>
default-image
ব্রিটেনের জো মিলন্ ছিলেন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। শ্রবণশক্তি ফিরে পেয়ে তিনি নামলেন অন্যদের শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে। বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলল তঁার লেখা বই ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। এবার তিনি ঘুরে গেলেন বাংলাদেশ।

শব্দহীন পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কি অভাবনীয় কষ্টের! সেই কষ্টকর পৃথিবীর সদস্য হয়ে প্রায় ৪০ বছর কাটিয়েছেন ব্রিটেনের গেটসহেড শহরের জো মিলন্। অপারেশনের পর প্রথম যখন তিনি কানে শুনতে পেলেন, তাঁর সেই অনুভূতির ভিডিও ক্লিপস বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। প্রায় চার কোটিরও বেশি মানুষ সেই তিন মিনিটের ভিডিওটা দেখে। তাঁর লেখা বহুল আলোচিত বই ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স। তিনি কলাম লেখেন এবং রেডিও-টিভিতে নিয়মিত বক্তৃতা করেন।

গত ২১ এপ্রিল তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছিলেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন প্রায় ৫০০ শিশুকে দেওয়ার জন্য হিয়ারিং এইড বা শ্রবণসহায়ক যন্ত্র। প্রথম যখন জো মিলনে্কে দেখি, তিনি তখন একদল বাচ্চার সঙ্গে নাচের তালে দুলছিলেন। সেই বাচ্চাদের কেউই কানে শুনতে পায় না, সবার কানে হিয়ারিং এইড লাগানো। বাংলা আর ইংরেজি ভাষার এখানে কোনো ব্যবধান নেই, দিব্যি বাচ্চাদের সঙ্গে ভাব জমে উঠেছে হাসিখুশি-প্রাণবন্ত জো নামের মানুষটার। তাঁর চেহারায় আত্মবিশ্বাসের ছাপ। আর কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম আন্তরিকতায়ও কমতি নেই।

তবু এগিয়ে চলা
জো মিলনে্র জন্ম ১৯৭৪ সালে। যখন তাঁর ১৬ মাস বয়স, ডাক্তারি পরীক্ষায় বোঝা গেল তিনি বধির। তবুও তাঁর পড়াশোনা থেমে থাকেনি। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় হিয়ারিং এইড আর ফোনিক ইয়ার বক্স লাগিয়ে যেতে হতো। বাবা আল, একজন কেব্ল কনট্রাক্টর আর মা অ্যান, গৃহিণী। তাঁর জীবনে তাঁর দাদার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। দাদা বিশ্বাস করতেন, বধিরতা কখনো জীবনে চলার পথে বাধা হতে পারে না। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধৈর্য নিয়ে জোকে স্পিচ থেরাপি নিতে ও লিপ রিড করতে সাহায্য করতেন।
‘আমি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, বধিরতাকে আমি আমার জীবনের একটা অংশ হিসেবেই মেনে নিয়েছিলাম। বধিরদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, প্রতিবন্ধীদের প্রতি ইতিবাচক আচরণ ও সেবাকে উন্নত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কাজ করতাম।’
কিন্ত জোর জন্য আরও বড় আঘাত অপেক্ষা করছিল। সবকিছু পাল্টে গেল যখন একদিন গাড়ি চালানোর সময় তিনি দেখলেন তাঁর গাড়ির পেছনে দেখার আয়নায় তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না।
ছুটলেন ডাক্তারের কাছে। তাঁর মেনে নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল যে দৃষ্টিশক্তিও তিনি হারাতে চলেছেন। তবু জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তিনি হারাননি।

default-image

বিরল ব্যাধি
২৯ বছর বয়সে প্রথম জানা যায়, তিনি আসার সিনড্রোমে আক্রান্ত। এই বিরল সমস্যার চিকিৎসা নেই। ২০১৪ সালে যখন জোর ৩৯ বছর বয়স, বার্মিংহাম কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে তাঁর ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট করা হয়। অস্ত্রোপচারের আগে কোনো নিশ্চয়তাই ছিল না যে সেটি সফল হবে। তবু তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। অপারেশনের পর চার সপ্তাহ অপেক্ষার করতে হয়েছে। ‘জীবনে প্রথমবার যখন আমি শব্দ শুনতে পেলাম, অভূতপূর্ব অনুভূতিতে আমার চোখে পানি চলে আসে—খুব অবাক হয়েছি। এখনো এমন অনেক শব্দ আছে, যেগুলো শুনলে আমি চমকে উঠি। ধীরে ধীরে বিভিন্ন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি।’
তিনি কানে শুনতে পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিশক্তি এখন কেবল একটা টানেলের মতো হয়ে গেছে। তিনি শুধু মাঝামাঝি দেখতে পান, আশপাশে দেখতে পান না। ‘যেহেতু চোখের শক্তি কমে আসছে, তাই কান এখন আমার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমি হয়তো দেখব না গাড়ি আসছে, কিন্তু শব্দ শুনব; পাখি দেখতে পাব না, তবু পাখির ডাক তো শুনতে পাব। প্রতিদিন রাতে এই আশা নিয়ে ঘুমোতে যাই যে আগামীকাল ঘুম ভেঙে আমি আবার নতুন একটা দিন দেখতে পাব।’
চোখের আলো পুরোপুরি নিভে যাওয়ার আগেই যতটা পারা যায় পৃথিবী ঘুরে দেখতে চান জো মিলন্। তবে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা তাঁর নিজের বাড়ি, যেখানে তিনি পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটিয়ে বেড়ে উঠেছেন।
তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন যুক্তরাজ্যের দ্য হিয়ারিং ফান্ডের প্রতিনিধি হিসেবে। ঢাকা রোটারি ক্লাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টারকি হিয়ারিং ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি গিফট অব হিয়ারিং প্রকল্পের কাজ করেছেন। এপ্রিলের ২১ তারিখ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। ঢাকার পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীতে গিয়েছিলেন। নিজ হাতে বধির শিশুদের হিয়ারিং এইড দিয়েছেন। সেসব শিশু আর পরিবারের আনন্দ দেখেছেন।
বাংলাদেশ কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি হেসে বললেন, ‘এ দেশের সঙ্গে সব সময়ই আমার যোগাযোগ ছিল। কারণ, আমার ভীষণ কাছের এক বন্ধু বাংলাদেশি। আর এখন তো এই দেশ আর এখানকার মানুষের প্রতি খুব মমতা আর ভালোবাসা অনুভব করি।’
তিনি আসার সিনড্রোমের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে চলেছেন। কারণ, বহু মানুষই এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। ‘আমি প্রতিবন্ধীদের জন্য আরও কাজ করতে চাই। যতটা পারা যায় তাদের সাহায্য করতে চাই। নিঃসন্দেহে তাদের প্রতি ইতিবাচক আচরণ খুব ভালো একটা উপহার।’ তিনি অনুরোধ করেন, Jo Milne নামে তাঁর ফেসবুক ও টুইটার পেজের কথা লেখায় উল্লেখ করতে।
বধিরতা বা ঘনিয়ে আসা অন্ধত্ব—কোনোটাই তাঁর জীবনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশে এসে কোন বিষয়টা আপনার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে? এই প্রশ্নটা না করলেই নয়। এক মুহূর্ত ভেবে তিনি বললেন, ‘হিয়ারিং এইড পেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা শিশুদের মুখ।’

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন