default-image

পরিকল্পনা বেশ জটিল। এফডিসি থেকে ভাড়া করা অভিনয়শিল্পীরা বইমেলায় আক্কাস ভাইকে সারাক্ষণ ঘিরে ধরে থাকবেন। তাঁরা ভক্ত সেজে একের পর এক অটোগ্রাফ নেবেন, সেলফি তুলবেন। সেটা দেখে সাধারণ পাঠক ভাববেন, আক্কাস ভাই অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন কবি। তাঁর বই না কিনলে বইমেলায় আসাই বৃথা। এ ছাড়া ওই জটলার সামনে সারাক্ষণ একটা ভিডিও ক্যামেরা থাকবে। সঙ্গে বুম হাতে সাংবাদিক। আজকাল প্রায় সবাই ক্যামেরাকাতর! আগে মানুষ অন্যের বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ত, এখন ঝাঁপিয়ে পড়ে টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা দেখলে।
পরিকল্পনামাফিক সব চলছে। পুরো বিষয়টা দেখভাল করছি রবিন আর আমি। ঝামেলা একটাই— এফডিসির অভিনয়শিল্পীরা ওভার অ্যাকটিং করছেন। মুখে কড়া মেকআপ। যিনি সাংবাদিক সেজেছেন, তাঁর গলায় ক্যাটক্যাটে লাল রঙের টাই। সেটা কিছুক্ষণ পর পর বাতাসে পতপত করে উড়ছে, আর ভদ্রলোক সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভক্ত পাঠকদের একজনের টি–শার্টে লেখা—আই লাভ নিউইয়র্ক! আক্কাস ভাই সেটার দিকে কিছুক্ষণ কড়া চোখে তাকিয়ে ছিলেন। ব্যাপারটা লক্ষ করে টি–শার্টপড়ুয়া লাজুক মুখে বলল, ‘ফরেন জিনিস, স্যার! ব্রাদার অব লয়ের গিফট!’ সেলফি তোলার সময় হলো আরেক ঝামেলা। দেখা গেল একজনের মোবাইলফোনের চার্জ শেষ! দূর থেকে বোঝা যাচ্ছে, আক্কাস ভাই বিরক্ত। ইশারায় আমাদের কাছে ডেকে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আসল পাঠক কোথায়?’
‘ভাই, কেবল তো শুরু।’ গলা নামিয়ে বললাম আমি, ‘আর কিছুক্ষণ ওয়েট করেন।’ বলতে না–বলতেই এক পাঠক হাজির! বয়স ৪০ কি ৪২। বেশ নিরীহ, মায়াময় চেহারা। দেখেই কেন জানি মনে হলো, ভদ্রলোক কবিতার বিশেষ অনুরাগী। আমরা সরে গিয়ে খানিকটা জায়গা করে দিলাম। ভদ্রলোক ছোট জটলাটার ভেতর কোনোমতে মাথাটা সেঁধিয়েই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি কবি অনিন্দ্য আকাশ (আক্কাস ভাইয়ের ছদ্মনাম)?’ আক্কাস ভাই কবিসুলভ হাসি হেসে বললেন, ‘জি, বলছি!’
‘“জোসনার পিঠে চাবুক মেরেছি” আপনার লেখা?’
‘জি, আমার নিজের হাতে লেখা। কম্পিউটারে কম্পোজ করেছে এক ছোট ভাই।’
‘এই বইয়ের সব কথা কি সত্যি? আর জোসনাটা কে?’
‘হা হা হা, আসলে আমার কাছে মানুষ ও কবিতার ওপরে তো সত্য কিছুই নেই! আর জোসনা হলো চাঁদের আলো।’ ভদ্রলোক এবার মুহূর্তেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন, ‘বিটলামির জায়গা পাস না, ব্যাটা অংবং! চান্দের আলো জোসনার পিঠে তুই চাবুক মারস! খাড়া, আজকে তর পিঠেই চাবুক মারুম!’ বলেই ভদ্রলোক আক্কাস ভাইয়ের কাঁধের ব্যাগ ধরে মারলেন এক হেঁচকা টান। ব্যাগের সঙ্গে আক্কাস ভাইও মাটিতে পড়ে গেলেন দড়াম করে। আগে জানতাম, কান টানলে মাথা আসে। এখন দেখলাম, ব্যাগ টানলেও মাথা আসে! অবস্থা বেগতিক দেখে ছুটে গেলাম ঘটনাস্থলে। ভদ্রলোককে জটলা থেকে বের করার চেষ্টা করতেই এমন হাত ঝটকা দিলেন, গিয়ে লাগল রবিনের ঠিক নাক বরাবর। ততক্ষণে ‘পাবলিক’ জমে গেছে। একটা সত্যিকারের টিভি চ্যানেলের ক্যামেরাও ছুটে এল ঝড়ের বেগে। তরুণ রিপোর্টার আক্কাস ভাইয়ের দিকে বুম বাড়িয়ে ‘আপনার অনুভূতি কী?’ টাইপের প্রশ্ন করার হালকা চেষ্টা করলেন, পারলেন না। আমি একা নিরুপায় ভদ্রলোককে বশেও আনতে পারছি না। রবিন আবার এক হাতে নাক চেপে ধরে এগিয়ে এল। তার দেখাদেখি এফডিসির দুজন শিল্পী সিনেমার ভিলেনের আদর্শ সহচরসুলভ ‘ইয়াল্লি’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমাদের ওপর। ভদ্রলোক তবু নাছোড়বান্দা! আক্কাস ভাইকে চাবুক না মেরে ছাড়বেন না! অবশেষে পুলিশ এসে সব শুনেটুনে খ্যাপাটে লোকটাকে এক পাশে টেনে নিয়ে যাওয়ায় রক্ষা।
তবে ভদ্রলোকের কল্যাণে আক্কাস ভাই মুহূর্তেই হিট! আধা ঘণ্টার ভেতর প্রায় তিন শ কপি বই বিক্রি হয়ে গেল! আক্কাস ভাই আচমকা ধাক্কাটাও সামলে নিলেন বইয়ের সুপার–ডুপার কাটতি দেখে। আমি রবিনের পিঠে থাবড়া মেরে বললাম, ‘রবিন, আইফোন সিক্স কিন্তু কনফার্ম!’ রবিন এক হাতে নাক চেপে ধরে কোঁকাতে কোঁকাতে বলল, ‘রাঁখ তোঁর আঁইফোঁন সিঁক্স! ওঁ মাঁ গোঁ! আঁমার নাঁকের কীঁ হঁবে গোঁ মাঁ!’ আমি অতি কষ্টে হাসি চেপে জটলার দিকে এগোলাম। মেলার আর বেশিক্ষণ নেই। অনেক স্টলেরই পর্দা নামতে শুরু করেছে। হঠাৎ ধুলো উড়িয়ে জটলার দিকে ছুটে এলেন আক্কাস ভাইয়ের বইয়ের প্রকাশক। এসেই আক্কাস ভাইকে টেনে আড়ালে নিয়ে গেলেন। আমিও ছুটে গেলাম সেদিকে। প্রকাশকের মুখে অপরাধী ভাব। চুলহীন মাথাটা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, ‘আকাশ সাহেব, সমস্যা হয়ে গেছে!’
‘কী সমস্যা?’ আক্কাস ভাইয়ের মুখ কালো।
‘ইয়ে মানে...আসলে হয়েছে কী...বাইন্ডারের ভুলে আপনার বইয়ের কভারের ভেতরে...’
‘কভারের ভেতরে কী?’
‘কভারের ভেতরে আসলে অন্য এক লেখকের বই ছিল!’
‘মানে? এতক্ষণ যেসব বই বিক্রি হয়েছে, সেসব আমার বই ছিল না?’
‘সরি, ভাই! ওই বাইন্ডারের বাচ্চা বাইন্ডারকে আজকে কাঁচা খেয়ে ফেলব!’ প্রকাশকের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো, লোকটা সত্যিই বাইন্ডারকে কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে! কিন্তু আক্কাস ভাইয়ের ভঙ্গি তো ভালো ঠেকছে না। তাঁর চোখ দুটো কেমন উল্টে গেল। তারপর ধপাস করে একটা শব্দ! ‘ধর! ধর!’ বলে একটা আওয়াজ শুনলাম। আর দেখলাম, আক্কাস ভাইয়ের চারপাশটা ধুলায় ধূসরিত! আক্কাস ভাইয়ের জ্ঞান থাকলে এই দৃশ্য দেখে নিশ্চয়ই একটা কবিতা লিখতেন। কবিতাটা হতে পারত এ রকম, ‘আকাশের বুকে আজ ধুলা/ ধুলা নয়, এ যেন বালিশের তুলা...’ আহা!

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন