default-image
>সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন করোনাভাইরাস। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি। মৃত মানুষের সংখ্যা ১১ হাজার হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই নতুন মহামারিতে নারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক, পারিবারিক—সব দিক থেকেই ক্ষতির শিকার হতে পারেন নারীরা। এই পরিস্থিতিতে দেশে–বিদেশে করোনা প্রতিরোধে নারীরা বসে নেই, নিচ্ছেন নানান উদ্যোগ।

এরই মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখ এবং মৃত মানুষের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই নতুন মহামারিতে নারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক, পারিবারিক—সবদিক থেকেই ক্ষতির শিকার হতে পারে নারীরা। 

করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা; বিশেষ করে চিকিৎসক ও নার্সরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পুরো পৃথিবীতে স্বাস্থ্যসম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত লোকবলের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী। চীনের হুবেই প্রদেশে (যেখান থেকে কোভিড-১৯-এর উদ্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে) স্বাস্থ্যকর্মীদের ৯০ শতাংশই নারী। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় হিসাব অনুযায়ী, সে দেশে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নারী ৭৬ শতাংশ। আমাদের দেশেও এই সংখ্যা কম হবে না। ফলে যে রোগের এখনো কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি, সেই রোগের ক্ষেত্রে বিশাল ঝুঁকির মুখে রয়েছে এই খাতের নারীরা। 

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর স্বাস্থ্যনীতিবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ডিন ন্যান্সি নিয়েলসেন বলছেন, স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে যেসব নারী কাজ করেন, তাঁদের মা–বাবাসহ বয়স্কদের দেখভালের দায়িত্বও আছে। আবার স্কুলপড়ুয়া সন্তানদের দেখাশোনাও করেন তাঁরা। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব নারীর ওপর আলাদা চাপ পড়ছে। 

অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী নারীরাই পরিবারের প্রাথমিক দেখভাল বা প্রিয়জনদের যত্নআত্তি করার দায়িত্ব পালন করেন। ফ্যামিলি কেয়ারগিভার অ্যালায়েন্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীতে ৭৫ শতাংশের বেশি নারী পরিবারের ক্ষেত্রে এই ভূমিকা পালন করেন। পুরুষেরা নারীদের সহযোগিতা করলেও পরিবারের সদস্যদের যত্নআত্তি বা সেবা করার ক্ষেত্রে নারীদেরই সময় দিতে হয় বেশি। হিসাব অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীরা ৫০ শতাংশ বেশি সময় দেন।

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে। এসব দেশে সবাই ঘরবন্দী হয়ে পড়ায় গৃহস্থালি কাজের চাপও এসে পড়ছে নারীদের ঘাড়ে। গত জানুয়ারি মাসে গ্যালাপের একটি জরিপ বলছে, সন্তানদের যত্নআত্তি ও দেখভালের ক্ষেত্রে প্রতিদিন পুরুষদের তুলনায় নারীদের ৭ গুণেরও বেশি সময় দিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীদের ওপর সেই চাপ আরও বাড়বে বৈ কমবে না। 

কর্মজীবী নারীদের নিয়ে কাজ করে এলিভেট নেটওয়ার্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টি ওয়ালেস বলেন, ‘একটি পরিবারে নারীদের সাধারণত প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, প্রধান বিনোদন কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা—এই তিন ধরনের কাজই করতে হয়। সংকটকালে যখন আমরা কী করব বুঝে উঠতে পারি না এবং আতঙ্কগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি, তখন এতগুলো ভূমিকা পালন করা নারীদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।’

অন্যদিকে একটি মহামারি নারীদের জন্য পৃথিবীকে আরও বৈষম্যমূলক করে তোলে। যদিও এখন রাজনীতিবিদেরা মত দিচ্ছেন যে যেন শুধুই তাৎক্ষণিক সংকটের দিকে মনোযোগ রাখা হয়। কিন্তু মহামারির ইতিহাস বলে, পরবর্তী পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে নারীর জন্য। যেমন, ইবোলা ভাইরাস পশ্চিম আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইবোলা সংক্রমণ একটু থিতিয়ে আসার পর পুরুষদের পারিশ্রমিক ঠিকই দ্রুততম সময়ে আগের জায়গায় ফিরে গেলেও নারীদের পারিশ্রমিক মহামারি হওয়ার আগের পর্যায়ে ফিরতে ঢের সময় লেগেছিল এবং এই অবস্থা চলেছিল প্রায় বছরখানেক ধরে। এর বাইরে বেড়ে গিয়েছিল নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের ঘটনাও। সাধারণত লকডাউন পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য দায়ী করেছেন উদ্বেগ, মদ্যপান ও আর্থিক সংকটের মতো বিষয়গুলোকে। 

পুরুষদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি 

নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার বেশি পুরুষদের মধ্যে। নারীদের মধ্যে মৃত্যুহার অনেক কম। ইতালিতে মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ শতাংশ পুরুষ। চীনে কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, মোট মৃত মানুষেদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই পুরুষ। দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি ৫৪ শতাংশ। 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পুরুষদের বেশি মারা যাওয়ার পেছনের একটি হচ্ছে জীববিজ্ঞানগত। নারীদের দুটি ‘এক্স’ ক্রোমোজম থাকে। এই ‘এক্স’ ক্রোমোজোমে রোগপ্রতিরোধী বেশ কিছু জিন থাকে। যেহেতু পুরুষদের একটি ‘এক্স’ ক্রোমোজম থাকে, তাই তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নারীদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই কম থাকে। ফলে রোগের সঙ্গে লড়াই ও সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার প্রবণতা নারীদের বেশি থাকে। এ–সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র হিউম্যান জিনোমিকস নামের একটি জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষদের মৃত্যুহার বেশি হওয়ার আরেকটি কারণ জনমিতি–সম্পর্কিত ও আচরণগত। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালিতে আগে থেকেই পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে থেকেই এসব দেশে নারীদের গড় আয়ুষ্কাল পুরুষদের চেয়ে বেশি ছিল। চীনসহ এই দেশগুলোয় পুরুষদের মধ্যে ধূমপান ও মদ্যপানের প্রবণতা বেশি। যেমন: চীনে ১৫ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ৪৮ শতাংশই ধূমপান করেন। এর বিপরীতে নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা মোটে ২ শতাংশ। ফলে এসব দেশে আগে থেকেই পুরুষেরা হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ছিল। নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরুষদের ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

জনস হপকিন্সের ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক সাবরা ক্লেইন বলছেন, ‘সত্যিটা হলো, চীন বা ইতালিতে কেন কোভিড-১৯ পুরুষদের জন্য বেশি প্রাণঘাতী হচ্ছে, সেটি এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। আমরা এতটুকু জানতে পেরেছি যে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের ক্ষেত্রে বয়স্ক ও পুরুষ হওয়াটা ঝুঁকির বিষয়। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’ 

তথ্যসূত্র: সিএনবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য হিল ডট কম, দ্য আটলান্টিক ও ওয়াশিংটন পোস্ট

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0