>গেল জুন মাসেই বীর বিক্রম খেতাব পেলেন দুঃসাহসিক যোদ্ধা আব্দুল খালেক। গেজেট-জটিলতায় স্বীকৃতি পেতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হলো স্বাধীনতার পর প্রায় ৫০ বছর। এই বীর যোদ্ধা শোনালেন যুদ্ধদিন আর আক্ষেপের দিনগুলোর কথা।
default-image

মনে হলো গরম কিছু একটা বুকের ভেতর দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে গেল। আমি চার-পাঁচ হাত উঁচুতে লাফিয়ে উঠলাম। কেন উঠলাম, জানি না। সঙ্গে ছিল কুমিল্লার ছেলে জয়নাল। তাকে বললাম, আমার এলএমজিটা নিয়ে চলে যাও। আমি হয়তো আর কয়েক সেকেন্ড বেঁচে থাকব। কিছুক্ষণ পর সংবিৎ ফিরে পেয়ে দেখি এলএমজি (লাইট মেশিনগান) পড়ে আছে। নিয়ে যায়নি জয়নাল। আরেকজন সহযোদ্ধা এসে আমাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তখন খুব কষ্ট হচ্ছিল। বললাম, তোমরা আরেকটি গুলি করে আমাকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দাও। আমার মুখটা এলাকায় খুব পরিচিত। তাই আমার মাথাটা কেটে নিয়ে যাও। রাজাকাররা চিনতে পারলে আমার এলাকার সব মানুষকে হত্যা করবে।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম আব্দুল খালেক। জানালেন, তিনি একজন বীর বিক্রম। বাবা মরহুম কামির উদ্দীন মণ্ডল। বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চাপাল গ্রামে। তাঁর বয়স এখন ৮৩ বছর। গত ৬ জুন নতুন প্রকাশিত খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটে তাঁর নাম উঠেছে। গেজেট-বিভ্রাটের কারণে তাঁকে এই খেতাবের স্বীকৃতির জন্য এত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ৫০ বছর পর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি স্বীকৃতি পেলেন।

বাড়ি তাঁর চাপাল গ্রামে

স্বাধীন দেশে কেমন ছিল এই মুক্তিযোদ্ধার জীবন, কেমন ছিল তাঁর যুদ্ধের দিনগুলো? জানার জন্য ১ জুলাই আব্দুল খালেকের বাড়িতে যাই। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালিয়ে গোদাগাড়ীর পথেই চাপাল গ্রাম। লোকজন চিনিয়ে দিলেন রাস্তার ডান পাশে নেমে ২৫০ মিটার কাঁচা রাস্তা। তারপরই আব্দুল খালেকের বাড়ি। কাদামাখা রাস্তা রোদে পুড়ে এমন কড়া হয়ে আছে যে মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়াই দুষ্কর। মুঠোফোনে রাস্তার কথা শুনেই স্থানীয় দেওপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান বললেন, এখন ওই রাস্তা পাকা হবে। ওই মুক্তিযোদ্ধার নামেই নামকরণ করা হবে।

আব্দুল খালেকের বাড়ির সামনে সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। পরে বোঝা গেল প্রায় ২৮ বছর আগে শুরু করা আধা পাকা বাড়ির নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। কাজ চলছে। সামনের ঘরে শুয়ে ছিলেন আব্দুল খালেক। কথা বলতে বলতে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাই। দেখা গেল বিছানার পাশে একটি আলমারিতে কয়েকটি ক্রেস্ট। সেগুলো স্থানীয়ভাবে পাওয়া। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে আব্দুল খালেক গায়ের ফতুয়া পরছিলেন। ঠিক তখনই চোখে পড়ল পিঠের সেই বিরাট ক্ষতস্থান। যেখান দিয়ে পাকিস্তানি সেনার একটি গুলি বুক ফুঁড়ে বের হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে আপাদমস্তক আরেকবার দেখে নিলাম। যে মানুষ তাঁর বুকে গুলি লাগার পর সৃষ্টিকর্তার কাছে বেঁচে থাকার জন্য আর একটু সময় প্রার্থনা করেছিলেন। আর কিছুক্ষণ বেঁচে থাকলেই তিনি তাঁর এলএমজিটা মাটিতে পুঁতে ফেলবেন, যাতে শত্রুপক্ষ সেটা নিতে না পারে।

বাড়ির বাইরে এসে চেয়ারে বসে কথা বলার সময় তাঁর দুই ছেলে মাসুম আক্তার জামান ও আবুল হাসনাত পাশে এসে বসলেন। মাসুম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক এবং আবুল হাসনাত শিক্ষানবিশ আইনজীবী। আব্দুল খালেক অপ্রিয় অনেক কথাই বলে ফেলতে চাইছেন, কিন্তু দুই ছেলে বাবাকে থামিয়ে দিচ্ছেন। আব্দুল খালেক এ-ও বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক খুব সহযোগিতা করেছেন। গেলেই বলেছেন, “কোথায় কী লিখতে হবে বলেন, লিখে দিচ্ছি।”’

আবুল হাসনাত শোনালেন গেজেট-বিভ্রাটের কথা। আব্দুল খালেক ১৯৬৩ সালের ১ জুন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে মা-বাবার কথায় চাকরি ছেড়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৭ নম্বর সেক্টরে যোগদান করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত গেজেটে এক ধরনের ভুল ছিল, ২০০৪ সালের গেজেটে আরেক ধরনের ভুল। প্রথমবার লেখা হয়েছিল ‘এক্স নেভি’। পরেরবার সেনাসদস্য। আবদুল খালেকের অফিশিনয়াল নম্বরের শেষে ১৯-এর জায়গায় ভুলবশত লেখা হয়েছে ৯১, যা ছিল এক পাঞ্জাবি সেনার। ২০১১ সালে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঠিকানাবিহীন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে আব্দুল খালেকের নাম এবং নৌবাহিনীর পদবি ও সার্ভিস নম্বর দেওয়া ছিল। তার ভিত্তিতে তাঁরা গেজেট সংশোধন করার জন্য আবেদন করেন। সে আবেদন মন্ত্রণালয় থেকে হারিয়ে যায়। গত বছর নতুন করে আবার আবেদন করা হয়।

মাসুম আক্তার জামান বললেন, ‘১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে আমাদের পরিবারের ওপর রাজাকাররা নানা অত্যাচার শুরু করে। বাড়িঘর লুট করে নিয়ে যায়। একের পর এক মিথ্যা মামলা দিতে থাকে। ফেরার হয়ে পালিয়ে বেড়াতে থাকি।’ গ্রামের জমি বিক্রি করে রাজশাহী শহরে একটা জায়গা কিনে কোনোমতে বসবাস করা শুরু করে আব্দুল খালেকের পরিবার। ২০ বছর পর তাঁদের মূল বাড়ির পাশের গ্রামে এসে বর্তমান বাড়িটি করেন আব্দুল খালেক।

যুদ্ধদিনের কথা

আব্দুল খালেক মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা অভিযানের কথা শোনাতে থাকেন। অভিযানের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের নাম এমন করে বলছেন যেন গতকালের ঘটনা। সবশেষ অভিযান ছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ীর খেতুর গ্রামে। নিজেই গুলির নিচ দিয়ে ক্রলিং করে শত্রুর আস্তানায় গ্রেনেড চার্জ করতে যাচ্ছিলেন। ‘আহত হওয়ার পর বহরমপুর হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। সেখানে স্মৃতি হারিয়ে ফেলি। যখন আবার স্মৃতি ফিরে পেলাম, তখন আমি ব্যারাকপুর হাসপাতালে। এরপর আরও দুটি হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম।’ বললেন আব্দুল খালেক।

কথা শেষ করে উঠে আসার সময় ঠিক ফৌজি কায়দায় সালাম দিলেন আব্দুল খালেক। তবে এই সালাম প্রাপ৵ তো আসলে তাঁরই—স্যালুট, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক বীর বিক্রম।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন