টলেন্টিনোর সাধু নিকোলাসের গির্জার সামনে ভ্রমণকারীরা
টলেন্টিনোর সাধু নিকোলাসের গির্জার সামনে ভ্রমণকারীরালেখক

সাইকেল চালিয়ে বাঙালি যে পৃথিবী ঘুরে ফেলেছে তা এত দিনে সবার জানা হয়ে গেছে। ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস, বিমল দেসহ আরও কয়েকজন নিজেদের সাইকেলকে বাহন করে ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর পথে। আর আমরা তাঁদের কিয়দংশ অনুসরণ করে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি সাইকেল নিয়ে নিজের দেশ দেখতে, তার মাটি-বাতাসের স্বাদ নিতে; প্যাডেল মেরে বেড়াই নানা জায়গায়। অনেকেই আমাদের জিজ্ঞেস করেন, কী পাও এত ঘুরে? মনে মনে বলি, তৃপ্তি পাই, ভালো লাগে তাই ঘুরে বেড়াই। এ তো অনুধাবনের ব্যাপার, বস্তুগত তুলনায় তা বোঝান যাবে না।

সত্যিকারের ভ্রমণকারীর চোখ দুটি। একটি বাইরের অপরটি অন্তরের। অন্তরের চোখে ভ্রমণকারী কেবল উপলব্ধি করেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। মনের খোরাক মেটাতেই বিভিন্ন সময়ে তাই বেরিয়ে পড়া এদিক-ওদিকে।

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনা অতিমারী শুরুর পর থেকে গৃহবন্দীত্ব; অথচ বাইরে বের হওয়ার জন্য প্রাণ আনচান করছে; এরই মধ্যে আশরাফুজ্জামান ভাই জানালেন ঢাকার কাছে কোথাও সাইকেলে ঘুরতে যাওয়ার কথা। তিনি আরও জানালেন, আন্তর্জাতিক সামাজিক সংগঠন স্পিক ঢাকা এবং বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আমরা একটা সাইকেল রাইড করব। সেই সূত্রেই কিছুদিন আগেই ঘুরে এলাম কালীগঞ্জ। এখানকার নাগরী জায়গাটা বেশ সুন্দর। প্রাচীন দুটি গির্জাও আছে। জনা দশেক সাইকেলপ্রেমীদের সঙ্গে কাটানো গেল খানিকটা উপভোগ্য সময়।

সুপ্রাচীনকাল থেকেই কালিগঞ্জে প্রাচীন জনপদের বসতি ছিল তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বিজিত ও বিতাড়িত লক্ষণ সেন ও তার বংশধররা দীর্ঘদিন পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করেছে। সে সময়ে এ অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরে বাংলায় মুসলিম রাজত্বকালে গাজীপুর অনেকগুলো চেদি রাজ্যে বিভক্ত হয়। কালীগঞ্জ ছিল স্বাধীন সামন্ত রাজা থাইডা ডোসকার অধীনে।

কালিগঞ্জ, গাজীপুর জেলার অন্যতম একটি উপজেলা। এক সময় এখানে মসলিন উৎপাদিত হত। শত বছরের প্রাচীন স্কুল আর আর এন (রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায়) পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মসলিন কটন মিল এখানে অবস্থিত। কালীগঞ্জ ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান নীল চাষের এলাকা। ইংরেজ কুঠিয়ালদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জের নীল চাষীরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে বিদ্রোহও করেছে।

এ ছাড়া ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত যীশু হৃদয়ের গীর্জার জন্য রাঙ্গামাটিয়া, ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সাধু অগাস্টিনের গীর্জার জন্য মঠবাড়ি গ্রাম ঐতিহাসিক স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে।

দিনটি ছিল শনিবার, ২৫ জুলাই। আমরা ছিলাম ১০ জন। নতুন অনেকের সঙ্গে পরিচয়ও হলো। এক জোড়া অনিককে পেলাম যারা আমার বিশ্ববিদ্যালয় এআইইউবিতে পড়েছে। আরিফ আমাকে ফেসবুকে খুঁজে পেয়েছে এবং এই রাইডে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এরপর ওর সঙ্গেও বন্ধুত্ব জমে গেল। সাইকেল শান্তর ভালো লাগা এবং নেশা। উৎসাহী এই তরুণ আমাদের পেয়ে উচ্ছ্বাসিত।

উত্তরাতে সবাই জড়ো হয়ে একসঙ্গে চলা শুরু করি। উত্তরখান হয়ে তেরমুখ ব্রিজের পরেই মূলত সুন্দর আর যানজট মুক্ত রাস্তা। আমরা তেরমুখ ব্রিজের ওপরে দাঁড়ালাম, ছবি তুললাম। এখানে অনেকবারই আসা হয়েছে, দেখেছি তুরাগের নানা রূপ। তেরমুখ ব্রিজ যখন হয়নি তখন আমরা সাইকেল নৌকায় তুলে পার হয়ে অন্য পারে যেতাম। ঢাকার কাছে এমন ছায়া ঘেরা গ্রামীণ আবহে পাকা রাস্তা ধরে সাইকেল চালাতে চালাতে হাওয়ায় ভাসতাম। এখন বর্ষাকাল, দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি।

default-image

বেশ গরম ছিল সেদিন। তেরমুখ ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে তুরাগ; বর্ষায় এর পুরন্ত রূপ। স্বচ্ছ, টলটলে পানি। ব্রিজের ওপর থেকে নদীকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।

তুরাগ আসলে একটি নদ। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় বংশী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ঢাকার সাভার উপজেলার বিরুলিয়া ইউনিয়নে এসে দুটি ধারায় ভাগ হয়েছে। এর মূল শাখাটি আমিনবাজার হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে পড়ছে। অন্যদিকে তুরাগের আরেকটি শাখা বিরুলিয়া থেকে আশুলিয়া-টঙ্গী হয়ে বালু নদে গিয়ে মিশেছে। স্থানীয়ভাবে এই শাখাকেও তুরাগ নদ বলা হয়; যদিও তুরাগ নদের এই অংশের আদি নাম ‘কহর দরিয়া’।

বিজ্ঞাপন

আমরা তেরমুখ ব্রিজের ওপর কিছুক্ষণ কাটিয়ে উলুখোলা বাজারের দিকে রওনা দেই। উলুখোলার বীরতুল গ্রামের সুমন আমাদের অনেক দিনের চেনা, ছোট ভাই। সে আমাদের অপেক্ষায় ছিল উলুখোলা বাজারে। সুমনের আতিথ্যে লটকন, কাঁঠাল আর মুড়িতে জলযোগ সেরে আমার সামনের পথ ধরি। এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে নাগরি। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত এই গ্রামে ১৬৬০ সাল থেকে পর্তুগিজ মিশনারিরা এসে বসতি শুরু করেন।

default-image

আমরা প্রথমে যাই টলেন্টিনোর সাধু নিকোলাসের গির্জায়। এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম গির্জা। পাশে নতুন গির্জা নির্মাণ করা হয়েছে বেশ অনেক বছর আগে। এখন সেখানেই প্রার্থনা হয়। একটি কবরখানাও আছে পেছনের দরজার প্রবেশ মুখে। পঞ্চদশ শতকে ভাস্কো-দা-গামা ভারতবর্ষে আসেন। সেই পথ ধরে পর্তুগিজরা বাংলাদেশে আসে ১৫১৭ সালে। ১৬৬৪ সালে ব্যবসা করা ও ধর্ম প্রচারের জন্য তারা ভাওয়াল নগরীতে এসে এবং গির্জা প্রতিষ্ঠা করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে লিসবন থেকে আসেন পাদরি ম্যানুয়েল দা আসসুম্পসাউ। তিনি স্থানীয় নাগরী ভাষা অধ্যয়ন করে বাংলা ও পর্তুগিজ ভাষার প্রথম দ্বিভাষিক অভিধান রচনা করেন গির্জা সংলগ্ন ভবনে বসে।

নানা জাতের গাছের সারি গির্জার প্রাঙ্গণ জুড়ে। বেশ পরিপাটি আর শান্তি শান্তি ভাব আছে পুরো এলাকা জুড়ে। গির্জার ফটকের সামনে দুহাত প্রসারিত করে থাকা যিশুর মূর্তি সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছে।

default-image

এরপর আমাদের গন্তব্য পাঞ্জরা গির্জা। ১৯০৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেক বড় তার সীমানা। মেহগনি গাছের সারির মধ্য দিয়ে পুকুর পাড় ধরে এগিয়ে গেলে দাতব্য চিকিৎসালয়। তারপর একটি ছোট খোলা দরজা। আরেকটু এগোলে খণ্ড-খণ্ড পাথরে গড়া একটি গুহা গর্ভ; যিশুর আঁতুড় ঘরের আদলে তৈরি। একটি সবুজ চত্বর পেরিয়ে মূল প্রার্থনাগৃহ। সেখানে মোমবাতি জ্বলছে; দেয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যিশু। এরপরে হোস্টেল আর মেয়েদের দোতলা স্কুল। বিশেষ অনুমতি ছাড়া এই চার্চ দুটিতে সচরাচর এখন সবাইকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। আমরা সাইকেল নিয়ে চার্চের প্রাঙ্গণে যাই। জায়গাটা বেশ শান্ত। সিস্টার আমাদের মাস্ক না পরে চার্চের ভেতরে যেতে নিষেধ করলেন। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য তিনি আমাদের ছবি তুলতেও মানা করে গেলেন। এই গির্জার নির্মাণশৈলী এবং সৌন্দর্য সবাইকে আকৃষ্ট করবে।

আমরা সেখান থেকে চলে আসি উলুখোলা বাজারে। আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করে রেখেছিলেন বি অ্যান্ড জি এলিভেটর-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল কাইয়ুম ভাই। মধ্যাহ্নভোজে শেষে ফেরার পথে কিছুক্ষণ তুরাগের পাড়ে সময় কাটে চা আর আড্ডায়। আশরাফুজ্জামান ভাই পৃথিবী পরিভ্রমণের বিপুল অভিজ্ঞতার ঝাঁপি থেকে কিছুটা শেয়ার করেন। এরপর আমরা প্যাডেল মেরে ঢাকার পথ ধরি।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন