বাবা হয়ে বুঝেছি বাবার শূন্যতা

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। বাবা মারা গেলেন। অসুস্থতাজনিত মৃত্যু। তখন নাকি আমার বয়স ছয় মাস। বসতেও শিখিনি।

যখন দিনে দিনে বড় হচ্ছি। বুঝতে শিখছি। পদে পদে তখন অনুভব করছিলাম শূন্যতা—আমার বাবা নেই।

স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে তাদের বাবাকে দেখতাম। বাবার কাছে নানা আবদার করত তারা, তখন খারাপ লাগত। সেই খারাপ লাগা বয়ে বেড়িয়েছি বড় হয়েও। কলেজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখলাম। দেখা গেল, বন্ধুরা কোনো আনন্দভ্রমণে যাবে বা কোনো উৎসব আয়োজন করবে। আমি তাদের সঙ্গে যেতে পারতাম না, উৎসবে সামিল হতাম না। কারণ, আমার কিছু প্রয়োজন হলে ভাইদের ওপর নির্ভর করতে হতো। ভাইদের কাছে সব দাবি করা যায় না, এই বোধ আমার ভেতর ছিল। যা মৌলিক, যা জরুরি, সেগুলো ছাড়া কোনো শখ খুব বেশি পূরণ হয়নি তাই। তখন বাবার শূন্যতা সব থেকে বেশি অনুভব করতাম।

তখন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যেত। মনে হতো, বাবা হচ্ছেন সেই মানুষ, যার কাছে সব আবদার করা যায়, সব দাবি করা যায়। এই কথা আমি আরও বুঝতে শিখলাম নিজে বাবা হয়ে। এখন বুঝি সন্তানদের কত আবদার থাকে বাবার কাছে। যদি সামর্থ্য থাকে, সব চাহিদা যিনি পূরণ করেন, সেই মানুষ বাবা।

আমি নিজের সন্তানদের নিয়ে যখন খেলা করি, ওরা আমার ঘাড়ে চড়ে, হাত ধরে মাঠে বেড়াতে যাই। তখন ওদের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করি, আর আমার জায়গায় আমার বাবাকে। তখন মনে হয়, আমার বাবা থাকলে এভাবেই হয়তো ঘুরতাম, খেলা করতাম। কিন্তু সেটা আসলে আমি কখনোই পাইনি। বাবার অনুভূতি পুরোটাই আমার কল্পনায়। তাঁর চেহারা, স্পর্শের অনুভূতি বাস্তবে কিছুই নেই আমার কাছে।

পৃথিবীর সব বাবাই তাঁর সন্তানদের প্রচণ্ড ভালোবাসেন। কিন্তু আমি যেহেতু ছোটবেলায় বাবা হারিয়েছি, তাই আমার সন্তানদের দিকে আমি সব সময়ই একটু বেশি নজর রাখি। ওদের যেকোনো চাহিদা পূরণ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। নিজের যে সংকটের মধ্যে বড় হয়েছি, সেটা ওদের ক্ষেত্রে হতে দিতে চাই না। আসলে ছোটবেলায় যারা বাবা হারিয়েছেন বা বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই এই অনুভূতি বুঝতে পারবেন। সবাই এই বিষয় উপলব্ধি করতে পারবেন না।