default-image

জে আর সি স্যার আর নেই। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। স্যারের সঙ্গে আর দেখা হবে না, টেলিফোনে কথা হবে না, ই-মেইলে যোগাযোগ হবে না, দরাজ গলায় কেউ বলবে না ‘আলমগীর, কেমন আছো?’ যখন কুয়েটের উপাচার্য ছিলাম, তখন বলতেন, ‘কেমন চলছে তোমার ইউনিভার্সিটি?’ ‘শুনলাম ভালোই নাকি চালাচ্ছ।’ যখনই দেখা হতো, যে পরিবেশেই দেখা হতো, সব সময় আন্তরিকতা দিয়ে গ্রহণ করতেন। কখনো ব্যস্ততা দেখাতেন না। তাঁর মতো নিরহংকার এবং সবাইকে আপন করে নেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাঁর কাছ থেকে সব সময়ে শিক্ষকের স্নেহের পরশ পাওয়া যেত। তাই সান্নিধ্যে যাওয়া মাত্রই ফিরে যেতাম ৩৯ বছর আগের সেই ছাত্রজীবনে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, যা বুয়েট নামেই বেশি পরিচিত, ভর্তি হই সেই ১৯৮১ সালের শুরুর দিকে। মে মাসে ক্লাস শুরু হয়। ভর্তি হয়েছিলাম সবচেয়ে বড় বিভাগ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। সবচেয়ে বড় বিল্ডিংয়ে ক্লাস। থাকতে শুরু করলাম ক্যাম্পাসের সবচেয়ে কাছের তিতুমীর হলে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতেই বিভাগে এবং হলে যে স্যারের নামটি প্রথমে শুনলাম তা হলো ‘জে আর সি স্যার’। অর্থাৎ জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার। নিজের গুণেই স্বমহিমায় তিনি কী পরিমাণ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্থান করে নিয়েছিলেন তা সরাসরি বুঝতে না পারলেও সিনিয়র ভাইদের গল্পের মাধ্যমে টের পেতাম। তখন বুয়েটে একটি খুবই পপুলার প্রশ্ন ছিল ‘জে আর সি মানে কী?’ যাকে জিজ্ঞেস করা হতো, সে বলত জামিলুর রেজা চৌধুরী, যাহোক বইয়ের উত্তর ছিল ‘জয়েন্ট রিভার কমিশন’, যৌথ নদী কমিশন। এটি সেই সময়ে খুবই আলোচিত কমিশন ছিল। কারণ, ভারতের সঙ্গে নদ-নদীর পানিপ্রবাহের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য এই কমিশন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ভারতের সঙ্গে কাজ করত। এই একটা বিষয় থেকে স্যারের জনপ্রিয়তা ও সবার মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা সহজেই বোঝা যায়। স্যারের জনপ্রিয়তা ছিল সব বিভাগেই।

বিভাগের করিডরে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সেমিনারে, হলে, খেলার মাঠে স্যারের দেখা মিললেও সরাসরি ক্লাস পাওয়ার জন্য তিন তিনটি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, যা এরশাদ আমলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনির্ধারিত বন্ধের কারণে আরও দীর্ঘায়িত হয়। অবশেষে ১৯৮৫ সালের প্রথম দিকে শেষ বর্ষে এসে স্যারকে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পেয়ে যাই। সবচেয়ে কঠিন বিষয় স্যার পড়াবেন। বিষয়টির নাম ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। চরম উৎসাহ, উত্তেজনা ও আবেগ নিয়ে প্রথম ক্লাসে যাই। স্যারের প্রথম ক্লাসেই বুঝতে পারলাম তিনি কেন অন্য শিক্ষকদের চেয়ে আলাদা। তখন সব চলত ব্ল্যাকবোর্ড, চক-ডাস্টারের মাধ্যমে। স্যারদের অনেক কষ্ট করতে হতো। অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল তাঁর ব্ল্যাকবোর্ডের লেখাগুলো। অনেক কষ্ট করে প্রয়োজনীয় চিত্রও আঁকতেন। অনেক গুছানো ও নিয়মতান্ত্রিক ছিল তাঁর পাঠদান। একেবারেই ঘড়ির কাঁটা ধরে শুরু করতেন, কেমন করে জানি নির্ধারিত বিষয়টি যখন শেষ করতেন তখন দেখতাম ক্লাসের সময়ও শেষ। কোনো তাড়াহুড়া না করেই স্বাভাবিক গতিতে ক্লাসটি সময়মতো শেষ করতেন, যা ছিল তাঁর ক্লাসের ছাত্রদের জন্য সারা জীবনের শিক্ষা।

ক্লাসে জামিলুর রেজা চৌধুরী সদা হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন, বিষয়ের বাইরে সাধারণত কোনো কথা বলতেন না। তাঁর বাচনভঙ্গি, অভিব্যক্তি, ছাত্রদের সঙ্গে ভাবের আদান–প্রদান ছিল খুবই প্রাণবন্ত। একজন ছাত্রের মনের ক্ষুধা মিটে যেত তাঁর ক্লাসে। দক্ষতা এবং নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণের কারণে অত্যন্ত কঠিন বিষয়টিও তিনি সহজ করে তুলে ধরতে পারতেন, তাঁর এই অনন্য গুণটি যুগ যুগ ধরে তাঁর ছাত্রদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে আমার বিশ্বাস। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে তাঁর পদ্ধতি ছিল খুবই শিক্ষার্থীবান্ধব। তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে নম্বর দিতেন। চূড়ান্তভাবে মিলে হতো শতভাগ। সেই হারে প্রশ্নের উত্তরের বিভিন্ন ধাপের জন্য নম্বর নির্ধারিত ছিল। তাই কঠিন হওয়া সত্ত্বেও স্যারের বিষয়ে আমরা সবাই ভালো করতাম।

বুয়েটে পরে মাস্টার্স করার সুবাদে স্যারকে অনেক কাছ থেকে দেখেছি। যেকোনো সময়েই দরজা খোলা থাকলে একটু ঢুঁ মেরে অনুমতি নিয়েই সিভিল বিল্ডিংয়ের চারতলায় স্যার কক্ষে প্রবেশ করা যেত। স্যার সময় দিতেন, যেকোনো বিষয় নিয়ে আলাপ করা যেত, গুরুত্ব দিতেন, আলাপগুলো হতো খুবই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ, যা যেকোনো সমস্যা সমাধানের সঠিক পথটির সন্ধান দিত। তাঁর পরিমিতিবোধ, সুস্পষ্ট উচ্চারণ, মৃদুলয়ে কথা এবং আলোচনা পর্বের আন্তরিকতা এবং অন্যের মতো শোনার ধৈর্য, বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞানের গভীরতা—সবকিছুই এক কথায় অনন্য এবং অনুকরণীয়। জেআরসি স্যার কাজ করতেন সিস্টেম মেনে, তাই হয়তো তিনি সময়ে পদ্ধতির মধ্যেই থাকতে ভালোবাসতেন এবং থাকতেনও। তিনি বিপ্লবী ছিলেন না। তাই কখনো তাঁকে প্রথা ভাঙতে দেখা যায়নি। তিনি সাধারণত ঝামেলা এড়িয়ে চলতেন।

বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পরই শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের কারণে স্যারের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে পেশাগত বিষয়ে আলোচনা হতো। প্রকৌশল শিক্ষার উত্তরণের জন্য উনি অনেক চিন্তা করতেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে, এই বিষয়গুলোর বাস্তবায়নের অত্যন্ত ধীরগতি তাঁকে সব সময় ব্যথিত করত। যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়, যেকোনো প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান, যেকোনো বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডে ডাকলেই স্যারকে পাওয়া যেত। তিনি প্রকৌশলীদের পেশাগত প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। এই বিষয়ে তাঁর মধ্যে কখনো কোনো ধরনের অনীহা কাজ করেনি। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং তাঁর মূল বিষয় হওয়া সত্ত্বেও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারে স্যার অনেক অবদান রেখেছেন। তিনি বিজ্ঞান শিক্ষায় এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন।

যেকোনো দায়িত্বশীল পদে তিনি সার্থকভাবে পালন করতে পারেন, তা আমরা লক্ষ করেছি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে। এ সময় তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় পড়াশোনা ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে দিয়ে আসেন, তারই ফলে উচ্চশিক্ষায় এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির সমন্বয় ও প্রসার ঘটেছে। তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞান মানসিকতা প্রসারের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি সব সময় সম্পৃক্ত ছিলেন। যেখানে বিজ্ঞান, যেখানে প্রকৌশল, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, যেখানে কোনো প্রকৌশলগত বিধিমালা প্রণয়ন, প্রকৌশল বিষয়ে দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করা প্রয়োজন, সেখানেই জামিলুর রেজা চৌধুরী। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তৈরি হয়নি, যেখানে কোনো না কোনোভাবে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই। তিনি ছিলেন সত্যিই বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে এসব কাজে তাঁর সম্পৃক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে আমরা তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রে আরও অধিকতর অবদান রাখা, উজ্জ্বলতর হওয়ার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পথপ্রদর্শক হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। প্রতিষ্ঠানের কাজের চাপে, একটি পর্যায়ে এসে নিবিড় গবেষণায় সম্পৃক্ত থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রকৌশল শিক্ষায় গবেষণা ধারা তৈরির বিষয়টি। এ বিষয়ে তাঁকে আক্ষেপ করতে দেখেছি এবং এ নিয়ে সব সময়ে একটা অতৃপ্তি কাজ করেছে তাঁর মধ্যে।

তরুণ শিক্ষক থেকে শুরু করে পরিণত বয়স পর্যন্ত জে আর সি স্যার নির্মোহভাবে অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন এ জাতির কল্যাণে। সব কাজে সবাই তাঁর শরণাপন্ন হতেন এবং সহজে মেনে নিতেন তাঁর পরামর্শ, উপদেশ এবং দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশও তাঁকে মর্যাদা দিয়েছে। সব সময় তাঁর ওপর অগাধ আস্থা রেখেছে, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। তিনি যেন এ জাতিকে আরও আলোর সন্ধান দিতে পারেন, সে জন্য গত বছর তাঁকে দেওয়া হয়েছে শিক্ষকের সর্বোচ্চ স্থান ‘জাতীয় অধ্যাপক’–এর মর্যাদা। তাঁর কাছ থেকে আরও অনেক কিছু আমরা পেতে পারতাম। করোনা–উত্তর বাংলাদেশের ক্রান্তিকালে তাঁর খুবই প্রয়োজন ছিল।

সমগ্র বিশ্বের এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ হারিয়েছে একজন প্রতিভাবান শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ। জে আর সি স্যারের অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়, তবে তাঁর বিলিয়ে যাওয়া আলোকবর্তিকা নিঃশব্দে সামনের দিনগুলোয় আমাদের পথ দেখাবে।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন