default-image

গত জুন মাসে হুট করেই চাকরি ছেড়েছেন অতনু। ভালো বেতন, দারুণ সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন অতনু। কারণ হিসেবে বলেন, ‘কাজের পরিবেশ ভালো থাকলেও কোনো বন্ধু তৈরি করতে পারছিলাম না। কেমন জানি সবাই শুধু সহকর্মী-সহকর্মী আচরণে অভ্যস্ত। অফিসে বন্ধু না থাকলে কি কাজের মান ভালো হয়?’

অতনুর মতকে সমর্থন করেন বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রযোজক শামীম উল হক। তিনি বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে বন্ধু তৈরি করলে আসলে সবারই লাভ। আমি আগে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলাম, সেখান থেকে সরে এসেছি একমাত্র বন্ধুহীন অবস্থার কারণে। সহকর্মী যখন কাজের ক্ষেত্রে বন্ধু হয়ে ওঠেন, তখন কিন্তু দুজনেরই কাজের মান ভালো হয়-এটা আমরা বুঝতে চাই না।’

কর্মক্ষেত্রে বন্ধুত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ব্যবসা-বাণিজ্যবিষয়ক ম্যাগাজিন ফাস্ট কোম্পানির সম্পাদক রবার্ট সাফিয়ান। তাঁর মতে, ‘কর্মক্ষেত্রে পেশাদারত্বকে গভীর করে তোলে বন্ধুত্ব। কাজের একঘেয়েমি দূর করতে কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। আর দলগতভাবে কাজে সাফল্য পেতে সহকর্মীদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বেশ গুরুত্বপূর্ণ।’

হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের মে, ২০১৭ সংখ্যার এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, কর্মক্ষেত্রে বন্ধুরা মানসিক চাপ কমাতে এবং কাজে সহযোগিতা করতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেসিকা মেথট ৪৭টি দেশের চার শতাধিক পেশাজীবীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে এটি বের করেছেন। পেশাজীবনে যাঁরা কর্মক্ষেত্রে বন্ধু তৈরি করতে পারেন, তাঁরা যাঁদের বন্ধু নেই, তাঁদের চেয়ে ৬৭ শতাংশ বেশি দ্রুত কাজ শেষ করতে পারেন। শুধু তা-ই নয়, বন্ধুত্বের কারণে কর্মক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ কাজের ফলাফল সহকর্মী-সহকর্মী সম্পর্কের চেয়ে ভালো হয়।

 ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অফিসে যাঁরা শীর্ষপদে অসীন হয়েছেন, তাঁদের শতকরা ৯৫ জনই সহকর্মী হিসেবে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতার। এ ছাড়া ১৯৫০ সালের পর পৃথিবীতে শীর্ষ ধনী যাঁরা হয়েছেন, তাঁদের শতকরা ৯৮ জনই কর্মজীবন বা পেশাজীবনের শুরুতে কর্মক্ষেত্রে দারুণ বন্ধু ছিলেন বলে ফাস্ট কোম্পানি ম্যাগাজিনের তথ্যে জানা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ওরাল রবার্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডেভিড বুর্কাসের মতে, এ সময় যাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী পদে কর্মরত, তাঁদের সাফল্যের পেছনের বেশ বড় একটি কারণ তাঁদের কর্মক্ষেত্রের বন্ধুরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর সহকারী অধ্যাপক ইফতেখারুল আমিন বলেন, ‘অফিসে পদমর্যাদার একটি বিষয় থাকে। সেই দিকটি খেয়াল রেখে সহকর্মীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলে নিজের কাজের মানই ভালো হয়।’ আপনি কর্মক্ষেত্রে কতটা সফল, তা মাপার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হচ্ছে আপনার কতজন বন্ধু আছে। কর্মক্ষেত্রে গড়ে ৮ থেকে ১০ জন বন্ধু আপনার কাজের আগ্রহ আর কাজের মানকে বদলে দিতে পারে।

 কর্মক্ষেত্রে বন্ধুত্বে যা খেয়াল রাখবেন

* সবার সঙ্গেই যে বন্ধুত্ব করতে হবে-এমন কোনো কথা নেই। কাজের পরিধি ও গুরুত্ব বিবেচনা করে ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৈরি করুন।

* সহকর্মী বন্ধু হলেও কর্মক্ষেত্রের পেশাদারি মনোভাব বজায় রাখুন।

* কেউ বন্ধু হলেই যে বাকিরা শত্রু-এমন পরিস্থিতি তৈরি করলে আপনারই ক্ষতি।

* সহকর্মী-বন্ধুর কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন হলেই বন্ধুত্ব শেষ করে ফেলবেন না। বন্ধুত্বের সম্পর্ক আজীবন বজায় রাখুন।

* কর্মক্ষেত্রে বন্ধুর উপকার করতে গিয়ে অন্য কারও ক্ষতি কখনোই করবেন না।

* বন্ধুত্বের সম্পর্ক গাঢ় করতে অফিস সময়ের পর কোথাও ঘুরতে যেতে পারেন। মাঝেমধ্যে দুপুরে খাওয়ার জন্য কোনো রেস্তোরাঁ কিংবা বিকেলে কফির কোনো দোকানে আড্ডা দিতে পারেন।

* সহকর্মী-বন্ধুর পরিবারের খোঁজখবর নিয়মিত রাখুন। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ বিশেষ দিনগুলোতে উপহার দিন।

* কর্মক্ষেত্রে যেসব মানুষের আচরণ আপনার কাছে নেতিবাচক মনে হয়, তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো ক্ষতিকর কিন্তু।

* বন্ধুত্বকে শুধু আড্ডা কিংবা গল্প করার ছল হিসেবে ব্যবহার করবেন না। কাজের মান বৃদ্ধি ও বিকাশে বন্ধুত্বকে কাজে লাগান।

 সূত্র: হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, ফাস্ট কোম্পানি 

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন