তাঁর দুই হাতের কবজি পর্যন্ত কাটা। তারপরও দক্ষতার সঙ্গে কখনো মাঝমাঠে বাঁশি বাজিয়ে খেলা পরিচালনা করছেন, আবার কখনো মাঠের বাইরে পতাকা হাতে রেফারির সহকারী হিসেবে কাজ করছেন। এমন দৃশ্য এখন খুলনায় যেকোনো বড় ফুটবল খেলা হলেই দেখা যায়। এই রেফারির নাম এস এম কামরুল আজম।
default-image

এস এম কামরুল আজমকে খুলনার ক্রীড়াজগতে সবাই চেনে বাবু নামে। খুলনা জেলা ফুটবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য তিনি। খুলনায় পাইওনিয়ার, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ফুটবল খেলা পরিচালনা করেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল খেলা পরিচালনার ডাক পড়ে তাঁর।

নিজের দুই হাত নেই সেটিকে খুব বেশি আমলে নেন না কামরুল আজম। তাই তো রেফারির সহকারী (লাইনম্যান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় পতাকাটি বিশেষ রাবার দিয়ে হাতের সঙ্গে বেঁধে নেন। নিজেই চালাতে পারেন মোটরসাইকেল, সাইকেল, প্রাইভেট কার। এ ছাড়া লেখাপড়া, মোবাইল অপারেট করাসহ প্রায় সব কাজই নিজের মতো করতে পারেন তিনি। দুই হাতের কবজি হারানোর পর নিজের ইচ্ছাশক্তিতেই ওই কাজ শিখেছেন তিনি।

কামরুল আজম বলছিলেন, ‘যার দুটো হাত নেই, তার অনেক কিছুই না পারার কথা। তবে আমি সবকিছু নিজে করার চেষ্টা করি। ঠেকে গেলে তখন অন্যের সাহায্য নিই।’

কামরুল আজমের গ্রামের বাড়ি যশোরের অভয়নগর উপজেলার ধূলগ্রাম গ্রামে। খুলনার ফুলতলা উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদ পার হলেই তাঁর বাড়ি। বাড়ি যশোরের সীমানার মধ্যে হলেও বেড়ে ওঠা, খেলাধুলা, কাজকর্ম সবকিছুই খুলনাকেন্দ্রিক।

১৯৯৮ সালে এক দুর্ঘটনায় দুই হাতের কবজি পর্যন্ত হারান। কাজ করতে গিয়ে মাছের ঘেরে থাকা শ্যালো মেশিনে দুই হাতে প্রচণ্ড আঘাত পান তিনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তাঁর দুই হাত কেটে ফেলতে হয়। হাত কেটে ফেলার পরও দমে যাননি। নিজের মতো করেই গুছিয়ে নিয়েছেন সবকিছু। দুই মেয়ে, স্ত্রী, মাসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে অভয়নগর বাজারে টেম্পোর সিরিয়াল ও টাইম কিপার হিসেবে কাজ করেন। এর পাশাপাশি যখনই ডাক পড়ে, তখনই ছুটে যান ফুটবল মাঠে।

১৯৮৪ সালে ফুলতলা রি-ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন কামরুল আজম। এর আগে ১৯৮১-৮২ সালের দিকে ফুলতলায় এক ক্লাবের আয়োজনে বাংলাদেশ ড্রাগন কারাতে ক্লাবে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ নেন। এসএসসি পরীক্ষার পর শুধু মার্শাল আর্ট শিখতেই ঢাকায় চলে যান। ১৯৮৬ সালে ড্রাগন কারাতে ক্লাব থেকে তাঁকে মার্শাল আর্টের সর্বোচ্চ পদক ব্ল্যাক বেল্ট দেওয়া হয়।

কবজি হারানোর পরও নিয়মিত ফুটবল, ক্যারম খেলতেন তিনি। পাশাপাশি চলত খেলা পরিচালনা করাও, তবে সেটা ছোট পরিসরে। ২০০৭ সালে গ্রামের ফুটবল মাঠে বড় কোনো প্রতিযোগিতাপূর্ণ খেলায় রেফারি করার মধ্য দিয়ে রেফারি জগতে প্রবেশ করেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় বড় কোনো খেলা হলেই ডাক পড়ত তাঁর। একপর্যায়ে ২০১৪ সালে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে পরিচয় হয় খুলনা জেলা ফুটবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হকের সঙ্গে। রেফারিংয়ে আগ্রহ দেখে তাঁর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি। পরে পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় শ্রেণির খেলা পরিচালনার সনদ অর্জন করেন। ২০১৭ সালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন। আর এসব কাজে তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন সাবেক ফিফা রেফারি মুনসুর আজাদ, সাবেক ফিফা রেফারি ও বাংলাদেশ ফুটবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ইব্রাহিম নেছারসহ আরও কয়েকজন।

default-image

খুলনা জেলা ফুটবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ফিফা রেফারি এহসানুল হক বলেন, সব প্রতিবন্ধকতা জয় করে সফলভাবেই খেলা পরিচালনা করেন কামরুল আজম। ওই হাত নিয়ে সাবলীলভাবে লিখতে পারায় চতুর্থ রেফারির দায়িত্ব পালন করতেও সমস্যা হয় না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজের প্রতিবন্ধকতাকে তিনি আমলেই নেন না। সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়েই সব কাজ আয়ত্ত করতে পারেন।

কামরুল আজম মনে করেন, মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। একটু চেষ্টা করলেই অনেক কিছু করা সম্ভব। যেমনটি তিনি বলেন, ‘আমি কখনো নিজের দুর্বলতার কথা ভাবি না। আমি কখনো চিন্তা করি না কীভাবে রেফারি করব, কীভাবে মোটরসাইকেল চালাব, কীভাবে ভাত খাব। আমি চেষ্টা করেছি আর সেটা করতে সক্ষম হয়েছি।’

যাঁরা নিজের শারীরিক অক্ষমতাকে বড় করে দেখেন, তাঁদের প্রতি কামরুল আজমের ছোট বক্তব্য হলো, চেষ্টা করলে সবকিছু করা সম্ভব। শ্রম কারও সঙ্গে বেইমানি করে না। কাজ শিখলে তার ফল পাওয়া যাবেই। কোনোভাবেই হতাশ হওয়া চলবে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন