default-image

আইন অনুযায়ী এখন আর কেউ নিবন্ধন ছাড়া বিদেশে যেতে পারবেন না। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। বিএমইটির আওতায় সারা দেশের ৪২টি জেলায় কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয় রয়েছে। যাঁর যে জেলায় বাড়ি, তিনি সেই জেলার কার্যালয়ে গিয়ে এই নিবন্ধন করতে পারবেন।
দীর্ঘ সাত বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে সৌদি আরব। ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মী যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশে। তবে প্রাথমিকভাবে গৃহ খাতে কর্মী যাবেনা। এরপর ধীরে ধীরে নির্মাণ, সেবাসহ অন্যান্য খাতেও কর্মী যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদি আরবের বাজার আবার চালু হওয়ায় বিপুলসংখ্যক কর্মী যাওয়ার সুযোগ পাবেন দেশটিতে। আশা করছি, সৌদি আরব আবার কর্মী নেওয়া শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও আবার বিপুল কর্মী নেবে।’
কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী যাবে? এর আগে মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে (জিটুজি) কর্মী গিয়েছিল। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনার কারণে সেখানে খুব বেশি কর্মী যেতে পারেননি। আর এবার সৌদি আরবে সরকারিভাবে নয়, বেসরকারিভাবেই কর্মী যাবেন। কিন্তু পুরো ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার।
সৌদি আরবে কর্মী যাওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত রোববার তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসে। সোমবার খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মঙ্গলবার কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী যাবেন, সে বিষয়ে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া সৌদি আরবের ন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট কমিটির (সানারকম) সঙ্গে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রারও একটি স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

প্রাথমিকভাবে গৃহ খাতে কর্মী নেবে সৌদি আরব
সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে গৃহ খাতের কর্মী (ডমেস্টিক সার্ভিস ওয়ার্কাসে) নেবে সৌদি আরব। গৃহ খাতের কর্মীদের মধ্যে কোন কোন খাত আছে, জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার বলেন, গৃহ খাতের মধ্যে মোট ১২টি পেশা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো নারী গৃহকর্মী। এ ছাড়া এ খাতের মাধ্যমে কুক, নিরাপত্তাকর্মী, মালি, কেয়ারগিভার, ড্রাইভারসহ সেসব কর্মীই যেতে পারবেন, যাঁরা মূলত কোনো এক বাড়ির মালিকের অধীনে চাকরি করতে পারবেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে গৃহ খাতে মাসে ১০ হাজার করে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার কর্মী নেবে সৌদি আরব। সব কর্মীই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাবেন। তবে সরকার পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। মন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরবে কর্মী প্রয়োজন হলে তার চাহিদাপত্র দেবে দূতাবাসে। দূতাবাস থেকে সেই চাহিদাপত্র আমাদের কাছে আসবে। সৌদি আরবে ৫০০ লোক চাইলে আমরা আমাদের ডেটাবেস থেকে ১ হাজার ৫০০ লোক দেব। প্রতি তিনজন কর্মী থেকে তারা একজনকে বাছাইয়ের সুযোগ পাবে। নিবন্ধনের বাইরে থেকে কোনো কর্মী যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।’

default-image

নিবন্ধন কী, কীভাবে করবেন?
বিদেশে যাওয়ার জন্য দালালপ্রথা বন্ধ করতেই সরকার নিবন্ধন-প্রক্রিয়া চালু করে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন অনুযায়ী এখন আর কেউ নিবন্ধন ছাড়া বিদেশে যেতে পারবেন না। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। বিএমইটির আওতায় সারা দেশের ৪২টি জেলায় কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয় রয়েছে। যাঁর যে জেলায় বাড়ি, তিনি সেই জেলার কার্যালয়ে গিয়ে এই নিবন্ধন করতে পারবেন। যাঁদের জেলায় কার্যালয় নেই, তাঁরা পাশের জেলায় গিয়ে নিবন্ধন করতে পারবেন। জেলা কার্যালয়গুলো কোথায় অবস্থিত, তা বিএমইটির www.bmet.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে জানা যাবে। নিবন্ধনের জন্য খরচ হবে ২০০ টাকা। জেলা কার্যালয়গুলো ছাড়াও বিএমএটির ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইনে নিবন্ধন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে টাকা পরিশোধ করতে হবে টেলিটকের মাধ্যমে।

নিবন্ধনের জন্য যা যা লাগবে
বিএমইটির ডেটাবেইসে নাম নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের ফটোকপি লাগবে। যদি কর্মীর পাসপোর্ট থাকে, তার ফটোকপি লাগবে। কারও পাসপোর্ট না থাকলে সমস্যা নেই। নিবন্ধনের জন্য ছেলেদের বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৪৫ বছর। ডেটাবেইসে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রার্থীকে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, নাগরিকত্ব সনদ, ব্যাংক ড্রাফট অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি, অন্যান্য সনদ থাকলে তার সত্যায়িত কপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষার সনদ ইত্যাদি জমা দিতে হয়।
ঢাকা জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, নিবন্ধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যে কেউ যেকোনো সময় এসে নিবন্ধন করে যেতে পারবেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য যাঁরা নিবন্ধন করেছিলেন, কিংবা অন্য কোনো সময় নিবন্ধন করেছেন, তাঁদের আর নতুন করে নিবন্ধনের প্রয়োজন নেই।

নারীরাই শুরুতে সুযোগ পাবেন
প্রাথমিকভাবে সৌদি আরব বিপুলসংখ্যক নারী গৃহকর্মী নেবে। তবে নারী গৃহকর্মী হিসেবে যাঁরা যেতে চান, তাঁদের বয়স অবশ্যই ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। গৃহ খাতের কাজের আইনকানুন, ছুটি, অধিকারসহ সব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে www.musaned.gov.sa ওয়েবসাইটে।

কত খরচ লাগবে, বেতন কত?
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে, তাতে একেকজন গৃহকর্মী ৮০০ রিয়াল করে মাসিক বেতন পাবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় তিনি প্রায় ১৭ হাজার টাকা বেতন পাবেন। গৃহকর্মী বাদে অন্যদের বেতন কত হবে, সেটি এখনো নির্ধারিত হয়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার বলেন, এ ক্ষেত্রে কর্মীরা তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন পাবেন। যিনি ভালো কাজ জানেন, তিনি বেতন বেশি পাবেন। তবে কোনোভাবেই সে বেতন ৮০০ রিয়ালের কম হবে না।
এবার সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য কর্মীর কোনো টাকা লাগবে না। তবে নিজের বিভিন্ন কাজের জন্য তাঁর ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব দুজনই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে চাই, এবার সৌদি আরব যেতে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার বেশি লাগবে না। কারণ, কর্মীর বিমানভাড়া, লেভিসহ সব খরচ নিয়োগকর্তাই দিয়ে দেবেন।’
বায়রার সভাপতি আবুল বাসারও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি হয়েছে, তাতে একেকজন কর্মী পাঠানোর সব প্রক্রিয়া ও খরচবাবদ জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানগুলো জনপ্রতি এক হাজার ডলার করে পাবে। কাজেই কর্মীর কোনো খরচ হবে না।’

দক্ষ হোন, ভাষা শিখুন, জানুন সৌদি আইনকানুন
পশ্চিম এশিয়ার সৌদি আরব মরু আবহাওয়ার দেশ। এখানে কঠোর ইসলামি শরিয়াহ আইন প্রচলিত। কাজেই দেশটিতে যাওয়ার আগে, সেখানকার আইনকানুন ভালো করে জেনে নিন। আরবি ভাষা জেনে যেতে পারলে খুবই ভালো। তা সম্ভব না হলে আরবি ভাষার জরুরি কিছু শব্দ ও ব্যাখ্যা শিখে যেতে পারেন। আর বিদেশে যাওয়ার আগে দক্ষতা খুব জরুরি। বিএমইটির অধীনে দেশে ৩৮টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। সেখানে গিয়ে যেকোনো পেশায় দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। আর নারী গৃহকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি।
প্রয়োজনীয় কিছু নম্বর ও ঠিকানা: প্রবাসী কল্যাণ ভবন, ৭১-৭২ এলিফ্যান্ট রোড, ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা।
www. probashi.gov.bd
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি): ৮৯/২ কাকরাইল ঢাকা, www.bmet.gov.bd
বোয়েসেল: ৭১-৭২ এলিফ্যান্ট রোড, ইস্কাটন গার্ডেন, ঢাকা। ৯৩৬১৫১৫, ৯৩৩৬৫৫১ www.boesl.org.bd
বায়রা: বায়রা ভবন, ১৩০ নিউ ইস্কাটন রোড, ঢাকা। টেলিফোন: ৮৩৫৯৮৪২, ৯৩৪৫৫৮৭ www.baira.org.bd

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন