আমার বাবা: 'বন্ধু হে আমার রয়েছে দাঁড়ায়ে'

বিজ্ঞাপন
default-image

১৬ জুন বাবা দিবস। ছেলেমেয়ের জীবনে বাবা-মায়ের অবদান অপরিসীম। এদিন বাবাদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হয়।

দিনটি এলে আমারও বাবার কথা বেশি করে মনে পড়ে। হতদরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলেন আমার বাবা। মানুষের বাসায় জায়গির থাকতেন। প্রতিদিন পাঁচ মাইল হেঁটে, ১০ পয়সার অভাবে গোমতী নদী সাঁতার কেটে পার হয়ে পড়তে যেতেন তিনি। বিএ পাস করেন কেবল দৃঢ় মনোবল ও সংকল্পের কারণে।

বাবা ছিলেন সৎ, আদর্শ নীতিনিষ্ঠ, নিরহংকার, আপসহীন এক অসাধারণ চরিত্র। অবশ্য তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিবারের সদস্যদের চরম মাশুল দিতে হয়েছে। তিনি নিজেও ভোগ করেছেন অনেক অপমান ও হয়রানি। আমাদের সংসারে আর্থিক অনটন ও অভাব লেগে ছিল। একদিন এক লোক আম্মাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে চাইল। আম্মা তা নিতে অস্বীকার করেন। বাবা তখন স্পেশাল পুলিশ স্টাবলিশমেন্টের এসপি। মা টাকা নেননি শুনে বাবা বললেন, ‘বেশ করেছেন। এক প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ পাটের ব্যবসায়ী, যে সরকারের লাখ লাখ টাকা কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাকে আমি ধরেছি। দেখি বেটা কোথায় যায়?’ দু দিন পর চিফ সেক্রেটারি এন এম খাঁর কাছ থেকে তলব এল। এন এম খাঁ বললেন, কেসটি উঠিয়ে নেন। বাবা বললেন, ‘তা কেমন করে হয়? আমি কেসটির রিপোর্ট চূড়ান্ত করে ফেলেছি। শিগগিরই লোকটির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। আমাকে মাফ করবেন, স্যার।’ কিছুদিন পর বাবাকে সরিয়ে ওএসডি করা হয়।

১৯৫২ সালে বাবা নোয়াখালীর এসপি। আইজি সাহেব পরিদর্শনে এলেন। বাবা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জন ও শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে ছয়জনের একটি নৈশভোজের আয়োজন করছেন। আইজি সাহেব বলেন, ‘গতকাল আমি চাটগাঁ ছিলাম। বড় জেলা, বড় ডিনার। এখানে ছোট জেলা, ছোট ডিনার।’ বাবা প্রমাদ গুনলেন। আইজি সাহেব যথারীতি পরিদর্শনের ‘উপঢৌকন’ না পেয়ে ঢাকা ফিরে গিয়ে বাবাকে তাঁর পদ থেকে নামিয়ে ঢাকার অতিরিক্ত এসপি করে আদেশ পাঠালেন।

বাবার দৃঢ় ন্যায়নীতি ও নিয়মনিষ্ঠার জন্য আমাদের সারা জীবন কষ্টের সীমা ছিল না। ৪৩-এর মন্বন্তর দুর্ভিক্ষে যখন বাংলার ৩০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়, বাবা তখন নড়াইলের পুলিশ ইন্সপেক্টর। আমরা দুবেলা মিষ্টি আলু আর রুটি খেয়ে থেকেছি। একদিন মা বললেন, ছেলেমেয়েরা এসব খেতে চায় না। বড় দারোগা কালী বাবুর বাসায় তো দুবেলা ভাত রান্না হয়। বাবা বললেন, ‘কে কী খায় জানি না। যা জানি তা হলো, লাখ লাখ মানুষ এক ফোঁটা ভাতের ফ্যানের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে রাস্তাঘাটে মরে পড়ে রয়েছে।’

১৯৫৬ সালে বাবা চাকরি থেকে অবসর নেন। তখনো আমাদের কারওই লেখাপড়া শেষ হয়নি। টাকা-পয়সার দারুণ টানাটানি। মা দেরি করে বেলা তিনটা–চারটার সময় রান্না করে আমাদের দুপুরের খাবার দেন। এত দেরি করে রান্না হয় কেন? মাকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো। উনি তো দুপুর ১২টার পরে বাজার করতে যান।’ বাবা বলেন, ‘আরে বাবা ১২টার পর মাছ, তরকারি একটু সস্তায় পাওয়া যায়।’

১৯৪৭-এর দেশ বিভাগের পর বাবা ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। ঢাকায় তখনো বিক্ষিপ্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল। আমার সরল আব্বা পুলিশ অফিসার হয়েও আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাকে এবং আমার ভাই মোমেনকে মহকুমা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তদানীন্তন বিখ্যাত অন্নদা হাইস্কুলে ভর্তি করে দিলেন।

বড় ভাই মোমেন ৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ফরিদপুর চলে যান। বাবা তখন ফরিদপুরের এসপি। আমি তখন হাফপ্যান্ট–পরা নবম শ্রেণির ছাত্র। ছুটিতে একা ট্রেনে চড়ে নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে স্টিমারঘাটে গিয়ে টিকিট কিনে স্টিমারে শুয়ে থাকতাম। পরদিন সকাল আটটায় স্টিমার ছেড়ে রাত আটটায় গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছে আবার ট্রেনে চেপে রাজবাড়ী স্টেশনে নেমে সারা রাত ওয়েটিং রুমে বসে থাকতাম। পরদিন সকাল আটটায় ফরিদপুরের গাড়ি। বাসায় গিয়ে আমি মাকে বললাম, একা একা আসতে আমার ভয় করে। মা বাবাকে বললেন, একজন সেনাকে পাঠাতে পারেন হান্নানকে আনতে। বাবা রুষ্ট হয়ে বললেন, এমন কথা মুখেও আনবে না। সেপাই তো আমার চাকর নয়, সে সরকারি চাকরি করে। জীবনে একলা চলতে হবে। এখন থেকে একলা চলে সাহস অর্জন না করলে কখন করবে?

১৯৪৬ সালে বাবা তখন নড়াইলে পুলিশ ইন্সপেক্টর। স্থির করলেন আমি আর মোমেন ভাই কলকাতায় চাচার বাসায় থেকে হেয়ার স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করব। আমরা আনন্দে আত্মহারা। কল্পনায় কলকাতা তখন আমাদের কাছে লন্ডন যাওয়া। ট্রাম, গাড়ি-ঘোড়া, বিদ্যুতের ঝলমল আলো। কলকাতায় শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে একটা রিকশায় চেপে বসতেই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। মানুষটানা রিকশায় প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। রিকশা অনেক রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে গলির মধ্যে ঢুকে যেতে থাকল। আমি পথের পাশে সাইনবোর্ডে দেখি, ঠিকানা বৌবাজার। রিকশা অবশেষে একটা পুরোনো ভাঙা দোতলা বাড়ির নিচে এসে দাঁড়াল। সিঁড়িতে ন্যাংটো ছেলেরা খেলা করছে, পায়ের কাছ দিয়ে ছুটে গেল আরশোলা আর ইঁদুর। আমি চমকে উঠলাম। হায়রে, এই কি আমার স্বপ্নের কলকাতা?

দোতলায় উঠে দরজা খুলতেই দেখি পাঁচ–ছয়জন লোক তাস খেলছে। তারা আমাদের দেখে চিৎকার করে উঠল, ভাতিজারা আইছো? ঘরে পাঁচটা চৌকি। একটি আমাদের জন্য, বাকি চারটা আনিস চাচা ও তাঁর বন্ধুদের জন্য। পরে জেনেছি, এটাকে কেরানিদের মেস বলে। বিকেলে শুনি হইচই, তুমুল ঝগড়া। কেউ মোহনবাগান, কেউ মোহামেডান স্পোর্টিংয়ের সমর্থক। রাত ১২টায় আনিস চাচার বন্ধুরা সিনেমা দেখে এসে বলতে শুনলাম, ‘দেবদাস যখন পার্বতীকে বেত মারল, তখন মনে হইছিল দেবদাসকে ফালাইয়া দিয়া পার্বতীকে জড়াইয়া ধরি।’

আমাদের হেয়ার স্কুলে পড়া হয়নি। আনিস চাচা আমাদের আলিয়া মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগে ভর্তি করিয়ে দিলেন। আশাভঙ্গের বেদনায় মায়ের জন্য কান্না পায়। ভাগ্যিস, কিছুদিন পর বাবা বদলি হয়ে কলকাতায় এলেন। আমরা মেসজীবন থেকে নিষ্কৃতি পেলাম। নইলে হয়তো আমরা উচ্ছন্নে যেতাম, নষ্ট হয়ে যেতাম। অবাক লাগে, বাবা কত সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আমরা কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হব। কিন্তু জানতেন না তাঁর ভাই কী পরিবেশে থাকে।

বাবা অসাধারণ সহনশীল ও উদার মনের মানুষ ছিলেন। লন্ডনপ্রবাসী আমার ছোট ভাই শল্য চিকিৎসক যখন একজন স্কটিশ মেয়েকে বিয়ে করলেন, বাবা শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, আমরাই ভুল করেছি। আমরা যদি ও ছুটিতে এলে ওর বিয়ে দিয়ে দিতাম তবে, এমনটা হতো না। বাবা বিয়েটা মেনে নিলেন।

আমার বাবা কখনো গায়ে হাত তুলে আমাদের শাসন করেননি। তাঁর সততা ও আদর্শের দৃষ্টান্ত দিয়ে শাসন করেছেন। তবু আমরা তাঁকে খুব ভয় করে চলতাম। জীবনে আমরা কোনো দিন তাঁর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে সাহস পাইনি। এখন তো ছেলেমেয়েরা বাপের সামনে টেবিলে পা তুলে কথা বলে! সময় বদলেছে। আমরা আধুনিক হয়েছি!

আমার মা ছিলেন স্বল্পশিক্ষিত বনেদি চৌধুরী পরিবারের মেয়ে। চিঠি লিখতে পারতেন। বাসররাতে সেই যে বাবা একজন অপরিচিতা নারীকে আপনি বলে সম্বোধন করা শুরু করেছিলেন, তা থেকে তিনি আর কখনো সরে আসতে পারেননি। এমনই ছিল তাঁদের পারস্পরিক সম্মানবোধ ও ভালোবাসা। তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে গভীর রাতে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে রাজ্যের গল্প বলতে শুনেছি। এখন তো বিয়ের পরপরই সব কথা ফুরিয়ে যায়।

অর্থ-বিত্ত-বৈভবের প্রতি বাবা চিরকালই উদাসীন, নির্লিপ্ত। দেশভাগের পর যখন ঢাকায় এলেন, তখন হিন্দুরা জমিজমা পানির দরে বিক্রি করে কলকাতায় চলে যাচ্ছিল। মা একটা জমি কিনতে বলেছিলেন। বাবা বলেছিলেন, ‘ওই সব ফেলে যাওয়া জমিতে কষ্ট আছে, দীর্ঘশ্বাস আছে। ওই জমি কিনলে আপনি সুখী হবেন না।’ অবশেষে ১৯৫৬ সালে বাবা অবসর নিলেন। একসময় আমাদের আত্মীয়ের বাড়ি রেখে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর এক পুরোনো বন্ধু, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব পানাউল্লাহ বাবার নামে ধানমন্ডিতে পাঁচ হাজার টাকা দামের এক বিঘা জমির বরাদ্দ করে একটা চিঠি নিয়ে এলেন। বাবা বললেন, আমার কাছে ৫০০ টাকাও নেই। চিঠিটা নিয়ে যান। আপনাকে ধন্যবাদ। মা চিঠিটা নিয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা ঋণ নিয়ে জমির মূল্যের একটা কিস্তি দিয়ে জমিটির দখল নিলেন। বাবার মৃত্যুর দুই দিন আগে তিনি আমাকে তাঁর পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তোমাদের এই এক বিঘা জমি দিয়ে গেলাম। আর জমি কিনো না। শহরে জনসংখ্যার তুলনায় জমি অপ্রতুল। প্রয়োজনের অধিক জমি তুমি কিনলে অন্যকে বঞ্চিত করবে।’ আমি ভাবি, বাবা পুলিশ অফিসার না হয়ে শিক্ষক হলে ভালো মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারতেন।

আজকে আমাদের সমাজ মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ও সংকটে আক্রান্ত। আজকে যখন নষ্টভ্রষ্ট নীতি, প্রতারণা, চাটুকারিতা, দুর্বৃত্তায়ন, সীমাহীন দুর্নীতি ও হয়রানিতে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ, বিপর্যস্ত ও বিপন্ন, তখন প্রয়োজন প্রত্যেক পরিবারে আমার বাবার মতো সৎ, নিষ্ঠাবান ও নৈতিক সাহসী মানুষ, যাতে সমাজটা বদলে যায়। সুশাসনের সুবাতাস বইতে পারে। আমরা নিরাপদে থাকতে পারি। শান্তি ও স্বস্তি ফিরে পাই।

আমার বাবা আমার রোল মডেল, প্রেরণা ও আমার বন্ধু। বাবা দিবসে স্মরণ করে তাঁকে বলি:
‘জীবন ও মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
বন্ধু হে আমার রয়েছে দাঁড়ায়ে।’

আবদুল হান্নান: সাবেক কূটনীতিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন