শিশুর বেড়ে ওঠার সময় তাদের উচ্চতা ঠিক আছে কি না, তা বোঝা অনেক বাবা–মায়ের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। আজকাল অনেক মা–বাবা সন্তানের স্বাভাবিক বৃদ্ধির ব্যাপারে ততটা অভিজ্ঞ নন। সাধারণত সমবয়সী অন্য ছেলেমেয়েকে দেখে কেউ তুলনা করতে পারে যে তার সন্তানের দৈহিক বৃদ্ধি বেশি না কম। প্রতি মাসে অথবা তিন মাসে কিংবা বছরে শিশুর উচ্চতা কত সেন্টিমিটার বাড়ল, তা মেপে রাখার দৃষ্টান্ত খুবই কম। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময় হঠাৎ করেই দেখা যায়, অনেকে উচ্চতায় খুব বেশি লম্বা কিংবা খর্বকায়।

সবার দৈহিক বৃদ্ধির হারও এক রকম নয়। জাতিগত বৈশিষ্ট্য, মা–বাবার উচ্চতা, পুষ্টিজনিত সমস্যা, বংশগত রোগ ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন হরমোনজনিত রোগে কারও কারও দৈহিক উচ্চতা কম বা বেশি হতে পারে। যে হরমোনটি উচ্চতার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সেটি হলো মস্তিষ্কের পিটুইটারি নামক হরমোন গ্রন্থিনিঃসৃত গ্রোথ হরমোন। ছোটকাল থেকে এই হরমোনের আধিক্য হলে কেউ মাত্রাতিরিক্ত লম্বা হয় আর হরমোনটির কমতি হলে খর্বকায় বা বেঁটে হয়ে থাকে।

দৈহিক উচ্চতা কমবেশি হলে স্বাস্থ্যগত সমস্যাকেও ছাড়িয়ে যায় ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সামাজিক সমস্যা। তাই উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় কমবেশি হলে, বিশেষ করে খর্বকায় হলে সমস্যার অন্ত থাকে না। উচ্চতা কমবেশি হবার কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। তবে এর কোনো কার্যকর চিকিৎসা আছে কি না, তা জানা প্রয়োজন।

হরমোন বিশেষজ্ঞরা গ্রোথ হরমোন দিয়ে খাটো লোকদের লম্বা করতে পারেন এ রকম একটা ধারণা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। এ ধারণা অনেকটাই সঠিক। তারপরও বাস্তবতায় দেখা যায়, কোনো খর্বকায় মানুষ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তেমন কোনো সন্তোষজনক ফল পান না। এর কারণ কী?

সুস্থ স্বাভাবিক শিশু জন্মগ্রহণের পর কয়েক বছর ধরে প্রতিবছরে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার করে লম্বা হয়ে থাকে, যা ধীরে ধীরে কমে প্রতিবছরে ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটারে গিয়ে পৌঁছায়। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সে হঠাৎই উচ্চতা বৃদ্ধির হার কয়েক মাস বা বছরের জন্য বেড়ে যায়। সাবালক হওয়ার পর উচ্চতা আর বাড়ে না বললেই চলে। এ সময় উচ্চতা বৃদ্ধি হতে পারে না। কারণ, শরীর লম্বা হবার জন্য পা ও হাতের লম্বা অস্থিগুলোর যে অংশে হরমোন কাজ করে, তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বলাই বাহুল্য যে সাবালক হবার পর হরমোন দিয়েও কাউকে লম্বা করা সম্ভব হয় না।

এই বিষয়ে ঠিকভাবে না জানার কারণেই খর্বকায় শিশু বা তার অভিভাবকেরা বেশ দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান, যখন হরমোন চিকিৎসায় ফল লাভ হয় না। যত কম বয়সে হরমোন চিকিৎসা শুরু করা যায় ততই ভালো। হরমোন বিশেষজ্ঞরা কেবল আনুমানিক ১১ বছর বয়সের আগে এলেই গ্রোথ হরমোন দিয়ে ফলপ্রসূ চিকিৎসা করতে পারেন। ১৫-১৬ বছরের পরে কেবল পায়ের সার্জারি করা ছাড়া উচ্চতা বাড়ানোর আর কোনো উপায় থাকে না।

ভবিষ্যতে কেউ খর্বকায়, অতি লম্বা হবেন কি না অথবা শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তার শরীরে প্রকৃতই কোনো হরমোনের ঘাটতি আছে কি না, তা শিশু বিশেষজ্ঞরাও বুঝতে পারেন। মা–বাবারা যদি শিশুদের ওজন ও উচ্চতা কয়েক মাস পরপর মেপে লিখে রাখেন এবং চিকিৎসককে জানাতে পারেন, তাহলে অনেক ভালো হয়।

যেসব হরমোনের কারণে মানুষ খর্বকায় হয়ে থাকে যেমন গ্রোথ হরমোন, থাইরয়েড হরমোন, ভিটামিন ডি ইত্যাদি আজকাল রক্তেও মাপা যায়। প্রয়োজন হলে ওষুধের আকারে পাওয়াও যায়। গ্রোথ হরমোনের দাম কিছুটা বেশি হওযায় অনেকের পক্ষে এর ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় না, তবে শিশুর বয়স কম থাকা অবস্থায় অর্থাৎ আগেভাগে চিকিৎসা শুরু করা গেলে কম ওষুধেই বেশি কাজ হয় এবং বাচ্চার ওজন কম থাকায় এমনিতেই ওষুধ কম লাগে এবং ব্যয় কম হয়। জনগণের মধ্যে শিশুদের বৃদ্ধি, বিশেষ করে উচ্চতার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ হলে ব্যাপারটি যথাসম্ভব আগেভাগেই চিকিৎসকের সহায়তা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে অনেকেই উচ্চতাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করে নিতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন