তোমার ওই করোনা আমায় ধরবে না

>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]
করোনাভাইরাস। ছবি: রয়টার্স
করোনাভাইরাস। ছবি: রয়টার্স

আমার সঙ্গে আরও দুজন একই শিডিউলে কাজ করেন। একজন বালু, ঘানার। আর একজন চালা, উগান্ডার। করোনা ক্রমেই তার থাবার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছিল। একদিন বালু বলল, তুমি লক্ষ করেছ, আমরা কালোরা মরছি কিন্তু কম। একেবারেই কম।

-তাই নাকি? তা, আমিও তো কালো।
-তোমরা এশিয়ান।

সে বলল, আমি বলছি কি, আমরা যারা আফ্রিকান এখানে রয়েছি, সেই আমাদের কথা। আমি বললাম, না। করোনা সাদাকালো বিচার করে না। বাগে পেলে আমাকে যেমন, তেমন তোমাকেও ছাড়বে না।

মার্চের আটাশে আমি কাজে যাওয়া বন্ধ করেছি। যুক্তরাষ্ট্রে যেভাবে করোনার আক্রমণ এবং মৃত্যুর মিছিল বেড়ে চলেছে, তাতে আমি নিজেকে ও নিজের পরিবারের সবাইকে নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছি।

তো দু সপ্তাহের মতো ঘরে থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি গেলাম আমার প্রতিষ্ঠানে। আমার মুখে মাস্ক। হাতে গ্লাভস। অফিসে গিয়ে বললাম, আমি আর কিছুদিন দেখব। এর মধ্যে যদি অবস্থা স্বাভাবিক হয় ...। আমাকে বলা হলো, ইচ্ছে করলে আমি সরকার কর্তৃক জারিকৃত লকডাউন মানতে পারি। যে ক'দিন কাজ করব না সেই ক'দিনের বেতন পাব না। তবে কবে কাজে যোগ দেব; তা যেন আগেই অফিসে জানাই। বেরিয়ে আসার আগে আমার ডিপার্টমেন্ট গেলাম। দেখলাম বালু কাজ করছে।

-হাই বালু। কেমন আছো?
-হাঁ ভালো। অনেক দিন পর তোমার দেখা পেলাম। তা তুমি?
-আমি ভালো। তা তোমার মাস্ক, গ্লাভস কোথায়?
-আরে না। আমার ওসব লাগবে না। তোমার ওই করোনা আমাকে ধরবে না।
স্বভাব সুলভ উচ্ছ্বসিত হাসি বালুর।
-ওকে, সাবধানে থাক। ভালো থেক বালু।

২২ মে আবার অফিসে গেলাম। আমার মতো অনেকেই মাস্ক, গ্লাভস পরেছে। আমি আগামী সোমবার (২৫ মে) থেকে কাজ শুরু করব জানিয়ে দিলাম অফিসে। আমাকে বলা হল, সমস্যা নেই। নির্ধারিত দিনে কাজ শুরু করতে পারি। গেলাম আমার ডিপার্টমেন্টে। চালা একা কাজ করছে।
-হাই চালা। কেমন আছো?
-হাঁ ভালো। তুমি?
-আমি ভালো। তা বালু কোথায়? তাকে যে দেখছি না।
-তুমি জানো না?
-কী?
-সে আর আসবে না।
-কেন? আসবে না কেন? অন্য কোথাও চলে গেছে নাকি?
-না। সে তো নেই।
-নেই! নেই মানে?
-গেল সপ্তাহে বালু মারা গেছে। করোনা হয়েছিল তার।

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। চালা এ কী বলল!
-স্যরি চালা। বালুর সংবাদ শুনে আমি খুবই দুঃখ পেলাম। আমি ভাবতেই পারছিনা যে, বালু নেই। তা চালা তুমি মাস্ক পরোনি কেন? বালুর মত তুমিও কি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চাও?
-আরে না। বালুর পরিবারে সবাই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। আমরা তো শুধু দুই ভাই এদেশে। আমাদের কিচ্ছু হবে না।
-চলি চালা। সাবধানে থেকো। আগামী সোমবার আমি কাজে আসছি। ওদিন দেখা হবে। তবে সেদিন থেকে তোমাকে কিন্তু মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে।
-ও তাই? ওকে। ওয়েল কাম। আসো। কোন সমস্যা নেই।

ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসল চালা। আমি বিদায় নিলাম।

ভাবছি, চোখের পলকে এ জগতের চালচিত্র কেমন পাল্টে গেল! পুরো বিশ্ব এখন করোনার আঘাতে জর্জরিত। কোথায় ছিলাম মানুষ আমরা? এখন কোথায় আছি? এবং কোথায় যাব বিশ্ববাসী? ভাবছি বালুর কথা। করোনা যুদ্ধে হেরে যাওয়া এক যুবকের গল্প এখন আমি গুছিয়ে নিজেই নিজেকে শোনাতে চাইছি। একজন বালুর গল্প। এখনও বালু আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, 'তোমার ওই করোনা আমাকে ধরবে না।'

[email protected]