default-image

যত দূর মনে পড়ে, গত বছর এই সময়ে দেশে কোভিড-১৯ নিয়ে আলোচনার শুরু। ফেব্রুয়ারি থেকেই কেউ কেউ ধারণা করছিলেন যে আমাদের এই গরম আর বর্ষার দেশে কোভিড খুব একটা বেশি সুবিধা করে উঠতে পারবে না। এর বিপরীতে আবার কেউ কেউ অঙ্ক কষে (সিমুলেশন করে) দেখিয়েছিলেন যে দেশে লাখ লাখ মানুষ কোভিডে মারা যাবেন। দুপক্ষের মুখেই ছাই দিয়ে কোভিড তার আপন গতিতে দেশে প্রকট হয়েছে, বিরাজ করেছে আবার ম্রিয়মাণও হয়ে গেছে।

উন্নত বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ প্রাথমিক অবস্থাতেই কোভিডকে বেশ সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আবার এর বিপরীত চিত্রও আছে।

মহাপরাক্রমশালী বেশ কয়েকটি দেশই প্রবল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোভিডের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পারেনি। এখন পর্যন্ত ইউএসএতে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন; ইউকে ও ব্রাজিলে লক্ষাধিক; ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও মৃতের সংখ্যা দেড় লাখের অধিক। সে তুলনায় বাংলাদেশকে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে সিক্ত বলে মেনে নিতেই হবে। সীমিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়েও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ ভালো (মারা গেছেন ৮ হাজার ২২৯ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত)।

অনেকেরই হয়তো আরও ভালো কেন হলো না, সেটা নিয়ে আক্ষেপ থাকতে পারে। ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা বা দক্ষিণ কোরিয়ার কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনার সাফল্যের দিকে তাকালে সে রকম মনে হতেই পারে। তবে প্রথম দিকে সামগ্রিকভাবে একটা হকচকিত অবস্থা থাকলেও আমাদের একেবারে যে সাফল্য নেই, সেটি বলা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

ম্যানুফ্যাকচারিং নেশন হিসেবে খুব দ্রুতই আমরা নিজেদের পিপিই নিজেরাই তৈরি শুরু করি। এমনকি বাংলাদেশ থেকে তৈরি পিপিই এখন ৭০–এর অধিক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গাউন, সার্জিক্যাল মাস্ক, রেস্পাইরেটর, কিংবা ফেব্রিক মাস্ক, ইত্যাদি এখন দেশেই তৈরি হয় এবং সরবরাহও পর্যাপ্ত। সব দেশের অবস্থা কিন্তু এমনটি নয়। কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের একটা ডেটাবেইসের আওতায় এনে ফোনে তাঁদের চিকিৎসাপত্র দেওয়া বা ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ প্রথা প্রচলন কিছুটা হলেও জনমনে আস্থার সঞ্চার করতে পেরেছে।

আমরা অনেকেই মে মাসে কলকারখানা, কোরবানির পর থেকে গণপরিবহন খুলে দেওয়ায় বেশ চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু এগুলোর ফলে দেশে কোভিডে সংক্রমণ বা এর ফলে মৃত্যু যে খুব বেড়ে গেছে, তা বলা যাচ্ছে না। উপরন্তু কোভিড সময়ে দেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্য অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। কোভিড সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গ্লোবাল ইন্ডেক্সে একেবারে প্রথম দিকে। সব দেশের অবস্থা কিন্তু এমনটি নয়।

শক্তিধর অনেক উন্নত দেশ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেও কোভিডের ভয়াবহতার (স্বাস্থ্য খাত এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি) শিকার হয়েছে। তাই সীমিত সম্পদ এবং সক্ষমতার বাংলাদেশের কোভিড–সংক্রান্ত অবস্থাকে আমি সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত হিসেবেই দেখি।

এ বছরের জানুয়ারি থেকেই দেশে করোনা সংক্রমণের হার বেশ কম (৫ শতাংশের নিচে)। গত কয়েক দিনে কোভিড সংক্রমণের হার ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এমনিভাবে চলতে থাকলে হয়তো বা আগামী মার্চ-এপ্রিল থেকে স্কুল–কলেজগুলোও খুলে যেতে পারে।

২.
এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে গুটি কয় কোভিডের টিকা অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ফাইজার, মডার্না ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা অন্যতম। একেকটি টিকা তৈরির পদ্ধতি এবং কাজ করার মেকানিজম ভিন্ন। তাই তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা এবং দামও ভিন্ন। বাংলাদেশ প্রথম দিকের একটি দেশ হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিড-১৯ টিকা সংগ্রহ করতে পেরেছে। পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দামের কথা চিন্তা করলে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমাদের জন্য বেশ সাশ্রয়ীও বটে। জিও-পলিটিক্যাল কারণ যা–ই হোক না কেন, লো-মিডল ইনকাম কান্ট্রির (LMIC) একটি দেশ হয়ে এত দ্রুত করোনার টিকা সংগ্রহ করতে পারাটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো ব্যাপার।

আশা করি ভবিষ্যতে অন্যান্য কোম্পানির টিকা বাংলাদেশে আসতে পারে। গত রোববার থেকেই দেশে অফিশিয়ালি বয়স্ক ও ফ্রন্টলাইনাদের টিকা প্রদান শুরু হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশে টিকা কেন আসছে না, সেটা নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকলেও, সম্প্রতি টিকা গ্রহণের ব্যাপারে অনেকের মধ্যে কিছুটা উৎসাহের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। একটি কারণ হতে পারে, গত ডিসেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশে সংক্রমণ হ্রাস পাওয়ায় অনেকেই হয়তো কোভিডকে আর তেমন ভয়াবহ সমস্যা মনে করছেন না।

অনেকেই মনে করছেন যে এর ধারাবাহিকতায় আগামী মার্চ-এপ্রিলের পরে হয়তো কোভিড সংক্রমণ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাবে যে টিকার আর প্রয়োজন পড়বে না।
আবার কেউ কেউ এই ভেবে ভীত যে কোভিডের টিকার গ্রহণ করলে তিনি অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। টিকারগুলোর ট্রায়ালে কিছু কিছু নিউজও হয়তো জনমনে একটি দোলাচল তৈরি করে থাকতে পারে। কেউ কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে আশঙ্কা করছেন যে এই টিকা গ্রহণ করলে তাঁর জেনেটিক মিউটেশন হয়ে যেতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ রকম আশঙ্কা যে শুধু আমাদের দেশে হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। উন্নত, অনুন্নত নানা দেশেই টিকা নিয়ে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা হচ্ছে।

টিকাগুলো আসলে তিন ধাপে ট্রায়াল শেষ হওয়ার পরে অনুমোদন দেওয়া হয়। তাই বাজারে আসতে এত সময় লাগে। উপরোক্ত শঙ্কাগুলো ট্রায়াল চলাকালে সময়েই বিশ্লেষণ করা হয়। এরপরও টিকা অনুমোদনের পর তা গ্রহণকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না, সেটির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। টিকা গ্রহণের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ঢালাও মন্তব্যের সুযোগ থাকে না। এখন পর্যন্ত অনুমোদিত ভ্যাকসিনগুলোর ব্যাপারে বড় স্কেলে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট আসেনি। তাই এই অনুমান বা জল্পনা নিয়ে ভীত না হওয়াই শ্রেয়।

ধারণা করছি বয়স্ক, সংকটাপন্ন রোগী, ফ্রন্টলাইনার ও বিদেশযাত্রীরা প্রাথমিকভাবে টিকা গ্রহণ করবেন বা টিকা গ্রহণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

যাঁরা টিকা গ্রহণ করেননি, ভবিষ্যতে গ্রহণ করবেন বা টিকা গ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করে তারপর টিকা গ্রহণ করতে আগ্রহী, তাঁরা সবাই টিকা গ্রহণের আগপর্যন্ত মাস্ক পরিধান করুন, হাত নিয়মিত স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে পরিষ্কার রাখুন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন ও সুস্থ থাকুন।

*লেখক: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন