default-image

হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দল মাত্রই অনুশীলনে নেমেছে। অনুশীলন শুরুর আগে তাইজুল ইসলাম দূর থেকে ইশারা দেন, ‘কথা আছে আপনার সঙ্গে। একটু থাকেন।’

গা গরম শেষ হলে তাইজুল মাঠের মাঝ থেকে সীমানার দিকে এগিয়ে আসেন। ‘আমাদের নাটোরের ক্রিকেট নিয়ে একটা লেখা লিখতে পারবেন? আমি যখন ক্রিকেট শুরু করেছি, নাটোরে তেমন সুযোগ-সুবিধা ছিল না। নাটোর থেকে প্রতিদিন রাজশাহীতে গিয়েছি অনুশীলন করতে। এখনো যে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়েছে, তা নয়। ক্রিকেটের প্রতি সবার এত আগ্রহ, অথচ ভালো ইনডোর নেই, অনুশীলনের ভালো উইকেট নেই। এমনকি ভালো কোচও নেই। ক্রিকেটাররা যদি ভালো সুযোগ-সুবিধা পেত, নাটোর থেকে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসত।’ তাইজুল কিছুটা কাতর কণ্ঠেই অনুরোধ করেন, ‘ভাই, এটা নিয়ে একটু লেখেন।’

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত বোলিং করছেন। অবশ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অসাধারণ বোলিং তাঁর এটাই প্রথম নয়। তবু কেন যেন এ বাঁহাতি স্পিনারের পাদপ্রদীপের আলোয় আসা হয় না। এই যে ‘আনসাং হিরো’ হয়ে থাকা, এ নিয়ে কোথায় আফসোস করবেন, তাঁকে ভালোভাবে তুলে না ধরায় খোঁচা দেবেন; অথচ তাইজুল অনুরোধ করছেন নাটোরের ক্রিকেট নিয়ে লিখতে।

এই হচ্ছেন তাইজুল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার বলতেই যে ঝলমলে চেহারা চোখে ভেসে ওঠে, তিনি মোটেই সে রকম নন। নিতান্তই সাদাসিধে, কথাবার্তায় তারকাসুলভ কোনো ব্যাপার নেই। জাতীয় দলের আশপাশে থাকা ক্রিকেটাররাও যেখানে সাধারণত ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলে চলাফেরা করেন, সেখানে তাইজুলকে সাইকেলের প্যাডেল মেরে অনেক সময় আসতে দেখা যায় শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।

তবে তাইজুলকে মাঠের লড়াইয়ে বড় তারকাই মানতে হবে। মাঠের বাইরে সাধাসিধে জীবনযাপন, ২২ গজে ফণা তোলেন বাঁহাতি স্পিনে। টেস্ট-ওয়ানডে দুটিতেই তাঁর মতো স্বপ্নের সূচনা খুব কম ক্রিকেটারেরই হয়েছে। টেস্ট অভিষেকে ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ডও এই বাঁহাতি স্পিনারের। ওয়ানডে অভিষেকেই যে হ্যাটট্রিক করা যায়, সেটিও তাইজুলই প্রথম দেখিয়েছেন সবাইকে। সম্প্রতি শেষ হওয়া জিম্বাবুয়ে সিরিজে বাংলাদেশের তৃতীয় বোলার হিসেবে টানা তিন ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন। মাত্র ১ উইকেটের জন্য এক সিরিজে মেহেদী হাসান মিরাজের সর্বোচ্চ ১৯ উইকেটের রেকর্ড স্পর্শ করতে পারেননি। তবে সিরিজসেরা হয়েছেন। এই সিরিজ দিয়ে বাংলাদেশের দ্রুততম (২০ টেস্টে) ৭৫ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছেন। এত সব কীর্তি যে বোলারের, তবু কেন তাঁর পাদপ্রদীপের আলোয় আসা হয় না, সে এক গবেষণার বিষয়।

এ নিয়ে অবশ্য তাইজুলের কোনো আফসোস নেই। তিনি বরং সাদামাটা জীবনকেই বেশি ভালোবাসেন, ‘আমি চেষ্টা করি খুব সিম্পল থাকতে। আর একেকজন প্রচারের আলোয় একেকভাবে আসে। হয়তো সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি অতটা সক্রিয় নই। আমি ভালো খেলতে পারলেই খুশি। সাদাসিধে জীবন উপভোগ করি। খেলার বাইরে বাবা-মা, বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকতেই পছন্দ করি। আমি কিন্তু বিয়ে করেছি বেশ আগে, ২০১৩ সালে। আমাদের ১০ মাসের সন্তান আছে। ওর নাম তাইফ জাওয়াদ বিন ইসলাম। ছেলেকে নিয়ে অবসর সময় কেটে যায়।’

১৫ নভেম্বর রাতে যখন তাইজুল মুঠোফোনে নিজের গল্প শোনান, ফোনের ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসে তাঁর শিশুপুত্রের গলার আওয়াজ। ছেলেও তাঁর মতো বড় ক্রিকেটার হবে কি না, এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে তাইজুলের মতো অন্তত কঠিন পথ তাকে পাড়ি দিতে হবে না। ছেলেবেলায় বড় হয়েছেন আর্থিক কষ্টের মধ্যে। একটা সময়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাবাকে কাজে সহায়তাও করতে হয়েছে।

সংগ্রামের দিনগুলো তাইজুল ভুলতে পারেন না, ‘অনেক কষ্ট করে আমার এত দূর আসা। একটা সময় আমাদের আর্থিক অবস্থা অনেক খারাপ ছিল। তবে ক্রিকেটার হতে বাবা-মায়ের অনেক সমর্থন পেয়েছি। তাঁরা বলেছেন, তোমাকে কাজকর্ম করতে হবে না, খেলাধুলাই করো।’

তাইজুলের ক্যারিয়ারের বড় বাঁকবদল—২০১১ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রাইম দোলেশ্বরে খেলা। ঢাকার শীর্ষ ক্রিকেটে নিজেকে জায়গা করে নিতে বাংলাদেশ দলের সাবেক দুই অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ ও খালেদ মাসুদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবে জাতীয় দলে পা রাখতে তাইজুলকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে ২০১৪ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল)। বিসিএলে ৪ ম্যাচে ৩৭ উইকেট নিয়ে সেবার জায়গা করে নেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলে। কদিন পরে জাতীয় দলে। টেস্ট ক্রিকেটে অবশ্য তাইজুলকে আর পিছিয়ে তাকাতে হয়নি। তবে একটাই খামতি, তিন সংস্করণে অপরিহার্য বোলার হিসেবে এখনো নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। নামের পাশে বসেছে ‘টেস্ট বোলার’ তকমা। এতে জোর আপত্তি তাঁর, ‘টেস্ট বোলার সংবাদমাধ্যমই আমাকে বানিয়েছে। বিপিএল কিংবা প্রিমিয়ার লিগের কটা মৌসুম খারাপ খেলেছি, বলুন তো? সবশেষ বাংলাদেশ এ দলের হয়ে আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়েছি। সেখানে টি-টোয়েন্টি সিরিজে খারাপ করিনি। দেখা যাক, আমি আশাবাদী।’

তাইজুল আশা ছাড়েননি। তাঁর স্বপ্নের পরিধিও অনেক বড়, ‘বিশ্বকাপ খেলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। কঠোর পরিশ্রম করে যাবে। জিম্বাবুয়ে সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হয়েছি। চেষ্টা করব এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও ছন্দটা ধরে রাখতে।’
তা হতে পারলে হয়তো তাইজুলের নামের পাশ থেকে কাটা পড়বে ‘টেস্ট বোলার’ তকমা। সেটি দরকারও। একজন দুর্দান্ত বাঁহাতি স্পিনার কেন একটি নির্দিষ্ট সংস্করণে আবদ্ধ থাকবেন? তাঁর বিচরণ হওয়া উচিত সবধরনের ক্রিকেটেই।

 

default-image

তাইজুলের হাতে মহারাজার বাকি ইতিহাস
মুক্তার হোসেন, নাটোর

‘মহারাজা জ্ঞানেন্দ্র নাথ (১৮৬৮-১৯২৬) একজন ভালো ক্রিকেটার ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে কলকাতায় সে সময় ক্রিকেটের নাটোর ক্লাব ছিল। অনেক নামীদামি ক্লাবের সঙ্গে সে ক্লাব খেলেছে। আমরা তাইজুলকে নিয়ে মহারাজার সেই ক্রিকেট ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে পেরেছি। তার নেতৃত্বে নাটোরের ক্রিকেটের পুনর্জাগরণ হবে।’ বললেন তাইজুল ইসলামের শিক্ষক আবদুল হাকিম। নাটোরের মহারাজার প্রতিষ্ঠিত জেএন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক তিনি। এ স্কুলেই তাইজুল ইসলাম পড়েছেন।

আবদুল হাকিম জানালেন, তাঁদের স্কুল থেকে অনেকে ভালো করেছেন, কিন্তু তাইজুলের মতো এত সুনাম কেউ কুড়াতে পারেননি। অথচ অভাব-অনটনের সংসারে তাইজুলের ইসলামের পড়াশোনাই বন্ধ হয়েছিল এই স্কুলে পড়ার সময়।

বাঁহাতি এই স্পিনারের জন্ম নাটোর সদর উপজেলার পিপরুল গ্রামে। পরে অবশ্য পরিবারের সঙ্গে নাটোর শহরের বঙ্গজল এলাকায় চলে আসেন। ছোটবেলা থেকেই সারাক্ষণ ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকতেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। দশম শ্রেণিতে ওঠার পর পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয় তাইজুলের।

একসময় তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ হন নাটোরের ক্রিকেটপ্রেমী আবদুল্লাহ আল আশরাফি। তিনি তাইজুলকে বিভিন্ন মাঠে ক্রিকেটের অনুশীলনের সুযোগ করে দেন। দিনাজপুরে বিকেএসপির এক বছরের এক প্রশিক্ষণে তাঁকে ভর্তির ব্যবস্থাও করেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন। বিভাগীয় দলে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার মাঠে খেলা শুরু করেন। 

তাইজুলের মা তাছলিমা বেগম বললেন, ‘ওর সাফল্যের খবর শুনে চোখে পানি চলে আসে। আনন্দে বুকটা ভরে যায়। ওর জন্য এখন আমাদের সংসারের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। আমরা বস্তি ছেড়ে এখন সচ্ছল জীবনযাপন করছি। আমরা সুখে আছি। দেশের সবার কাছে ওর জন্য দোয়া চাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0