গ্রেপ্তার করে সেনাক্যাম্পে আটকে আইনের শিক্ষা!

ইথিওপিয়ার সংস্কারপন্থী নতুন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাঁর আমলে গণগ্রেপ্তারের এমন ঘটনা বেশ অপ্রত্যাশিত। ছবি: রয়টার্স
ইথিওপিয়ার সংস্কারপন্থী নতুন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাঁর আমলে গণগ্রেপ্তারের এমন ঘটনা বেশ অপ্রত্যাশিত। ছবি: রয়টার্স

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিক। ১৭ বছর বয়সী বেরেকেত বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে গির্জা থেকে বাড়িতে ফিরছিলেন। হুট করেই হাজির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কোনো পরোয়ানা ছাড়াই বেরেকেতকে তুলে নেওয়া হলো। এর প্রায় ২৫ দিন পর ছাড়া পায় বেরেকেত। জানা যায়, সেনাক্যাম্পে আটকে রেখে তাকে নাকি আইনের শিক্ষা দিয়েছে সরকার!

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের খবরে জানানো হয়, ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় এমন ঘটনা ঘটে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বেরেকেতের মতো প্রায় তিন হাজার মানুষকে এভাবে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ইথিওপিয়ার পুলিশপ্রধান বলেন, গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ তরুণ ছিলেন। ১৮ অক্টোবর তাঁদের মুক্তি মেলে। সেনাক্যাম্পে আটকে এসব মানুষকে নাকি দেশের সংবিধান ও আইন সম্পর্কে ‘শিক্ষা’ দেওয়া হয়েছে।


স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, আটক করা হাজারো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। মুক্তির সময় তাঁদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে একটি সাদা রঙের টি-শার্ট। ওতে লেখা, ‘শান্তি আমাদের সবার জন্য—আসুন একে রক্ষা করি।’

এই গণগ্রেপ্তারের পেছনে ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। গত সেপ্টেম্বরে আদ্দিস আবাবায় কয়েক দিনের দাঙ্গা হয়েছিল। পুলিশের তথ্যমতে, ওই সহিংসতার শুরুতে শহরে ২৮ জন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের অনেকেই ছিলেন ইথিওপিয়ার একটি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। দাঙ্গা চলাকালে স্থানীয় একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থানের সম্ভাবনা দেখা দেয়। পরে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যকার সংঘর্ষে কমপক্ষে আরও ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ইথিওপিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গণগ্রেপ্তার অভিযান চালায়।

নতুন করে শিক্ষা দেওয়ার জন্য গণগ্রেপ্তারের ঘটনা ইথিওপিয়ায় নতুন কিছু নয়। দেশটির এর আগে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০০৫ সালে বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোয় হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৬ সালে দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির সময়ও এমন আটকের ঘটনা ঘটেছিল।

ইকোনমিস্ট বলছে, এভাবে আটকের পর সাধারণত সেনা কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সামনে ভাষণ দেন। ভাষণের বিষয় হিসেবে থাকে ইথিওপিয়ার রেনেসাঁ, নব্য উদারবাদের বিপদ ও পশ্চিমা দেশগুলোর পৃষ্ঠপোষণায় সৃষ্ট হুমকি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশটির সংস্কারপন্থী নতুন প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের আমলে এমন ঘটনা বেশ অপ্রত্যাশিত। গত এপ্রিলে আবি আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। এরই মধ্যে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে তিনি মুক্তি দিয়েছেন। দেশটির কিছু দমননীতিও সংশোধন করা হচ্ছে। প্রায় সময়ই আইনের শাসনের গুরুত্ব ফলাও করে প্রচার করে থাকেন আবি আহমেদ।

অবশ্য নতুন প্রধানমন্ত্রীর আমলে গণগ্রেপ্তারের নীতিতেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা বলছেন, সেনাক্যাম্পে কোনো আটক ব্যক্তিকে পেটানো হয়নি। এতে তাঁরা বেশ আশ্চর্যও হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নিজ দলের ভেতরে কিছুটা চাপের মুখে রয়েছেন আবি আহমেদ। আর তা থেকেই গণগ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত। তবে গত অক্টোবরেই নতুন প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করে নিয়েছেন যে অধিকাংশ গ্রেপ্তারই ভুল ছিল।

এর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইথিওপিয়ায় নতুন যুগ শুরু হলেও ক্ষমতাসীন দলের বদল হয়নি। আগের দমননীতি চালু করা রাজনৈতিক দলই নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। ফলে, সরকারের আচরণে অতীতের ভূত কিছুটা হলেও রয়ে গেছে। কারণ, কথায় আছে, ‘কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না।’