ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগেরই পাকা চুল। অনেকে চুলে কালার করেছেন। এই শিক্ষার্থীদের বয়সটা শুরুই হয়েছে ৫০ বছর থেকে শুরু করে। তাঁরা অবসরে বসে না থেকে নিচ্ছেন তথ্যপ্রযুক্তিতে আয় উপযোগী নানান বিষয়ে প্রশিক্ষণ।

সম্প্রতি এই শিক্ষার্থীদের দেখা মেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে। প্রবীণ নারী-পুরুষদের জন্য এ ধরনের কাজ শেখা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার এমন সুযোগ সৃষ্টি করেছে ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউট।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী পরিচালক মনির হোসেন বললেন, প্রবীণ ব্যক্তিদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মতো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সিনিয়র সিটিজেন ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবেই তাঁরা পরিচিত। ছয় মাসের কোর্স করে ২৫ জন অনলাইনে কাজ ও আয়ের জন্য উপযুক্ত হয়ে গেছেন।

মনির হোসেন বললেন, প্রবীণদের এই ব্যাচে নারী শিক্ষার্থীরাই বেশি ভালো করছেন। আর তুলনামূলক নারীদের সংখ্যাটাও কিছুটা বেশি। বর্তমানে নতুন ২৫ জন শিখছেন।এই প্রশিক্ষণ প্রবীণদের জন্য উন্মুক্ত।

জানা গেল, পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণার্থীরা বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। প্রথম ব্যাচের কোর্স সম্পন্ন করা ১৩ জন বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে থেকেই কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কোর্স ফি ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী আফিফা বানু। বয়স ৬০ ছুঁই–ছুঁই। এবি ব্যাংকে চাকরি করেছেন ২৮ বছর। সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কর্মজীবনের ইতি টেনেছেন। অবসরের পর প্রায় দেড় বছর ঘরেই বসা ছিলেন। চাকরিজীবনে ভাবতেন, অবসর নিলে সময়টা হেসে-খেলেই কেটে যাবে। কিন্তু অবসরটাই একসময় যন্ত্রণায় পরিণত হয়।

আফিফা বানু বললেন, ‘নতুন কিছু শুরু করার পরিকল্পনা করি। ভর্তি হয়ে গেলাম গ্রাফিকস ডিজাইনের একটি কোর্সে। তারপর একসময় কোর্সটা শেষও করে ফেললাম। এখন নতুন করে আয়-উপার্জন শুরু করার প্রস্তুতিও প্রায় চূড়ান্ত।’

আফিফা বললেন, ‘সত্যি বলতে কী ‘গ্রাফিকস’ কী তার কিছুই জানতাম না। তবে শুনেছিলাম ভালো করে কাজ করলে আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ আছে। উৎসাহ বেড়ে গেল অনেক। প্রথম ক্লাসে গিয়ে ভালোই লাগছিল। কম্পিউটারে এবিসি শিখছিলাম। কিন্তু যখন আসল কাজগুলো করছিলাম তখন একবারে হতাশ। কারণ, সবকিছু যত সহজ ভাবা হয়, অনলাইনে কাজ করাটা তত সহজ নয়। ভাবছিলাম পারবই না কিছু। কিন্তু সন্তানতুল্য শিক্ষকেরা অসীম ধৈর্য নিয়ে আমাদের যখন শেখান তখন শিখতে ভালো লাগে। অল্পবয়সীদের তুলনায় হয়তো শিখতে সময় লাগে কিছুটা বেশি, তবে নতুন করে কিছু শেখার আনন্দ অন্য রকম। নিজের কাজগুলো মার্কেটপ্লেসে দেওয়ার সুযোগ যখন এল, তখন আনন্দে মন ছেয়ে যায়।’

default-image

আফিফা বেশ গর্ব করেই বললেন, ‘একটা সময় জানতামই না ব্যানার, ফেসবুক কাভার কী জিনিস। আর এখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কারুকাজ দেখেও বুঝতে পারি, তা কীভাবে করা হয়েছে। এ বয়সে শেখার যে আনন্দ, আত্মতৃপ্তি, সত্যিই অনেক পাওয়া।’

জরিনা জাহেদ গৃহিণী। বয়স প্রায় ৫০ বছর। তাঁর দুই ছেলে এক মেয়ে। সন্তানেরা ভালো চাকরি করছেন। ২০১৪ সালে জরিনার শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধে। চিকিৎসা চলে। এ সময় মানসিক ধকল কাটানোর জন্য জুতসই সুযোগ খুঁজছিলেন তিনি। প্রতিদিন সকালে ধানমন্ডি লেকে হাঁটাহাঁটি করতেন। করতেন যোগব্যায়াম। অবশেষে গত বছরের নভেম্বরে জরিনাও আফিফা বানুর সঙ্গে গ্রাফিকস ডিজাইন বিষয়ে কাজ শেখা শুরু করেন।

জরিনা বললেন, ‘অবসর সময়ে না চাইলেও মনে দুশ্চিন্তা আসে। নিজেকে অসুস্থ বা সমাজের বোঝা মনে হয়। তবে সম্পূর্ণ ভিন্নধারার একটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমার সাহসটাই বেড়ে গেছে। এ কাজ ওষুধের মতোই কাজ করেছে। আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ থাকছি এখন। কম্পিউটারের অনেক কাজ বুঝি বা করতে পারি।’

নাজমা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। শারীরিক অসুস্থতা, ওপেন হার্ট সার্জারিসহ নানা জটিলতায় কোনো চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। ঘরসংসার করেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের একটি দীর্ঘ সময়। তবে শুধু ঘরসংসার না করে নতুন কিছু শেখার ইচ্ছাটা মনের মধ্যে সব সময়ই ছিল। কাজের সুযোগটা পেয়েও গেলেন তিনি। শুরু করলেন অপারেটিং সিস্টেম, অফিস অ্যাপ্লিকেশন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, গ্রাফিকস ডিজাইনের মতো নতুন বিষয় শেখা। তাঁর মতে, বয়স কোনো বাধা নয়—ইচ্ছাশক্তিই আসল।

৫০ বছরের বেশি বয়সী নাইমা চৌধুরী। দুই ছেলে, এক মেয়ে। অনেক দিন ধরেই নিজের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম খুঁজছিলেন যেখানে মনের কথাগুলো অবলীলায় তুলে ধরতে পারবেন। এক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে নাতির বয়সী অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুরু করলেন ক্লাস করা। এখন অনলাইনে কাজে দারুণ আত্মবিশ্বাসী। নাইমা চৌধুরী বলছিলেন, শুরুতে কমবয়সীদের সঙ্গেই প্রবীণদের ক্লাস করতে হতো।

৪৯ বছর বয়সী মো. আলাউদ্দিনও প্রথম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী। তিনি বললেন, আগে পোশাকশিল্পে ২১ বছর কর্মরত ছিলেন। পোশাকশিল্পের অবস্থা কিছুটা খারাপ হওয়ায় তিনি কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা চিন্তা করেন। শুরুতে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাচে ছিলেন। তবে তুলনামূলক কমবয়সী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না। তখন তিনি প্রবীণদের ব্যাচে এসে যুক্ত হন। এখানে সেই অর্থে প্রতিযোগিতা না থাকলেও সবাই একে অন্যকে সহযোগিতা করেছেন।

প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রায় ১০ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁরা বললেন, এই বয়সে নতুন করে কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়াটা বেশি জরুরি। কেননা, ক্লাসে বসে শিখলেই হয় না, বাসায় বসে চর্চাও করতে হয়েছে এই শিক্ষার্থীদের। তবে অনেককে পরিবার থেকে সহযোগিতা না পাওয়ার কথাও জানালেন। রাত জাগতে হয় বলে পরিবারের অন্য সদস্যরা বিরক্ত হন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0