সারা দিনের ক্লান্তি শেষে শাওয়ার নিতে গিয়ে হঠাৎ করেই টের পেলেন শারমিন। হাতে ছোট একটা চাকার মতো কিছু অনুভব করলেন। বাঁ স্তনের ওপরের দিকে। একটা মার্বেলের মতো আকার। ভালো করে ডান হাতের তিন আঙুল দিয়ে বাঁ স্তনের পুরোটা পরখ করলেন। সঙ্গে বগল। এবার বাঁ হাতের মাঝের তিন আঙুলে ভালো করে দেখলেন ডান স্তন আর বগল। না, আর কোথাও কিছু টের পেলেন না। নিজের ওপর রাগ হলো তাঁর। কিছুদিন আগেই প্রথম আলোয় একটা লেখায় পড়েছিলেন স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং সম্পর্কে। প্রতি মাসে একবার নিজের স্তন নিজে পরীক্ষার নিয়ম দেওয়া ছিল। শিক্ষিত, কর্মজীবী নারী হয়ে অবহেলা করা একেবারেই ঠিক হয়নি। আর গাফিলতি নয়। কালই যেতে হবে চিকিৎসকের কাছে।

কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী বীথির মন বসছে না কিছুতেই। সংকোচ হচ্ছে। বাসায় কাউকে বলতে পারছেন না। একজনকে বলা যেত। কিন্তু তিনি তো তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে না-ফেরার দেশে। বীথি তখন অনেক ছোট। মায়ের স্তন ক্যানসার হয়েছিল। অ্যাডভান্সড স্টেজে ধরা পড়ায় বাবার এত চেষ্টাও কাজে লাগেনি। বীথি শুনেছেন, পরিবারের কারও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে। বীথি খেয়াল করেছেন, মাসিকের কয়েক দিন আগে থেকে ব্যথা হচ্ছে দুই স্তনেই। হাত দিয়ে দেখেছেন। চাকার মতো অনুভব করেছেন। কয়েক দিন পর ব্যথা চলে গেল। পরের মাসে আবার একই অবস্থা। বাবাকে বলতে পারছেন না। ভয় আর সংকোচ কুরে কুরে খাচ্ছে।

শারমিন আর বীথির গল্পই শেষ নয়। স্তন ক্যানসার নিয়ে আরও নানা গল্প আছে। আরও হতাশার চিত্র আছে। এই দেশে এখনো এমন রোগী পাওয়া যায়, স্তনের দগদগে ঘা আর দুর্গন্ধ কাপড়ে চেপে ঢেকে রাখার চেষ্টাও কাজে লাগছে না। বাধ্য হয়ে হাসপাতালে আসা। যখন চিকিৎসকরাও অনেকটা অসহায়। আশার চিত্রও আছে। স্তনে অস্বাভাবিক কিছু টের পেলেই অনেক নারী চলে আসছেন ‘স্ক্রিনিং সেন্টারে’ বা লক্ষণপূর্ব শনাক্তকরণ কেন্দ্রে। তবে এটা শহরের শিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে বেশি। গ্রামের অশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে যেতে হবে আরও বহুদূর।

সব টিউমার ক্যানসার নয়
স্তনে চাকা হলে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু সব চাকাই ক্যানসার নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ শেষ পর্যন্ত ক্যানসার হিসেবে চিহ্নিত হয়। বেশির ভাগ হয় বিনাইন বা সাধারণ টিউমার কিংবা বা সাধারণ কোনো রোগ। সহজেই এগুলোর চিকিৎসা সম্ভব। তাই স্তনে চাকা বা পিণ্ড হলেই আতঙ্কিত নয়, হতে হবে সচেতন।

স্তন ক্যানসার আসলে কী?
শরীরের অন্য স্থানের মতোই স্তনে অস্বাভাবিক কোষ বাড়ার কারণে কোনো চাকা হলে তাকে টিউমার বলে। শরীরের কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অনিয়ন্ত্রিত কোষবিভাজন থেকে এর সৃষ্টি। দুই ধরনের হতে পারে এই টিউমার। বিনাইন টিউমার অক্ষতিকারক। যেখানে উৎপত্তি, সেখানেই থাকে, যত বড়ই হোক। দূরের বা কাছের অন্য কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়ায় না। আর ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ক্ষতিকারক। উৎপত্তিস্থলের সীমানা ছাড়িয়ে বাসা বাঁধতে পারে অন্য যেকোনো স্থানে, কাছে কিংবা দূরের অঙ্গে কিংবা গ্ল্যান্ড বা লসিকাগ্রন্থিতে। এই ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই ক্যানসার। স্তনের ক্যানসার সবার আগে ছড়াতে পারে পাশের বগলের গ্রন্থিতে। তাই স্তনের সঙ্গে সঙ্গে বগলে নজর দেওয়া জরুরি।

দেরিতে বিপত্তি
আমাদের দেশে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। এর বিভিন্ন ঝুঁকি বা রিস্ক ফ্যাক্টর সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে। আরেকটা জরুরি বিষয় হলো প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা। এতে অনেক লাভ। চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

নাগালের বাইরে যে ঝুঁকি
কিছু ঝুঁকি আমাদের নাগালের বাইরে। নারী হয়ে জন্ম নেওয়াতেই ঝুঁকি শতগুণ বেশি পুরুষদের চেয়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বে বয়স পঞ্চাশের পরে বেশি হলেও আমাদের দেশে চল্লিশের পরেই আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। পরিবারের কোনো নিকটাত্মীয়, বিশেষ করে মায়ের দিকে ভুগে থাকলে ঝুঁকি একটু বেশি থাকে। খুব অল্প বয়সে পিরিয়ড বা মাসিক হওয়া ও বেশি দেরিতে বন্ধ হলেও বাড়তি ঝুঁকি থাকে শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভূমিকা বিআরসিএ ১ ও ২ নামের জিনের অস্বাভাবিক বিবর্তনের।

অভ্যাসে যে ঝুঁকি কমে
এবার সেসব ঝুঁকির কথা, যাদের আমরা সামলাতে পারি জীবনাচরণে কিছু পরিবর্তন এনে। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো খুব দরকারি দুজনের জন্য। সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় উপাদান কলোস্ট্রাম থাকে মায়ের বুকের দুধে, বিশেষ করে প্রথম দিকের ‘শালদুধে’। আর ব্রেস্ট ফিডিং কমায় মায়ের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি। তিরিশের মধ্যে বিয়ে ও প্রথম সন্তান না নিলে ঝুঁকি বাড়ে। শাকসবজি ও ফলমূল কম খাওয়া আর মাংস ও চর্বির প্রতি ঝোঁক স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নিঃসন্তান নারী ঝুঁকি থাকে, রেডিয়েশন বা বিকিরণ পারে ঝুঁকি বাড়াতে।

চাই তীক্ষ্ণ নজর
স্তনে কিংবা বগলে চাকা বা পিণ্ড, নিপল বা বোঁটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া, এ থেকে রক্ত বা কষজাতীয় কিছু বেরোনো, চামড়ার বা চেহারায় পরিবর্তন এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ক্যানসার ছাড়াও হতে পারে এসব। কিছু ক্যানসারের আশঙ্কাও তো থাকে।

আগেভাগেই ব্যবস্থা
লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা নয়। এর আগেও ক্যানসার ধরা পড়তে পারে স্ক্রিনিংয়ের আশ্রয় নিলে। প্রতি মাসে একবার নিয়ম করে নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করুন। সন্দেহ হলে চিকিৎসককে দেখান। তাঁর পরামর্শে প্রয়োজনে মেমোগ্রাম নামের বিশেষ ধরনের এক্স-রে কিংবা আল্ট্রাসনোগ্রাম করুন।

শারমিন ও বীথির কথা
শারমিন বাঁ স্তনে একটি চাকা বা পিণ্ড অনুভব করছেন। চিকিৎসক দক্ষ হাতে পরীক্ষা করে এটাকে টিউমার হিসেবে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করতে পারেন। আবার হয়তো টিউমার নাও হতে পারে এটি। সিস্ট বা ফাঁপা থলির মতো কিছু একটা হতে পারে।

বীথির বয়স, ব্যথা বা চাকা অনুভূত হওয়ার সময় ও ধরন থেকে এটা সিস্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ক্যানসার হবেই, এমন নয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ দুজনের বেলাতেই দরকারি। সূচনায় ক্যানসার ধরা পড়া কিংবা ক্যানসার-আতঙ্ক থেকে স্বস্তি দিতে পারেন একজন দক্ষ ও সংবেদনশীল চিকিৎসক।

ডা. মো হাবিবুল্লাহ তালুকদার: ক্যানসার প্রতিরোধকর্মী, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ক্যানসার ইপিডেমিওলোজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন