অ্যাকুমেন ফেলোশিপ থেকে যা শিখলাম

বিজ্ঞাপন
default-image

‘অ্যাকুমেন ফেলোশিপ থেকে আমি কী প্রত্যাশা করেছিলাম?’ এর উত্তর এখন আমি সহজে দিতে পারি। শুরুতে পারতাম না। আমরা যাঁরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফেলোশিপে অংশ নিয়েছি, আবেদন করেছি, তাঁদের কাছে এই উত্তর বেশ জানা, সহজ। কিন্তু সহজ উত্তর দেওয়ার পরও মনকে বারবার প্রশ্ন করা, আসলে আমি কেন আবেদন করেছিলাম? সেই উত্তর ‘কমফরটেবল’ না–ও হতে পারে। কিন্তু গভীরে গিয়ে দেখা কেন কাজটি করেছি, আমার মনে হয় অ্যাকুমেন ফেলোশিপ আমাকে এটি খুব ভালোভাবে শিখিয়েছে। কীভাবে মনকে বারবার প্রশ্ন করতে হয়, অস্বস্তিদায়ক উত্তর কীভাবে গ্রহণ করতে হয়।

এর শুরুতে সুন্দর একটা গল্প আছে। জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের স্বপ্ন, বন্ধুত্ব। গত বছরের মাঝামাঝি, এ সময়টাতেই ফেসবুকে দেখছিলাম একটি ফেলোশিপের কথা। অন্য অনেক কিছুর মতো একবার চোখ বুলিয়ে স্ক্রল করে অন্য কিছুতে মন দিয়েছিলাম। এর মধ্যে ফেসবুকে কয়েকটি পেজে এই ফেলোশিপের কথা জানতে পারি। এবার বেশ ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করলাম। আমার দুই বন্ধু ও সহকর্মী শিখতী ও ইপসিতাকে বললাম, অ্যাকুমেন নামের একটি ফেলোশিপ দেখলাম, আবেদন করব কি না। প্রথমবারের মতো এই গ্লোবাল ফেলোশিপ বাংলাদেশ থেকে ফেলো নেবে। অনেক উৎসাহ দিল ওরা। শিখতী শুধু বলল, হার্ভার্ডে পড়ার সময় ওর অনেক বন্ধুর কাছে অ্যাকুমেন ফেলোশিপের কথা শুনেছে। যারা দারিদ্র্য নিয়ে, সামাজিক সমস্যার সমাধানে কাজ করে, তারা এই ফেলোদের খুব গুরুত্ব দেয়।

তখনো তো ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝিনি, কিন্তু আগ্রহ বেড়ে গেল। কারণ, আমি তো মানসিক স্বাস্থ্যের সমাধানে কাজ করতে চাই। এখানেও তো মানুষ সামাজিকভাবে অবিচারের শিকার হয়। ফলে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে আবেদন করে ফেললাম। তিনটি ধাপ পার হয়ে শেষ পর্যন্ত নভেম্বরে হলো চূড়ান্ত বিচারের সম্মেলন। এতটাই রোমাঞ্চিত ছিলাম, সেই সকালের ঠান্ডাও মনে হয় লাগছিল না আমার। ৪০ জনকে যেতে বলা হয়েছিল, সেখান থেকে ২০ জনকে ফেলো হিসেবে নেওয়া হবে।

চূড়ান্ত ধাপে গিয়ে প্রথম যেটা মনে হলো, এটা কোনো প্রতিযোগিতা না। একসঙ্গে এতজন গুণী, প্রতিভাবান মানুষের দেখা আমি কোথায় পাব। অনেকের সঙ্গে সেদিন প্রথম পরিচয় হলো, সারা দিন ধরে সাক্ষাৎকার, খাওয়াদাওয়া, ইনডোর গেমস, আড্ডা সবই চলল। সপ্তাহ দুয়েক পরে ফল জানলাম। ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। এক বছরের ফেলোশিপে কী কী হবে, সব পড়েশুনে আনুষ্ঠানিকভাবেই এর অংশ হলাম।

এই ফেলোশিপে সেমিনার চারটি। আমাদের প্রথম সেমিনার ছিল মার্চে। সেমিনার শুরুর আগে দুটি বই পড়ে অ্যাসাইনমেন্ট পার্টনারের সঙ্গে আলোচনা করে লিখতে হবে। ওই সময় আমি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আইভিএলপি ফেলোশিপে সেখানে। আমার অ্যাসাইনমেন্ট পার্টনার ক্যারিয়ারকির বিশ্বমিত্র চৌধুরী, যাঁকে আমরা তুয়ান ডাকি। তাঁর সঙ্গে ঢাকা-টেক্সাস সময় ঠিক করে আমরা ‘হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড’ ও ‘দ্য ওয়ানস হু ওয়াক অ্যাওয়ে ফ্রম ওমেলাস’ পড়ে কথা বলে আমি আমার রিভিউ ওকে পাঠালাম। ও ঠিকঠাক করে গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্টে পোস্ট করল। ওর যেহেতু সময় মেলাতে হচ্ছিল আমার সঙ্গে, তাই জরিমানা হিসেবে চকলেট আনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমি।

ঢাকা ফিরে পরদিন সকালে ৭ মার্চ অ্যাকুমেন বাংলাদেশের প্রথম ফেলো কোহর্টের অংশ হিসেবে সিলেট রওনা দিলাম আমরা। বাসে মনে হলো এ যেন পিকনিকের বাস। যাঁর যাঁর সংগ্রহে যত ধরনের ভালো-আজব গান আছে, সবাই তাই বাজাতে লাগল। সিলেটে নাজিমগড় রিসোর্টে পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিলাম। প্রত্যেকের রুমমেট লটারিতে আগেই বাছাই করা ছিল। আমার রুমমেট হলো হারস্টোরির জেরিন আপা। সেদিন বিকেলেই আমরা যখন গাছপালার ছায়াঘেরা মিটিং রুমটাতে এক হলাম, শুরুতে কিছু নিয়মকানুন বলা হলো। কীভাবে জীবনের ঘটনাবহুল মুহূর্তকে আঁকতে হবে, টার্নিং পয়েন্ট…যাকে লাইফ ম্যাপ বলে। আমরা প্রত্যেকে সেটি করলাম।

প্রত্যেকের জীবনের ঘটনাগুলো মনে আলোড়ন তৈরি করল, কখনো চোখে পানি চলে এসেছে, কখনো হেসে উঠেছি। সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো, এই ফেলো বন্ধুরা অন্যদের থেকে আলাদা। কাউকে তার ভাষার দক্ষতা, পারিবারিক কাঠামো, পোশাক, কত বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসেছে—সেসব দিয়ে বিচার করে না, শুধু ব্যক্তিকে, তার কাজকেই তারা সাধুবাদ জানায়, উৎসাহ দেয়। কীভাবে অন্যজনকে একটু মানসিকভাবে হলেও সাহায্য করতে পারে, সেটির জন্য অন্যরা অস্থির হয়ে যায়। অ্যাকুমেন ফেলোশিপ না হলে জীবনের এই উদার মনের মানুষগুলোর তো দেখা পেতাম না। নেতৃত্বের বিভিন্ন কোর্সগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শেখানো হয় এখানে। শুধু একপাক্ষিকভাবে না, প্রতিটি জায়গায় আমি থাকলে কী করব। নিজের কাজের জন্য, সামাজিক বৈষম্য রোধ করার জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারব? এই প্রশ্ন সত্যি কঠিন। মানুষের একটি পুরো জীবনই হয়তো কেটে যায়, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য। অ্যাকুমেন ফেলোশিপ আমাদের বারবার সেই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। কখনো আমরা নীরব থেকে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছি, কখনো নিজেরা নিজেরা আলোচনা করেছি। কিন্তু আবার সবাই মিলে সেটি সবার সামনে তুলে ধরেছি। আমি যদি নিজের কথাই বলি, আমি এখন খুব পরিষ্কার নিজের কাছে। আমি জীবনে কী করতে চাই, কীভাবে করতে চাই, এর জন্য সর্বোচ্চ কী ত্যাগ স্বীকার আমি করতে রাজি।

দ্বিতীয় সেমিনারে আমার অ্যাসাইনমেন্ট পার্টনার বাংলাদেশ অ্যাঞ্জেলস নেটওয়ার্কের নির্ঝর রহমান। আমরা যখন ইমিউন সিস্টেম কোর্সে লিখেছি, নিজেরা অনেকবার আলোচনা করেছি। জীবনের কতশত কঠিন, অস্বস্তিকর সত্য অকপটে সহজে শেয়ার করেছি আমরা। কারণ, অ্যাকুমেনের এই ফেলো বন্ধুরা হলো নিরাপদ জায়গা। যেখানে সব কথা কোনোরকম দ্বিধা ছাড়া বলা যায়।
‘যদি হয় সুজন, তেঁতুলপাতায় নজন’—কথাটা মনে হয় আমাদের জন্য ভালোই প্রযোজ্য। আমাদের অভিধানে অসম্ভব বলে বোধ হয় কিছু নেই। সেটি লোকালয় থেকে দূরের রিসোর্টে হুট করে গিটার জোগাড় করাই হোক, নানা পদের লোভনীয় খাবার রান্নাই হোক আর নিজ নিজ কাজের ক্ষেত্রেই হোক।

অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের আরিফা আপা, আলোকিত হৃদয়ের আজওয়া, আমাল ফাউন্ডেশনের ইসরাত, ভূমিজের ফারহানা আপা, শিক্ষক রাকিব ভাই, বাদাবন সংঘের লিপি আপা, ইনোভেশন কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেডের রুবাইয়াথ ভাই, সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি বাংলাদেশের মিনা ভাই, ডিআইজেএলএর রেজা ভাই, বাংলাদেশ সিমপ্রিন্টস টেকনোলজি লিমিটেডের নাইল ভাই, এসপিএআরসির মুক্তশ্রী, অরণ্য ক্রাফটস লিমিটেডের নওশিন আপা, জীয়নের রুবায়াত ভাই, ইউএনডিপির সোহরা, ওয়াইপিএসএর ভাস্কর দাদা ও তানভীর ভাই এমনকি অ্যাকুমেন একাডেমির আইলিন, শাকিল ভাই কিংবা শাভিনা—এঁরাই তো এখন নতুন বৃহত্তর পরিবার, বন্ধু।

আমাদের সাত দিনের তৃতীয় সেমিনার জুন মাসে। প্লেটো, রুশো, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন, তাঁদের দর্শন, কীভাবে তাঁরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন সমাজের পরিবর্তনে, অর্থনৈতিক পরিবর্তনে তাঁদের ভাবনা–ভূমিকা, নাইজেরিয়ার রাজনীতি, সমাজকাঠামো কিংবা অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন বনাম স্বাধীনতার কথা—কী ছিল না সেই গুড সোসাইটি রিডিংয়ে। অ্যাকুমেন একাডেমির প্রধান নির্বাহী জ্যাকুলিন নভোগ্রাটজ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাত দিন আমাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে ১১টি বইয়ের পুরোটা বা অংশবিশেষ নিয়ে আলোচনা করেছেন। যখন পড়েছিলাম, কেন পড়ছি এগুলো, গ্রুপ স্টাডিতেও বুঝতে পারছিলাম না অনেক সময়। সাত দিনের সেমিনার শেষে বুঝতে পেরেছি কেন তাঁদের বিশ্বসেরা বইগুলো, লেখাগুলো বারবার পড়া উচিত। উপলব্ধি করা উচিত।

কোনো কোনো সমস্যা যুগে যুগে থেকে গেছে। সেগুলোর সমাধান কীভাবে করব, কীভাবে নিজেকে সেই বৃহত্তর কাজের জন্য তৈরি করব, সেসবই শিখেছি। অ্যাকুমেন ফেলোশিপ জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে, জীবনদর্শন নতুন আঙ্গিকে দেখতে পারছি, আঁকতে পারছি। অ্যাকুমেন ফেলোশিপ একই সঙ্গে নিখাদ বন্ধু দিয়েছে, যাঁরা পরস্পর অবলীলায় যেকোনো কিছু আবদার-দাবি করতে পারে। একে অন্যের হাত ধরে যেন এগিয়ে যেতে পারি, সেই দৃঢ়তা দিয়েছে। আবার ব্যক্তি আমাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, নিজের সক্ষমতা-দুর্বলতা দুটোই বোঝাতে সাহায্য করছে। আর দুর্বলতাগুলো কীভাবে কাটিয়ে উঠতে পারি ফেলো বন্ধুরা, অ্যাকুমেনের আন্তর্জাতিক মানের কোর্স আর সেই কোর্স পরিচালনাকারীরা সেটি শিখতে সাহায্য করছেন। শুধু দেশের ফেলোরা নন, সারা বিশ্বে যেখানে যেখানে অ্যাকুমেন ফেলোরা আছেন, তাঁরাও নতুন নতুন বিষয় শিখতে, জানতে সাহায্য করছেন।

অ্যাকুমেন ফেলোশিপ শুরুর সময়ে আমি আর এখনকার আমি—দুইয়ের মধ্যে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক, মনোজাগতিক পার্থক্য আমি টের পাই। অ্যাকুমেন ফেলোশিপ সত্যিকারের অর্থে জীবনকে বদলে দিয়েছে। নিজের সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে আমার, এর মাধ্যমে। আর যে দ্বিধাগুলো বহু বছর আমার মনে ছিল, সেগুলোও কেটে গেছে। অনেকটা মেঘ কেটে যাওয়ার পর ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশের মতো।

আমি জানি, বাকিদেরও তা–ই হয়েছে। আরেকটা বড় শিক্ষা আমি নিয়েছি, অভিযোগ না করার। আমি উপলব্ধি করেছি, আমার জীবনে এমন অনেক কিছু আছে, যা অনেকের নেই। তারাও হেসেখেলে বাঁচে, অন্যের জন্য কাজ করে। এক জীবনে এত ভালো বন্ধু থাকলেই তো আর কিছু চাওয়াই উচিত না।

* লেখক: অ্যাকুমেন ফেলো, প্রথম কোহর্ট, ২০২০। প্রধান নির্বাহী, মনের বন্ধু

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন