default-image
>কিডনি রোগীদের মধ্যে যাঁদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস করতে হয়, করোনা মহামারির এই সময়ে তাঁরা পড়েছেন অনেকটা বিপদে। একে গণপরিবহন ব্যবহার বিপজ্জনক, তার ওপর অনেক ডায়ালাইসিস কেন্দ্রও ছিল বন্ধ। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে করোনায় সংক্রমিত হওয়ার উদাহরণও আছে। তাহলে কীভাবে চলবে চিকিৎসা?

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ভোগা মানুষের শেষ ধাপের চিকিৎসা হলো ডায়ালাইসিস। কিডনি রোগীদের অনেকেই ডায়ালাইসিসের মাধ্যমেই জীবন যাপন করেন। সাময়িক কিডনি বিকল বা অ্যাকিউট কিডনি ডিজিজের কিছু রোগীরও সাময়িকভাবে ডায়ালাইসিস দরকার হতে পারে। 

ডায়ালাইসিস চিকিৎসা অতটা সহজলভ্য নয়, সস্তাও নয়। ডায়ালাইসিসে জন্য নির্দিষ্ট কেন্দ্রে রোগীকে নিয়মিত (সপ্তাহে ২ বা ৩ দিন) যেতে হয়। এ জন্য পরিবহন দরকার, দরকার হয় দীর্ঘ সময় ডায়ালাইসিস কেন্দ্র বা হাসপাতালে অবস্থানের। তাই করোনা মহামারির এই সময় নিয়মিত ডায়ালাইসিস করানো রোগীরা পড়েছেন অনেকটাই বিপদে। একে গণপরিবহন ব্যবহারে সংক্রমণের আশঙ্কা, তার ওপর অনেক ডায়ালাইসিস সেন্টারও ছিল বন্ধ হয়ে। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে করোনায় সংক্রমিতও হয়েছিলেন অনেকে।

ডায়ালাইসিসের রোগী তো বটেই, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের সব রোগী করোনাকালে বিশেষ ঝুঁকিতে আছেন। করোনায় আক্রান্ত হলে তাঁদের শারীরিক জটিলতা ও তীব্রতা অন্যদের চেয়ে বেশি হয়। তাঁরা সহজেই মারাত্মক বা সিভিয়ার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে পৌঁছে যান। কিডনি বা ডায়ালাইসিসের রোগীদের তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং নেফ্রোলজি সোসাইটিগুলো পরামর্শ দিয়েছে, বাড়িতে ও বাইরে বিশেষ শিল্ডিং মেথডে থাকার। যেমন আলাদা ঘর থাকলে সেখানে পৃথকভাবে অবস্থান করা, বাড়ির অন্যদের থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা। সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি সতর্কভাবে মেনে চলা।

রোগীর জন্য কিছু সতর্কতা

এ সময় এমন মানুষকে কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। অকারণে বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যরা যাঁরা বাইরে যান ও কারও কোনো উপসর্গ হলে তাঁদের থেকে পৃথক রাখতে হবে।

ডায়ালাইসিসের রোগীরা জনসমাগম বা ভিড় এড়িয়ে চলবেন। পথে মানুষ যখন কম থাকে, এমন সময় হাসপাতালে যেতে হবে। গণপরিবহন এড়িয়ে চলা ভালো। আর্থিক সামর্থ্য থাকলে ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহার করুন, নয়তো যথাসম্ভব সুরক্ষা মেনে যাতায়াত করুন। রাস্তাঘাটে, বাসস্টপ বা হাসপাতালের কাউন্টারে অন্যদের কাছ থেকে ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। বাড়ির বাইরে বা হাসপাতালে সারাক্ষণ মাস্ক পরা, নির্দিষ্ট সময় পরপর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাত দিয়ে চোখ-মুখ স্পর্শ না করার মতো বিধান তাঁদের কঠোরভাবে মানতে হবে। 

পরিচর্যাকারীদের দায়িত্ব

ডায়ালাইসিসের রোগীদের পরিচর্যাকারী ও সাহায্যকারীদেরও মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। বাইরে গেলে মাস্ক না খোলা, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে খাবার খেতে বা পানি পান করতে হলে হাত স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করে নিন। ফিতা ধরে মাস্ক খুলতে ভুলবেন না আর পানি বা খাবার গ্রহণের পর আবার হাত পরিষ্কার করে তারপর আরেকটি মাস্ক পরুন।

করোনাভাইরাস নিয়ে সচেতনতা 

অনেক হাসপাতালে বা ডায়ালাইসিস সেন্টারে কোভিড ও নন–কোভিড রোগীদের জন্য আলাদা ডায়ালাইসিস যন্ত্র রয়েছে। আবার যেখানে এমন সুবিধা নেই, সেখানে ডায়ালাইসিস রোগীদের কোভিড পরীক্ষা করে যেতে বলা হয়। উপসর্গ দেখা দিলে ডায়ালাইসিসের আগে অবশ্যই নমুনা পরীক্ষা করতে হবে। নয়তো অন্য কিডনি রোগীরা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। যদি কোনো জরুরি ডায়ালাইসিস করাতে হয় এবং রোগীর উপসর্গ আছে কিন্তু পরীক্ষা করানো হয়নি, সে ক্ষেত্রে সবার শেষ রোগী হিসেবে তাঁর ডায়ালাইসিস করা যেতে পারে। কিডনি ও ডায়ালাইসিসের রোগীদের পরীক্ষা করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। করোনাকালে আপনার চিকিৎসক সাপ্তাহিক ডায়ালাইসিসের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারেন, সে জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ লাগবে। 

কোভিডের কোনো উপসর্গ, যেমন কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, স্বাদহীনতা, গন্ধ না পাওয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদি ডায়ালাইসিস রোগীর আছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন ও তাঁর চিকিৎসক বা কিডনি বিশেষজ্ঞকে জানাবেন। অসংলগ্ন কথাবার্তা, চেতনা লোপও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। তাই যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন ও কোভিড পরীক্ষা করবেন।

কোভিড পজিটিভ রোগীদেরও ডায়ালাইসিস চালিয়ে যেতে হবে। তাই আগেই খোঁজ নিয়ে রাখুন কোন সেন্টারে কোভিড পজিটিভ রোগীর ডায়ালাইসিস করানো হয়। কোনো ডায়ালাইসিস রোগী যদি কোভিড পজিটিভ হন, তবে মৃদু উপসর্গ হলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো। এতে তাঁর অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে ডায়ালাইসিস নিয়মিত চালিয়ে যেতে অসুবিধা হয় না। 

ডায়ালাইসিস রোগীরা তাঁদের নির্দেশিত খাবার ও পানির পরিমাণ যথাযথভাবে মেনে চলবেন। কিডনি রোগের ওষুধের সঙ্গে ডায়াবেটিস ও রক্তচাপের ওষুধ সময়মতো খেতে ভুলবেন না। কিডনি রোগীদেরও ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। আর এ জন্য তাঁদের কোভিড হয়েছে বলে মনে হতে পারে। তাই সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন। কিডনি রোগীদের ক্রিয়েটিনিন, ইলেকট্রোলাইট ইত্যাদি পরীক্ষা নিয়মিত করতে হয়, যথাযথ সুরক্ষা মেনে এগুলো করবেন।

ডা. শুভার্থী কর
সহকারী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি বিভাগ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন