্টর বললেন, ‘আপনার গল্পটাই তো...এরপরেই রাতুল আর নদী চোখে চোখ...তারপর একটা গান।’

প্রডিউসার বললেন, ‘ইয়েস। বৃষ্টিভেজা গান। হিরোইন সামনে ছুটছে...পেছনে হিরো। লোকেশন কক্সবাজার!’

ডিরেক্টর বললেন, ‘না স্যার, এই সিনেমায় একটু খরচ করেন, স্যার। একটা গান থাইল্যান্ডে, স্যার!’

প্রডিউসার বললেন, ‘ওক্কে, থাইল্যান্ডেই হোক!’

ডিরেক্টর হেসে বললেন, ‘দেখেছেন, আপনার গল্পে স্যার খুব ইমপ্রেসড। সোজা থাইল্যান্ড!’

: কিন্তু...

: আরে, কোনো কিন্তু না! আপনার গল্প তো দাঁড়িয়ে গেছে, ভাই। আপনারই গল্প!

: আসলে আমারটা জন্মপরিচয় খোঁজার গল্প ছিল একটা ছেলের।

: এখানেও তো তাই। আমাদের হিরো তার জন্মপরিচয় খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে জানতে পারে নদীর বাবাই আসলে তার বাবাকে মেরেছে!

: কার বাবাকে?

: হিরোর বাবাকে।

: কবে?

: অনেক আগে। হিরোর বাবা আসলে ছিল একজন সৎ পুলিশ ইন্সপেক্টর। আর নদীর বাবা ছিল চোরাকারবারি! দুজন মুখোমুখি। সৎ আর অসতের দ্বন্দ্ব। সংঘাত! সাসপেন্স! সিনেমায় নতুন অ্যাঙ্গেল। হিরোইনের বাবা মেরে ফেলে হিরোর বাবাকে!

: কিন্তু এটা তো অন্য গল্প হলো! আর নতুন কিছুও তো না...

: কে বলল, নতুন কিছু না! হিরোইনের বাবা হিরোর বাবাকে মেরে ফেলছে একটা সামান্য নেইলকাটার দিয়ে। সেই নেইলকাটার হিরো তার পকেটে নিয়ে ঘোরে!

প্রডিউসার বললেন, ‘একসিলেন্ট! এটা একেবারে নতুন উইপেন! নেইলকাটার নিয়ে একটা গানও হতে পারে। মদ খেয়ে হিরোইন হাতে নেইলকাটার নিয়ে গান গাচ্ছে! আহা, চোখ ভিজে যায়!’

: কিন্তু...

: আর কিসের কিন্তু? একেবারে আপনারই গল্প! হিরো রিভেঞ্জ নেবে। জন্মপরিচয় বের করবে। জানতে পারবে তার মা আজও বেঁচে আছে। আবারও নতুন অ্যাঙ্গেল সিনেমায়। মা বেঁচে আছে, কিন্তু মায়ের স্মৃতি নাই। একটা গান। পুরোনো একটা গান। এই গান শুনত হিরোর মা। এবার হিরো গেয়ে ওঠে ওই গানটাই। পরেরটা স্যাড ভার্সনে। মা ছুটে আসছে...হিরো ‘মা’ বলে জড়িয়ে ধরছে মাকে! হিরো তার জন্মপরিচয় খুঁজে পাচ্ছে!

প্রডিউসার প্রায় কেঁদে ফেলতে ফেলতে বললেন, ‘আহা, কী সিন! উফ্‌ফ্!’

আমি বললাম, ‘কিন্তু আমার গল্পের শেষটা তো এমন না!’

ডিরেক্টর বললেন, ‘আরে, আপনি যেমন শেষ ভেবেছেন, তেমনই হবে সব। কোনো অসুবিধা নাই। তবে হিরো আর হিরোইনের মিল কিন্তু করাতেই হবে। হ্যাপি এন্ডিং!’

: মানে আমার গল্পটা তো আসলে এ রকম ছিল না...

: কে বলল, এ রকম ছিল না? এ রকমই ছিল। আপনার গল্প আর আমরা জানি না? আপনি যখন বলছেন একজনের জন্মপরিচয় খোঁজার গল্প, তখনই আমরা বুঝে গেছি। খুব ভালো গল্প এটা। আপনাকে কংগ্রাচুলেশন! আপনার অসাধারণ গল্পটা নিয়ে আমরা ফিল্ম করছি! শুধু একটা চেঞ্জ করতে চাই...

: আবার কী?

: হিরোর নামটা। হিরোইনের নাম যেহেতু নদী, হিরোর নামটা তাই সাগর হোক, কী বলেন? এইটুকু চেঞ্জ কিন্তু ভাই করতে দিতেই হবে। আর আমি তো সিনেমার নামও পেয়ে গেছি—ও নদী, ও সাগর! কী বলেন, খুব মিনিংফুল হয়েছে না নামটা? ভাই, আপনার পছন্দ হয়েছে তো? আপনারই তো গল্প, শুধু নামটা আমরা দিলাম। এটুকু তো করতেই পারি, তাই না?

আমি আর কিছু বললাম না। ওদের কন্ট্রাক্ট পেপারে শুধু সাইন করে একটা সিনেমার গল্প লেখায় হাত দিলাম।

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন