default-image

ছোট্ট মেয়ে তুলতুল। বয়স তিন বছর ছুঁই ছুঁই । তার চিকিৎসক মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরতেই ঝাঁপিয়ে পড়ত মায়ের বুকে। তারপর সারা দিনের জমানো কথা, নানা আবদার।
সেই তুলতুলের সন্ধ্যাটা এখন বদলে গেছে। মায়ের সান্নিধ্য আগের মতো পায় না। কেমন যেন একটা ছাড়া ছাড়া ভাব, একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। মা অফিস থেকে ফিরেই দরজার মুখ থেকে তাকে আগের মতো ডাক দেন না। সোজা ঢুকে যান স্নানঘরে। স্নান সেরে তারপর মেয়েকে কাছে ডাকেন। তবুও কিছুটা দুরত্ব যেন রয়েই যায়।

বিজ্ঞাপন

এসবের মানে বোঝে না ছোট্ট শিশুটি। মা বলেন, এই দূরত্বের কারণ করোনা নামের একটা ভাইরাস। এটা খুব খারাপ অসুখ ডেকে আনে। যে অসুখের কোনো ওষুধ নেই। এ থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে, বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলা। তুলতুলের মা মধুরা চৌধুরী পেশায় চিকিৎসক। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার তিনি। সহকর্মীরা ডাকেন ‘ডাক্তার আপা’। পাঁচ বছর ধরে তিনি হেড অফিসে বসেন। স্টাফদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা হলে চিকিৎসা করেন। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও ওষুধ লিখে দেন। অফিসেই কর্মজীবীদের শিশুসন্তানদের জন্য একটা ডে-কেয়ার সেন্টার আছে, নাম ‘দোলনা’। এই শিশুদেরও চিকিৎসক তিনি। প্রতি মাসে একবার নিয়মিত চেকআপ তো থাকেই। এর বাইরেও যখন প্রয়োজন পড়ে, তিনি হাজির হয়ে যান দোলনায়।
সেই দোলনার শিশুদেরও এখন প্রতি মাসের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হচ্ছে না। কারণ একটাই—করোনা। তবে মা-বাবা যদি মনে করেন, তাঁদের শিশুটি অসুস্থ আর চিকিৎসক মধুরার সাহায্য চান, তাহলে তিনি দোলনায় যান। নিজের বাসায় তিনি যেমন তুলতুলের মা, দোলনাতেও এই শিশুদের মা। তাই চলমান পরিস্থিতিতে এদের নিরাপত্তাটুকু তাঁর সেভাবেই ভাবতে হয়।

এই করোনাকালে চিকিৎসক মধুরার কাজের ধারা ও ধরন—দুটোই অনেকখানি বদলে গেছে। যোগ হয়েছে নতুন নতুন সতর্কতা। কর্মীদের তো বটেই, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও সামান্য জ্বর-কাশি হলে সবাই ভড়কে গিয়ে ফোন দেন ডাক্তার আপাকে। কোনো টাইমটেবিল নেই, সব সময়ে তাঁর ফোন খোলা। রাত দুইটা-আড়াইটায়ও ফোন আসে।
শুধু ঢাকা নয়, দূরের জেলা থেকেও ফোন করেন সহকর্মীরা। সামান্য জ্বরে ভুগেও অনেকে ফোন করেন। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তো অবস্থা ছিল খুবই সঙিন। কোনো কোনো এলাকায় কারও জ্বর-কাশি হলেই প্রতিবেশীরা একঘরে করে ফেলতেন। পুলিশ ডেকে, বাসাবাড়ি লকডাউন করে হুলুস্থুল কাণ্ড! সেই ভয়ে ঘরে থেকেই ডাক্তার আপার পরামর্শ নিয়ে চলতেন সহকর্মীরা। ব্র্যাকে তখন তাঁর মতো আরও প্রায় ৩০ চিকিৎসক টেলিমেডিসিন সেবা দিতেন।

বিজ্ঞাপন

করোনার আগেও ডাক্তার আপা ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় বিভিন্ন সেশনের মাধ্যমে সহকর্মীদের শিশুপুষ্টি, হৃদরোগ প্রভৃতি বিষয়ে স্বাস্থ্যসচেতন করতেন। করোনাকালে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাড়তি সেশন। সহকর্মীরা কী করবেন, আর কী করবেন না—এসব থেকে শুরু করে মনঃসামাজিক কাউন্সেলিংয়েও থাকছেন তিনি। আর করোনাবিষয়ক সরকারি নির্দেশ ও পরামর্শের নিয়মিত হালনাগাদ তো দিয়েই যাচ্ছেন।
সামনেই শীতকাল। অনেকের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তখনই আসবে। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। এই আশঙ্কার কথা উঠতেই চিকিৎসক মধুরা বলেন, ‘অবস্থা কোন দিকে মোড় নেবে, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলতে পারছে না। শীতে এমনিতেই সর্দি–কাশি, গলাব্যথা বেশি হয়। তখন করোনা রোগী চিহ্নিত করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের সতর্কতা আরও অনেক বাড়াতে হবে। টিকা তো সহসাই আসার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। করোনা আমাদের সঙ্গেই বসবাস করতে থাকবে, এটা মেনে নিয়েই আমাদের নিয়ম মেনে চলতে হবে।’

মন্তব্য পড়ুন 0